বৈশাখী শোভাযাত্রা; নতুন আলোয়, উদ্ভাসিত প্রাণ

বৈশাখী শোভাযাত্রা; নতুন আলোয় উদ্ভাসিত প্রাণ
শেয়ার করুন:

বৈশাখী শোভাযাত্রা; নতুন আলোয়

উদ্ভাসিত প্রাণ

নাম নিয়ে বিতর্ক অবসানের পর মঙ্গল শোভাযাত্রা এ বছর বৈশাখী শোভাযাত্রা নাম দেয়া হয়েছে। মঙ্গলে আমার কোনোকালেই আপত্তি ছিল না। আবার গত বছরের আনন্দ শোভাযাত্রাও আমার খারাপ লাগেনি। তবে এতসব যুক্তি পেরিয়ে বৈশাখী শোভাযাত্রা নামটা মনে হয় আর বিতর্কের জন্ম দিবে না। এবার এই শোভাযাত্রার নাম নিয়ে টানাটানি, রেষারেষির শেষ হলো বলেই মনে হচ্ছে। যে নামেই ডাকা হোক, এই শোভাযাত্রা ইতিবাচক, শুভ এবং সব জীর্ণতাকে অস্বীকার করে। পহেলা বৈশাখ সব পুরাতন, জীর্ণতাকে দূরে সরিয়ে নতুনকে বরণ করে। বাংলাদেশে পহেলাবৈশাখকে মঙ্গল এবং শুভ প্রতীক হিসেবেই ধরা হয়। পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে বড় আনন্দের। সেই আনন্দকে উৎসাহের সাথে বরণ করে নিতেই আয়োজন করা হয় শোভাযাত্রার। এ এখন রীতি। পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি/ ওই কেটে গেল; ওরে যাত্রী/ তোমার পথের পরে তপ্ত রৌদ্র এনেছে আহŸান/ রুদ্রের ভৈরবের গান। এভাবেই পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এভাবে, ’’এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ, তাপস নিঃশ^াস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’’ এই সম্ধিসঢ়;¥লিত সুরেই বাঙালির প্রথম দিনকে বরণ করে নেওয়া হয় আমাদের দেশে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণে সারাদেশ আনন্দে মেতে ওঠে একসাথে। সব জীর্ণতাকে পাশ কাটিয়ে নতুনকে বরণ করে নিতে আয়োজনের কমতি থাকে না। একটি নতুন বছর নতুন শুরুর আশা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে দেশের মানুষ। পহেলা বৈশাখ বরণ করে নিতে সবচেয়ে পরিচিত বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত আয়োজনের নাম হলো বৈশাখী শোভাযাত্রা (পূর্বের মঙ্গল শোভাযাত্রা)। শোভাযাত্রা অর্থ হলো মিছিল। তাহলে

দাঁড়ালো শোভাযাত্রা আয়োজন করা হয় সব অমঙ্গল দূর করে দেশকে মঙ্গলের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শোভাযাত্রায় সব অমঙ্গল দূর করার প্রতিশ্রæতি নেই আমরা। সত্যের আলোয় আমাদের মনের ভেতরের সকল কুসংস্কার, সকল অহংকার, সকল অন্ধকার আলোয় পরিণত হওয়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। একটি নিজস্ব চেতনাবোধের উন্মেষের প্রত্যয়ে আমরা একত্রিত হই। বাঙালি সে তো সব এক প্রাণে গাঁথা। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই একসাথে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ

একসাথে বসবাস করছে এই দেশের শ্যামল ছায়ায়। এ দেশের মাটি সকলের জন্য সমান আশ্রয় দিয়ে যায়। এ দেশের জল সকলের তৃষ্ণা মেটায়। সেখানে কোনো জাতি, ধর্ম, বর্ণ প্রভেদ নেই। কোনো উঁচু নিচু নেই। বৈশাখের প্রথম প্রহর থেকেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের গানের অনুষ্ঠান থাকে। সূর্য ওঠার সাথে সাথেই নতনু বছরের মঙ্গল কামনায় বটমূল প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে ওঠে।  বৈশাখকে বরণ করে নিতে বাঙালি যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। এই সংস্কৃতির ঢেউ লাগে দেশ ব্যাপী। চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বিভিন্ন মুখোশ ও মূর্তি বানিয়ে রাস্তায় শোভাযাত্রা বের করা হয়। এবারও সেই প্রস্তুতি

চলছে। শোভাযাত্রায় সকল অপসংস্কৃতির দূর করে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। বাঙালি তখন এক পরিপূর্ণ বাঙালি হয়ে হৃদয়ে এক সুর ধারণ করে। বাঙালির উৎসবের প্রধান উৎস হলো নতুন বছরের প্রথম সূর্য কিরণ বা পহেলা

অশুভ শক্তির বিপক্ষে শুভশক্তির সূচনা করতেই শোভাযাত্রার শুরু হয়। এর সাথে কোনো ধরনের গোড়ামির সংশ্লিষ্টতা নেই। বৈশাখের প্রথম দিনে এই উদ্দামতার উদ্দেশ্যই বৈশাখ। প্রত্যেক বছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেয়ার মহোৎসব এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। এর আয়োজনে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবৃন্দ। এই শোভাযাত্রার বিস্তৃতি ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ, রমনা ও এর আশেপাশের এলাকা নিয়ে। এছাড়া সারাদেশেই এখন শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। প্রায় চার দশক আগে এ উৎসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে শোভাযাত্রা, যা এখন বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, শোভাযাত্রা প্রথম শুরু হয় ১৯৮৫ সালের পহেলা বৈশাখ যশোরে। দেশের লোকজ সংস্কৃতি উপস্থাপনের মাধ্যমে সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা ছিল এর উদ্দেশ্য। সেই শোভাযাত্রায় অশুভের বিনাশ কামনা করে শুভশক্তির আগমনের প্রার্থনা করা হয়। এর উদ্যোগ নিয়েছিলেন চারুশিল্পী মাহবুব জামাল শামিম। ঢাকার চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা সাম দিয়ৈ শুরু হয় ১৯৮৯ সালে। শুরুতে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরবর্তী সময় এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবে পরিচিত হয়। সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনের ভিত্তিতে ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘের সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে। ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে তাদের ‘রিপ্রেজেনটেটিভ লিস্ট অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। স্বীকৃতি দেওয়ার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছে, এটা শুধু একটা সম্প্রদায় বিশেষের নয়, গোটা দেশের মানুষের, সারা পৃথিবীর মানুষের। এর মধ্যে দিয়ে পহেলা বৈশাখের আনন্দ ছড়িয়ে পরে বিশ্বব্যাপী। এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রায় যোগ হয়েছে এক নতুন মাত্রা। বাঙালি সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। পহেলা বৈশাখের এই শোভাযাত্রার একটি রাজনৈতিক ইতিহাসও রয়েছে। ১৯৮০ দশকের স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে একটি অবস্থানও ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্দেশ্য। থাকে বৈশাখকে নতুন রুপে বরণ করে নেয়া। বৈশাখের প্রথম দিনে এই আনন্দ মিছিলটি নিমেষে পরিণত হয় বাংলার সর্বস্তরের ও বিভিন্ন বয়সের মানুষের মহা সম্মেলনে। উৎসবের সব থেকে চোখ জুড়ানো বিষয়টি হচ্ছে বিভিন্ন ফুল, পশু- পাখি ও রূপকথার চরিত্রের রঙ-বেরঙের শিল্পকর্ম। চৈত্রের তাপদাহের সাথে বসন্তের বিদায় এবং কালবৈশাখীর ঝড়ো বাতাসে শীতল পরশে নতুন বছরকে বরণ করতে বাঙালির থাকে নানা আয়োজন। বাঙালির জীবনে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা বছরের প্রথম দিন আনন্দময় উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম। পহেলা বৈশাখ একটি ঐতিহ্য এবং একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক ধারা। এই ধারা মনে করিয়ে দেয় আমরা বাঙালি, আমাদের নিজস্বতা বলে কিছু আছে। আমরা সযতনে এই ধারা লালন করে চলেছি। বৈশাখের প্রথম দিনে বাংলাদেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর, প্রাণবন্ত। শোভাযাত্রারআয়োজনে পহেলা বৈশাখ আজ এক নতুন ধারায় প্রবেশ ঘটেছে। আরও বেশি সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটেছে। একটি দিন পরিবর্তিত হতে, সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু হতে সময়ের প্রয়োজন। মানুষের হাত থেকে হাতে, মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পরতে একটি উন্মাদনা প্রয়োজন। যেভাবে আমরা ইংরেজি সংস্কৃতির প্রতি প্রলুদ্ধ হচ্ছিলাম, যেভাবে নিউ ইয়ারকে সম্ভাষণ জানানোর প্রবণতা তৈরি হচ্ছিল তাতে বাঙালির নিজস্ব পরিচয় প্রশ্নের মুখে পরতেই পারে। যেভাবে আমরা ইংরেজি সংস্কৃতির প্রতি ঝুঁকতে শুরু করেছিলাম আজ তার চেয়েও দ্রæত গতিতে নতুন বছরকে অর্থাৎ বাংলা বছরকে আপন করতে শিখেছি। মানুষ আরও আপন করতে শিখেছে। মঙ্গল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে পথ চলা শুরু হয় পহেলা বৈশাখে। যার নেতৃত্বে থাকে মূলত চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সকলের সাথে মিশে যায় বাঙালি।

অলোক আচার্য

প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট পাবনা

মোবাইলঃ ০১৭৩৭ ০৪৪৯৪৬

শেয়ার করুন: