বাংলাদেশের তরুণদের জন্য রবিন খুদার গল্প:
একটি স্বপ্ন, একটি দেশত্যাগ, এবং বিলিয়ন ডলারের সাফল্য!
মিডলক্লাস মুসলিম পরিবার থেকে উঠে আসা একজন বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টের বিলিয়নিয়ার হওয়ার গল্প- এস এম ওয়াজেদ আলীর ছেলে রবিন খুদা! সম্প্রতি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা নিয়ে ভাইরাল হয়েছেন–
১৯৯৭ সাল। ঢাকার এক তরুণ উচ্চমাধ্যমিক পাস করে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি নিজের পরিচিত পরিবেশ, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এবং নিরাপদ জীবন ছেড়ে পাড়ি জমালেন অস্ট্রেলিয়ায়। পকেটে ছিল না বিপুল অর্থ, ছিল না কোনো প্রভাবশালী পরিচয়। ছিল শুধু শিক্ষা অর্জনের ইচ্ছা এবং নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে তোলার সাহস। সেই তরুণের নাম — Robin Khuda।
আজ তিনি শুধু একজন সফল উদ্যোক্তাই নন; তিনি অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ধনী স্বনির্মিত (self-made) প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। কিন্তু তাঁর গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—তিনি শুরু করেছিলেন ঠিক সেই জায়গা থেকে, যেখানে আজ হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশে স্কুল ও কলেজ জীবন শেষ করে রবিন খুদা অস্ট্রেলিয়ার University of Technology Sydney-এ অ্যাকাউন্টিং পড়তে যান। নতুন দেশে গিয়ে তাঁকে নতুন সংস্কৃতি, নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা এবং নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি কখনও শর্টকাট খুঁজেননি। তিনি ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা গড়ে তুলেছেন, পড়াশোনা শেষ করেছেন, কর্পোরেট চাকরিতে প্রবেশ করেছেন এবং বছরের পর বছর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
অনেকেই মনে করেন সাফল্য হঠাৎ আসে। কিন্তু রবিন খুদার জীবনী তার উল্টো প্রমাণ। তিনি বিভিন্ন প্রযুক্তি ও টেলিকম কোম্পানিতে কাজ করেছেন, নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পখাতকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ভবিষ্যৎ হবে ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। যখন অনেকেই বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছিল না, তখন তিনি ভবিষ্যৎকে দেখতে পেরেছিলেন।
২০১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন AirTrunk—একটি ডাটা সেন্টার কোম্পানি। কিন্তু শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করছিল না, ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে চাইছিল না, এমনকি একসময় তিনি নিজের অবসরকালীন সঞ্চয় (retirement savings) পর্যন্ত ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন। দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। অনেক মানুষ এমন পরিস্থিতিতে স্বপ্ন ছেড়ে দেয়। কিন্তু রবিন খুদা ছাড়েননি।
কয়েক বছরের মধ্যেই AirTrunk এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ডাটা সেন্টার কোম্পানিতে পরিণত হয়। কোম্পানিটি অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং হংকংয়ে বিস্তৃত হয়। এরপর ২০২৪ সালে AirTrunk প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে অধিগ্রহণ করা হয়, যা অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু রবিন খুদার সাফল্যের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিক হয়তো তাঁর সম্পদ নয়; বরং তাঁর মানসিকতা। তিনি বারবার বলেছেন যে কঠিন সময়েও ইতিবাচক থাকা, শেখা চালিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখা তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল।
আজ তিনি শুধু ব্যবসায়ী নন, একজন দাতা হিসেবেও পরিচিত। তিনি STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য ১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার দান করেছেন, যা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের অন্যতম বড় ব্যক্তিগত অনুদান।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা
যারা বিদেশে পড়তে যেতে চাও, মনে রেখো—বিদেশে যাওয়াটাই সাফল্য নয়। সাফল্য হলো বিদেশে গিয়ে নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তুমি পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় মূল্য সৃষ্টি করতে পারো।
রবিন খুদা যখন অস্ট্রেলিয়ায় গিয়েছিলেন, তখন তিনি জানতেন না যে একদিন বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি গড়বেন। তিনি শুধু জানতেন যে তাঁকে শিখতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে এবং সুযোগ এলে তা কাজে লাগাতে হবে।
আজ যদি তুমি IELTS-এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছ, অথবা বিদেশে নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করছ—তাহলে রবিন খুদার গল্প মনে রেখো।
একজন বাংলাদেশি তরুণ, যে ১৮ বছর বয়সে বিদেশে গিয়েছিল একজন সাধারণ ছাত্র হিসেবে, সে-ই একদিন অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি ইতিহাসের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছে।
