গণিত ও বিজ্ঞানের ভীতি কমাতে চালু হচ্ছে ডিজিটাল শিখন পদ্ধতি

গণিত ও বিজ্ঞানের ভীতি কমাতে চালু হচ্ছে ডিজিটাল শিখন পদ্ধতি
শেয়ার করুন:

ঢাকা, ২৯ জুলাই, ২০২৬  : দেশের দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় দক্ষতা বাড়াতে ‘ডিজিটাল শিখন পদ্ধতি’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অনুমতিতে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ‘ডিজিটাল গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষা প্রকল্প’-এর প্রি পাইলটিং কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের গণিত ও বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দীর্ঘদিনের ভীতি দূর করা, কোভিড মহামারি পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া শহর ও গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষার বৈষম্য হ্রাস, মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে বাস্তব প্রয়োগ, বিশ্লেষণ এবং সমস্যা সমাধানভিত্তিক একটি আধুনিক শিখন পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক পাঠদান দক্ষতা নিশ্চিত করা কর্মসূচির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বলে প্রকল্পের ধারণাপত্রে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর খান মাইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বাসস’কে বলেন, ‘মাধ্যমিক পর্যায়ে দুর্গম ও স্বল্প-সুবিধাপ্রাপ্ত এলাকার শিক্ষার্থীরা বিষয়ভিত্তিক দক্ষ পাঠদান, উপযুক্ত শিখনসামগ্রী ও স্বশিক্ষার সুযোগের অভাবে গণিত ও বিজ্ঞানে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে। কোভিড মহামারির কারণে এই শিখন বৈষম্য আরও বেড়েছে।’

তিনি জানান, জাইকার অর্থায়নে দেশের দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের ভীতি দূর করতে একটি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর এই কর্মসূচির সফলতার পর সারা দেশের সুবিধাবঞ্চিত এলাকার শিক্ষার্থীদের এই দুই বিষয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি কার্যকর ও সম্প্রসারণ মডেল তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, দক্ষ শিক্ষক ছাড়া শ্রেণিকক্ষের রূপান্তর সম্ভব নয়। এ প্রকল্পে ব্যবহৃত ডিজিটাল টিচিং গাইড শিক্ষকদের পাঠদান সক্ষমতা ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করবে।’

প্রকল্পের গঠন ও কাঠামো বিষয়ে মাউশি জানিয়েছে, ডিজিটাল ম্যাথ অ্যান্ড সায়েন্স এডুকেশন প্রজেক্ট ফর টিচারস অ্যান্ড স্টুডেন্টস ইন আন্ডার-রিসোর্সড রিমোট এরিয়াস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্পটি জাইকার অর্থায়নে ‘গ্রাসরুটস টেকনিক্যাল কো-অপারেশন’ ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে বাস্তবায়িত হবে। জাপানের অলাভজনক সংস্থা ‘ই-এডুকেশন’ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন যৌথভাবে প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও অংশীদার হিসেবে সহায়তা দিচ্ছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘ব্যাকবন লিমিটেড’।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাউশি অধিদপ্তরের পর্যালোচনার পর ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রকল্পের অনুকূলে আনুষ্ঠানিক অনাপত্তি দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং মাউশির সাথে সমন্বয় রেখে প্রকল্পের প্রতিটি ডিজিটাল কনটেন্টকে শতভাগ পাঠ্যবইয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে প্রণয়ন করা হবে।

মাউশি অধিদপ্তর জানায়, ২০২৫ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছর মেয়াদে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক আইসিটি টুল, প্রোটোটাইপ লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা বৈষম্য দূর করা হবে।

গত ২৪ ও ২৫ জুলাই চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার দুটি প্রতিষ্ঠান— বাজাপ্তী রমণী মোহন উচ্চ বিদ্যালয় এবং গন্ডামারা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রি পাইলটিং এর মধ্যে দিয়ে এ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা হয়। এই দুটি বিদ্যালয়ে পরিচালিত প্রাথমিক কার্যক্রমের পর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক সাড়ার ভিত্তিতে চাঁদপুরের সকল উপজেলাকে প্রাথমিক পাইলটিং এলাকা হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।

মাউশির সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বাসস’কে বলেন, পাইলট প্রকল্পে প্রতিটি স্কুল থেকে প্রায় ১৬০ জন শিক্ষার্থী সরাসরি অংশগ্রহণ করবে, যার মধ্যে নবম শ্রেণির ৮০ জন এবং দশম শ্রেণির ৮০ জন শিক্ষার্থী থাকবে। চাঁদপুর জেলায় পাইলটিং কার্যক্রমের ফলাফলের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪টি জেলায় এ প্রকল্পের আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, আমরা চাঁদপুর জেলার কার্যক্রমকে নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও ডিভাইসের বাস্তব সক্ষমতা এবং শিক্ষার্থীদের উপযোগী করেই কনটেন্টগুলো সহজবোধ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হচ্ছে। চাঁদপুরে পাইলট প্রকল্পের সফলতার ওপর ভিত্তি করে গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের ডিজিটাল শিখন পদ্ধতির মডেল দেশের ৬৪ জেলায় সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিন স্তরের প্রযুক্তিনির্ভর শিখন পদ্ধতি
প্রকল্পের ধারণাপত্র অনুযায়ী, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নবম ও দশম শ্রেণির ক্লাসরুমের পাঠদানের গুণগত মান উন্নত করা। বিশেষ করে যেসব স্কুলে অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষকদের পক্ষে গণিত ও বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সহজে বোঝানো কঠিন হয়ে পড়ে, মূলত সেসব স্কুলকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে।

মাউশি জানিয়েছে, প্রকল্পটির অধীনে একটি আধুনিক ‘লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস)’ বা শিখন ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম থাকবে, যা শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের ডিজিটাল উপায়ে একসূত্রে যুক্ত করবে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সহজেই বিভিন্ন পড়াশুনার উপকরণ, ক্লাস নোট ও অনুশীলন পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারবে। অন্যদিকে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অভিভাবকরাও নিজেদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই সন্তানদের পড়াশোনার দৈনিক অগ্রগতি ও উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন, যা শিক্ষায় পারিবারিক সম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিজিটাল শিখন পদ্ধতি শিক্ষকদের বিকল্প বা প্রতিস্থাপন হিসেবে নয়, বরং আধুনিক পাঠ্যক্রম অনুযায়ী তৈরি করা উন্নত ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে শিক্ষকদের নিজস্ব পাঠদান সক্ষমতা বৃদ্ধি করার একটি বিশেষ উদ্যোগ। এতে শিক্ষকেরা তাদের দৈনন্দিন ক্লাসের রুটিনের সাথে সহজে সমন্বয় করতে পারবেন। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে আকর্ষণীয় মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট উপস্থাপন করবেন এবং এরপর শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে মুক্ত আলোচনাসহ বিভিন্ন শিখন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। এর ফলে সুবিধাবঞ্চিত স্কুলের শিক্ষার্থীরাও সহজে বিজ্ঞানের জটিল ও কঠিন বিষয়গুলো হাসিমুখে আত্মস্থ করার সুযোগ পাবে।

প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কৌশল সম্পর্কে মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মীর জাহীদা নাজনীন বাসস’কে বলেন, জাইকা, বুয়েট ও ই-এডুকেশনের মাধ্যমে এ প্রকল্পের কার্যক্রম চাঁদপুর থেকে শুরু হচ্ছে। এর প্রাতিষ্ঠানিক দিকনির্দেশনা ও নীতিগত সমন্বয়ের কাজ করছে মাউশি। এছাড়া দেশে সাজেদা ফাউন্ডেশন ও খান একাডেমি বাংলাদেশ গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় ডিজিটাল কনটেন্ট ও ট্রেনিং নিয়ে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা চাচ্ছি জাইকা ও সাজেদা ফাউন্ডেশন পৃথকভাবে কাজ না করে একটি সমন্বিত কাঠামোর (একই ছাতার) নিচে এসে কাজ করুক। এতে করে একই স্কুলে কাজের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব হবে। সম্প্রতি আয়োজিত এক কর্মশালায় দুই পক্ষকেই একসাথে বসে একই ধরনের সমন্বিত ডিজিটাল পাঠদান রূপরেখা তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও লাইভ মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এ যৌথ উদ্যোগ সারা দেশের ৬৪টি জেলায় প্রসারিত করা হলে তা প্রত্যন্ত অঞ্চলের গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার চিত্র পুরোপুরি বদলে দেবে বলে মনে করেন তিনি।

মাউশি জানিয়েছে, প্রস্তুতি ও স্থানীয় পর্যায়ে সম্পৃক্ততার অংশ হিসেবে ‘ই-এডুকেশন’ এবং বুয়েট ইতোমধ্যে চাঁদপুর জেলার নির্বাচিত দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। স্থানীয় চাহিদা মূল্যায়ন, শ্রেণিকক্ষের বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন এবং গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় ডিজিটাল পদ্ধতি সমন্বয়ে শিক্ষকদের মানসিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।(বাসস)

শেয়ার করুন: