নিজস্ব প্রতিবেদক: পাবনার বেড়া উপজেলার কাশিনাথপুরে গড়ে ওঠা ইসলাহুল উম্মাহ একাডেমি’র আঙিনায় প্রবেশ করতেই দেয়ালের সাথে চোখে পড়ে একটি বিশাল বুকশেলফ, তার গা ঘেঁষে একটি দেয়ালিকা। মাথার ওপর লেখা— ‘ইসলাহুল উম্মাহ মুক্তপাঠাগার ও দেয়ালিকা’। কোনো বদ্ধ কক্ষে নয়, খোলা প্রাঙ্গণেই শিক্ষার্থীদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে এই পাঠাগার, যেখান থেকে ইচ্ছেমতো বই তুলে নিয়ে পড়তে পারে যে কেউ।
ইসলামি আদর্শ ও আধুনিক শিক্ষাচিন্তার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত বইয়ের পাশাপাশি পড়ানো হয় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নির্বাচিত কুরআন ও আরবি বইও। ফলে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের সঙ্গে শ্রেণিভিত্তিক কোরআন-হাদিসের পাঠও নিতে হয় শিক্ষার্থীদের। তবে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা-পরিকল্পনা কেবল শ্রেণিকক্ষেই থেমে থাকেনি। সিলেবাসে যুক্ত করা হয়েছে ড্রয়িং-ক্যালিগ্রাফি, স্পোকেন ইংলিশ, স্পোকেন অ্যারাবিক, আবৃত্তি, অভিনয় ও বিতর্কের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম, যাতে শিশুরা শুধু পরীক্ষার নম্বরের জন্য নয়, নিজেদের আবিষ্কার করার জন্যও শিখতে পারে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, শিশুকে প্রকৃত অর্থে জ্ঞানপিপাসু করে তুলতে হলে তার পাঠকে পাঠ্যবইয়ের সীমানায় বেঁধে রাখলে চলবে না। পাঠ্যবই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করে ঠিকই, কিন্তু ইতিহাস, বিজ্ঞান, গল্প, কবিতা ও উপন্যাসের মতো বিস্তৃত পাঠই একজন শিশুর জীবনকে বুঝতে শেখায়। সেই ভাবনা থেকেই পাঠাগারটিকে রাখা হয়েছে উন্মুক্ত পরিসরে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দমতো বই বেছে নিতে পারে এবং চাইলে অভিভাবকেরাও এখান থেকে বই পড়তে পারেন।
পাশের দেয়ালিকায় জায়গা পেয়েছে শিক্ষার্থীদের নিজ হাতে আঁকা ছবি, ক্যালিগ্রাফি, ছড়া ও কবিতা। এটিও নিছক কোনো প্রদর্শনী নয়, বরং শিশুদের কল্পনা ও সৃজনশীলতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
ইসলাহুল উম্মাহ একাডেমি’র অধ্যক্ষ সাদ বিন আব্দুর রউফ বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশ ও আলোকিত ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যেই একের পর এক এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনেও প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন উদ্যোগ আসবে বলে জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক সৈয়দা ইসমাত আরা জানান, পাঠাভ্যাস আরও আনন্দময় করে তুলতে প্রতি তিন মাস অন্তর পাঠক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যেখানে জেলার খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও লেখকদের উপস্থিতিতে সেরা পাঠকদের পুরস্কৃত করা হয়।
শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানায়, পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্পের বই হাতে এলেই তাদের কল্পনার জগৎ খুলে যায়—ইতিহাস পরিচয় করিয়ে দেয় অতীতের সঙ্গে, বিজ্ঞান শেখায় প্রশ্ন করতে, কবিতা ছুঁয়ে যায় অনুভূতিকে, আর উপন্যাস চেনায় জীবন ও সমাজকে নতুন করে।
প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ডক্টর মোস্তাফিজুর রহমান খানের মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বিজ্ঞানমনস্কতার এই সহাবস্থান, পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মুক্তপাঠের এই আয়োজন ইসলাহুল উম্মাহকে নিছক একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি স্বপ্নের কর্মশালায় পরিণত করবে।
