১.
ঢাকার ভাসানটেক সরকারী কলেজে যথাযথ আনুষ্ঠানিকতায় ৩১ অক্টোবর সোমবার আসন্ন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য দোয়া ও বিদায় অনুষ্ঠান এবং ঈদ-এ মিলাদুন্নবীর আয়োজন করা হয়। কলেজের স্বাধীনতা মিলনায়তনে বিদায়ী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে স্মৃতিচারণা, ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে কৃতি শিক্ষার্থীদের মাঝে বই পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ভাসানটেক সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন, বিশেষ অতিথি ছিলেন কলেজের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক আতিয়া খন্দকার এবং সভাপতিত্ব করেন কমিটির আহ্বায়ক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ রুমান খান। অনুষ্ঠানে বিদায়ী শিক্ষার্থীদের আবেগী স্মৃতিচারণা ছাড়াও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মোহন, হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম রারী,সহযোগী অধ্যাপক কামরুল হক। অনুষ্ঠানের শেষপর্বে কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মাশরাফির পরিচালনায় সকলের জন্য মঙ্গল কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।
২.
আলোচনায় অংশ নিয়ে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন ভাসানটেক সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন বলেন, তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যে আমি আবিষ্কার করি আমার সন্তানের মুখ। তোমাদের সফলতা আনন্দ, ব্যর্থতার বেদনা ছুঁয়ে যায় আমাকেও। আমি বিশ্বাস করি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কই পৃথিবীতে একমাত্র নি:স্বার্থ সম্পর্ক। কারণ একজন শিক্ষকের শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কিছুই পাওয়ার থাকে না। শিক্ষার্থীর সফলতাই একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনোই পরিপূর্ণ শিক্ষা হবে না, যদি এর সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতি, দেশ ও মাটিকে শিক্ষার্থীদের চিনাতে না পারি। আর তাই মানসম্পন্ন শিক্ষা,নৈতিক মূল্যবোধ,দেশপ্রেম-সর্বোপরি দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে তোমাদের গড়ে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টায় আমরা তোমাদের পাশে ছিলাম সবসময়। শুধু সফল মানুষ নয় একজন মানবিক ভালো মানুষ হিসেবে আর্তমানবতার সেবার ব্রতে উদ্ধুদ্ধ করে তোলার দায়িত্বটিও আমরা সচেতনভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি তোমাদেরকে সৃজনশীল,পরিমার্জিত,পরিশীলিত,চরিত্রবান,সংস্কৃতিবান আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্যও আমাদের সমবেত প্রয়াস ছিল সবসময়। অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন গভীর প্রত্যয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা একজন বিশ্ব নাগরিক হিসেবে,আন্তর্জাতিক মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে সচেষ্ট থাকবে। ভাসানটেক সরকারি কলেজের একজন গর্বিত শিক্ষার্থী হিসেবে মাথা উঁচু করে যেন একদিন দাঁড়াতে পার, মেধা,জ্ঞান আর মননে যেন সারা বিশ্বে তোমরা ছড়িয়ে পড়তে পার- তোমাদের জন্য আমার সেই শুভ কামনা, আশীর্বাদ রইলো।
৩.
আলোচনায় অংশ নিয়ে পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মোহন বলেন, তোমরা কলেজ জীবনের শিক্ষাপর্ব সমাপনে উচ্চতর জীবনদীক্ষার পথ অতিক্রান্ত করছো। যেখানে ‘পথে পথে পাথর বিছানো’ যেমন আছে, তেমনি আছে ‘আলো, মেঘের ফাঁকে ফাঁকে।’ তোমাদের জীবন থেকে স্বপ্ন দেখার ইচ্ছে যেন কখনো না মরে। নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ এবং আপেক্ষিক তত্ত্বের জনক বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বাণী ‘জ্ঞানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কল্পনা’ উল্লেখ করে তিনি আহ্বান জানান, তোমাদের জীবন থেকে যেন কখনোই অনুপ্রেরণার গল্পগুলো, নিজস্ব স্বপ্ন দেখা বা কল্পনাশক্তি যেন হারিয়ে না যায়। তোমাদের পাঠপ্রবণতাকে জাগ্রত রাখতে হবে। কনফুসিয়াসের ‘চিন্তাহীন পাঠ হচ্ছে পণ্ডশ্রম’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেবল বই পড়লেই হবে না, চিন্তাচর্চা নিরন্তর অব্যাহত রাখতে হবে। আবদুল্লাহ আল মোহন আরো বলেন, আলবার্ট আইনস্টাইনের আরেকটি স্মরণযোগ্য বাণী ‘সমস্ত কঠিন আর সমস্যার মাঝেই লুকিয়ে থাকে সেরা সুযোগটি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর মধ্যেই জীবনের মানে খুঁজে পাওয়া যায়। কেবল জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফলই জীবনের সবটা নয়, সঠিক জ্ঞানই নিজেকে প্রমাণ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। যুক্তিবাদী ও মানবিক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, রাষ্ট্র, সমাজ-সংসারে সুখ ও সমৃদ্ধি ঘটানোর জন্য জ্ঞান এক অপরিহার্য বিষয়। রাষ্ট্র ও সংগঠন পরিচালনার পরিকল্পনা তৈরির জন্য প্রয়োজন জ্ঞান ও বুদ্ধির সম্প্রসারণ। জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ করে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। দেশের স্থায়ী উন্নতির জন্য বিজ্ঞান চেতনার বিকাশ অপরিহার্য। সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র ও সংগঠনকে মানবিক করার জন্য কৌশল নির্ধারণে প্রজ্ঞাবান, জ্ঞানীদের জায়গা দেয়া উচিত। তবেই আমরা একটি সভ্য ও সুন্দর সমাজের অংশীদার হতে পারব। তাহলেই উন্নত দেশ আমাদের গণ্য করবে। তখনই অর্জিত হবে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’।
৪.
আলোচনাকালে সকলেই গভীর শ্রদ্ধায় মহানবীকে (সা:) স্মরণ করে বলেন, রাসুল (সা.) ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। আমাদের আচরণে যেন প্রকাশ পায় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, ‘প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠ পন্থা উত্তম আচরণ’। পবিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী পালনের গুরুত্ব তুলে ধরে সকরে বলেন,সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) সঠিক পথ পাবার জন্যে আমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে গেছেন। একটি হলো আল্লাহর কুরআন,আরেকটি হলো তাঁর সুন্নত বা সুন্নাহ। শিক্ষকগণ বলেন, জ্ঞান অন্বেষণের পথকে নবী (সা:) জান্নাতের পথ বলে ঘোষণা করেন। জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে হজরত আলী (রা:) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমত্তার (জ্ঞানের) চেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর নেই এবং মূর্খতার চেয়ে বড় দারিদ্র্য আর নেই। ভদ্র্রতার চেয়ে বড় উত্তরাধিকার আর নেই এবং পরামর্শের চেয়ে বড় সাহায্যকারী আর নেই।’
৫.
মানবিক গুণাবলি ও স্বপ্নগুলো বিকাশে শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরে শিক্ষকগণ বলেন, দেশ ও স্বাধীনতা সম্পর্কে প্রকৃত ইতিহাস যেন আমরা শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারি, যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দর্শন লালন করে ভবিষ্যতে দেশকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার ক্ষেত্রে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আর তাই স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের সঠিক ইতিহাস সবাইকে পড়তে হবে। আমাদের ভাষার ইতিহাস পড়তে হবে। অবশ্যই সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তেই হবে। আলোচকগণ আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁর একটি ভাষণে বলেছিলেন ‘শিক্ষিত জনশক্তি দেশের সম্পদ। আমি বাংলাদেশে এমন শিক্ষার প্রসার চাই,যা দ্বারা প্রতিটি নাগরিক দেশের প্রয়োজনে ও চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে গড়ে তুলতে পারে।’ আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষিত হয়ে তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন সোনার মানুষ হয়ে উঠবে এবং বঙ্গবন্ধুর কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য অবদান রাখবে, আমৃত্যু সক্রিয় থাকবে। একরাশ শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা তোমাদের সকলের জন্য। তোমাদের ভবিষ্যৎ মসৃণ হোক,উজ্জ্বল হোক- শুভ কামনা তোমাদের সবার জন্য।
আবদুল্লাহ আল মোহন
সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ভাসানটেক সরকারি কলেজ, ঢাকা
৩১ অক্টোবর ২০২২
