বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার এর সাক্ষাৎকার

শেয়ার করুন:

প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার একজন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপিস্ট চিকিৎসাব্যবস্থাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। পাশাপাশি দেশ প্রেমিক এই চিকিৎসক নিরলসভাবে সেবামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। তরুণপ্রজন্ম যেন মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও দেশ গঠনে তাদের কার্যক্রম জানতে পারে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে সেজন্য মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে তার একান্ত সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো:

প্রশ্ন- আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। স্যার, কেমন আছেন?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: ওয়ালাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।

প্রশ্ন- স্যার, আমরা জেনেছি আপনি একজন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করে দেশ স্বাধীন করেছেন। আবার দেশের উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি বেড়ায় অর্থমন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ কর্তৃক বরাদ্দকৃত প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে যে ডায়াবেটিস হাসপাতাল নির্মাণাধীন রয়েছে, তার জন্য আপনি প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের ০.১৪ একর জায়গা দান করেছেন। এছাড়া ফেসবুক, ইউটিউব ও দূরদর্শনের মাধ্যমে লক্ষ কোটি মানুষের কাছে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। আজকে আমরা পাঠকদের জন্য আপনার নিকট হতে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে একটি স্বাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে চাই। প্রথমে আপনার পরিচয় বলবেন কি?

প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: ধন্যবাদ! আমার নাম প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার পিতার নাম মরহুম আবু হোসেন সরকার, মাতার নাম নূরজাহান সরকার। পাবনা জেলার বেড়া পৌরসভার প্রাণকেন্দ্র সম্ভুপুরে ১৯৫৪ সালের ৪ ডিসেম্বরে আমার জন্ম।

প্রশ্ন- স্যার, আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: বেড়া বিবি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৭০ সালে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ১৯৭২ সালে। অতঃপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিওথেরাপি বিভাগে ভর্তি হয়ে ১৯৭৯ সালে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করি। এরপর পিপলস ইউনিভার্সিটি হতে ফিজিক্যাল এডুকেশন বিষযে মাস্টার্স এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমডি সম্পন্ন করেছি। বর্তমানে আমি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পিএইচডি ফেলো।

প্রশ্ন- আপনি তো একজন মুক্তিযোদ্ধা, কখন, কিভাবে, কার অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই মার্চ এপ্রিলেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। ৭নং সেক্টরের কর্নেল নুরুজ্জামানের অধীনে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি; আমার লাল মুক্তিযোদ্ধা বার্তা- এফ.এফ.নাম্বার- ০১৩১১০৫০০৯৮ বাংলাদেশ, আই.ডি নং/বারকুট কোড- ০৫০৪০৬০০২৭, গেজেট নং-১৪৮৬ এবং সনদপত্র নং- ম ২০৮৩৬।

প্রশ্ন- স্যার, আপনি কার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে যেতে অনুপ্রাণিত হন?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: আমার চাচা বীরমুক্তিযোদ্ধা তাহেজ আলী সরকার তখন প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে অবস্থান করছিলেন। তিনি একটি চিঠি লিখেন আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে যাবার জন্য। চিঠিটা বহন করে আমাকে পৌঁছে দেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইসহাক আলী। উক্ত পত্র পেয়ে আমরা ১৫-১৬ জন প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে রওনা হই, যাদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল ওহাব, তার ভাই সবর আলী প্রমূখ। তবে কয়েকজন পথিমধ্যে ফিরে আসেন।

প্রশ্ন- বেড়া হতে ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য কিভাবে গেলেন?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: আমরা বেড়া হতে রাতে শাহজাদপুরের যমুনা তীরবর্তী গ্রাম টারুটিয়া গেলাম। সেখানে পূর্ব পরিচিত আব্দুর রহমানের বাড়ীতে রাত্রিযাপন করে ভোরে একটি নৌকা ভাড়া করলাম এবং ঐ এক নৌকায় চরে গেছি ইন্ডিয়ায়। টারুটিয়া থেকে বেলকুচি-টাঙ্গাইল হয়ে আস্তে আস্তে নদীর ঘেসে এখানে ওখানে অবস্থান করে চলে গেছি। পথে কয়েক জায়গায় কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে পড়েছি কিন্তু আমাদের সাথে থাকা পরিচয়পত্র দেখিয়ে ছাড়া পেয়েছি। রাস্তায় কাদার মধ্যে গুন টেনেছি, প্রচন্ড ক্ষুধা, ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে সতর্কতার সাথে চলেছি।

প্রশ্ন- পথে খাবারের ব্যবস্থা কেমন ছিল?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: রাস্তায় খাবারের ভীষণ কষ্ট হয়েছে। সাথে থাকা কিছু চাউলসিদ্ধ করে শুকনামরিচ পুড়িয়ে খেয়ে ফেলেছি। এক দিনের ঘটনা, সাথে কোনো রকমের খাবার নেই, বিকেলে গেছি বেলকুচির এক গ্রামে কিছু চাউল কালেকশনে।এক বাড়িতে গিয়ে কিছু চাউল চাইলাম এর মধ্যে দেখলাম এক মুরব্বী লোক গায়ে হাতাওয়ালা গেঞ্জি লুঙ্গি পরা ও কাঁধের উপর জামা ফেলানো। লোকটি দৌড়ে এসে আমাকে বললেন, বাবা তোমরা কার মার সন্তান? তোমরা চাল উঠাচ্ছো?এখনই যদি রাজাকাররা জানতে পারে, তোমাদের ধরে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলবে। লোকটি ঐ বাড়ি থেকে এক কাঠা চাউল দিয়ে বললো, নিয়ে যাও, “এটা নিয়ে কোনোভাবে সিদ্ধ টিদ্ধ করে খাও গিয়ে।” ওটাই নিয়ে আসলাম রাতের খাবার হিসেবে। চাউল তো পেলাম; ডাউল নাই, কী দিয়ে খাব? আবারো সেই শুকনো মরিচ পুড়ানো। রাতের খাবার খেয়ে আস্তে -আস্তে নদীর গা ঘেঁষে ঘেঁষে টাঙ্গাইলের পাশ দিয়ে বাহাদুরবাদ চলে গেলাম। বাহাদুরবাদ পার হতে হবে পূর্ব দিক থেকে,পশ্চিম দিকে হলো গাইবান্ধা জেলা।আমাদের পার হতে হবে পূর্ব দিক দিয়ে। আমরা খবর পেলাম,গতকাল এখান দিয়ে পার হওয়ার সময় পাকিস্তানী আর্মিরা গানবোট থেকে গুলি করে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে মেরে ফেলেছে। তার আগেও এরকম হয়েছে। এখন আমরা তো ভয়ে অস্থির। যদি বাহাদুরবাদ থাকি তাহলে আমাদেরকে ধরে নিয়ে যেতে পারে। যদি পার হতে যাই, আর্মিরা গানবোট থেকে গুলি করে মেরে ফেলবে। বেড়ায় ফিরে যাওয়ারও সুযোগ নেই। এলাকায় জানাজানি হয়ে গেছে আমরা মুক্তিযুদ্ধে গেছি। একটা অস্থিরতা কান্না,তারপরেও আমরা একটা চান্স নিলাম। তখন দুপুর প্রায় ১টা। এ সময়টায় খায় ওরা। আমরা চাচ্ছিলাম,এই খাওয়ার সময় যদি পার হয়ে যাই, তাহলে ওরা আমাদেরকে দেখবে না এবং তাই হলো। আমরা খাওয়ার সময় দুপুর দেড়টা/পৌনে দুইটার দিকে পার হয়ে ঢুকে পড়লাম কুড়িগ্রামের একটি নিরাপদ এলাকায়। অল্পঅল্প পানি আছে,আমাদের নৌকা এখন আস্তে চলছে। তখন কী খুশি আমরা! আমরা খুশিতে আত্মহারা কিন্তু আমাদের প্রচন্ড ক্ষুধা। কীখাবো! কীখাবো! তারপর সন্ধ্যা হয়ে গেলো। না খেয়েই শুয়ে থাকলাম। খাবার কেনারও কোথাও জায়গা নেই। পরের দিন আস্তে আস্তেÍ আমরা ইন্ডিয়ার মানকের চরের কাছে গেলাম। গিয়ে ওখান থেকে কলা-পাউরুটি কিনলাম। একজন বললো যে, বেশী কলা খেলে জ্বরআসে। কিন্তু প্রচন্ড ক্ষুধা।আমার কাছে ছিলো আমার বাবার ধান বিক্রির ১৭ টাকা। সেখান থেকে এক টাকা খরচ করে কলা ও রুটি কিনে খেলাম সবাই। ইসহাক কাকার ঋণ ভুলবার নয়। সে আমাদের না নিয়ে গেলে হয়তো যেতেইনপারতাম না। আমরা ওখানে গিয়ে একটি ক্যাম্পে উঠলাম। ক্যাম্পটি ছিলো রৌমারীর একটি স্কুলে। তার পাশেই ইন্ডিয়ার বর্ডার মানকের চর। প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটা করে রুটি দিতো যে রুটি অন্ধকারে খাওয়া যেতো, কিন্তু আলোতে খাওয়া যেতো না। কারণ তেলাপোকা, ময়লা, এটা সেটা থাকতো। সারাদিন পর একটি রুটি। একটি রুটিতে হতো না, দুইটা চাইলে দিতো না। এর মধ্যে দেখা হলো সাঁথিয়ার নিজাম ভাই ও আমার ফুটবল খেলার সাথী সিনিয়র বন্ধু আনোয়ারুল করিম মিন্টু যিনি পরবর্তীতে শহীদ হন। নিজাম ভাই আমাকে এক প্যাকেট পানাম সিগারেট এবং মিন্টু দুইখানা রুটি দিলো। ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাবার দেওয়া ১৭ টাকা থেকে ১ টাকা, আট আনা করে খরচ করি আর বাকিটা রেখে দেই, যদি আবার কখনও খুব বিপদে পড়ে যাই। তাহেজ কাকার কাছে কখন পৌঁছাবো ঠিক নাই।

প্রশ্ন- পশ্চিমবঙ্গে কিভাবে, কখন গেলেন?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: মানকের চরে ১০/১২ দিন থাকার পর আমাদের পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার অর্ডার হলো। আমরা যাওয়ার জন্য রওনা হলাম। মানকের চর হতে আসামের একটি শহর দুপরীতে আসলাম বাসে করে। ভাঙ্গা রাস্তা, মাঝে মাঝে লেখা ছিলো, রাস্তা ভাঙ্গা, গাড়ির হেরহেচালো (আস্তে আস্তে চালাও)। বেশ কয়েক ঘন্টা গাড়ি চলার পরে আমরা এসে একটি নদীতে পৌছলাম। ওখান থেকে আমাদেরকে একটি লঞ্চের মত স্টীমারে উঠানো হলো। দীর্ঘক্ষণ পথ চলে একটি তীরে এসে ভিড়লো। যেখান থেকে আমাদেরকে একটি রেল স্টেশনে নিয়ে আসলো। প্রচণ্ড ক্ষুধার যন্ত্রণায় শেষ হয়ে যাচ্ছি। আট আনার বিস্কুট কিনলাম আর আট আনা দিয়ে ফল কিনে সবাই খেলাম। মানে আমার পয়সা কিছু, ওদের পয়সা কিছু। এরপর ট্রেনে উঠলাম যেটি আমাদেরকে রাত্রিতে একটি স্টেশনে নামিয়ে দিলো। নামার পর আমাদেরকে একটি অনাথ আশ্রমে নিয়ে গেলো। সেখানে আমাদেরকে পানি পানি ঝোল সবজি খিচুড়ি খাওয়ালো। মনে হলো যে বেহেশতের খাবার খাচ্ছি। এবং কী পরিমাণ খাইছি এটা কল্পনার বাইরে। সকালে আবার ট্রেনে উঠলাম। সারাদিন ট্রেনে চলার পর নিউ শিলিগুড়ি স্টেশনে নামলাম। তাহেজ চাচা আমাদের রিসিভ করে একটি খাবারের হোটেলে নিয়ে গেলেন। ইলিশ মাছ দিয়ে খাওয়া, কিন্তু ঐ দোকানদার খাবারের মধ্যে বালির মতো কিছু একটা দিয়েছে। ভালো করে খেতে পারলাম না। কিন্তু টাকা ঠিকই দিতে হলো। এর পরবর্তীতে ট্রেন ধরে আমরা চলে আসলাম বালুচর ঘাটের দিকে। সেখানে এসে দেখা হয় বৃন্দাবন ভবনের মালিক অনিল বাবুর সঙ্গে। যিনি ৬৯/৭০ এর দিকে বেড়া থেকে এখানে চলে এসেছিলেন। তিনি আমাদেরকে একটি ভালো হোটেলে নিয়ে পেটপুরে খাওয়ালেন। সেখান থেকে একটি বাসে উঠে রিসিভশন ক্যাম্পে আসলাম।

প্রশ্ন- স্যার, রিসিভশন ক্যাম্প সম্পর্কে কিছু বলুন।
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: রিসিভশন ক্যাম্প ছিলো একটি ট্রেনিং ক্যাম্প। যার দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। রাত্রিতে ক্যাম্পে পৌঁছালে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি হলো না; ফলে ক্যাম্পের বাইরে বেঞ্চের উপর শুয়ে বসে রাত কাটালাম। পরদিন সকালে আমাদেরকে ক্যাম্পে নাম লেখানো ও প্রয়োজনীয় কাজ শেষে কয়েকদিন ট্রেনিং হলো। এখানে ট্রেনিং শেষে আমাদেরকে হায়ার ট্রেনিং- এ পাঠানো হলো। অধ্যাপক আবু সাইয়িদের ক্যাম্পে যথেষ্ঠ পরিমাণে খাবারের ব্যবস্থা ছিলো। উনার এক ভাগিনা ছিলো নাম বাঘা, রাজশাহী মেডিকেলের ছাত্র ছিলো। তিনি আমাদেরকে অনেক যত্ন করেছেন বেড়ার মানুষ হিসেবে। তখন আবু সাইয়িদ সাহেব আামাদের বেড়া-সাঁথিয়া ও সুজানগরের MNA (Member of National Assembly) তিনি আমাদের উচ্চতর ট্রেনিং-এর জন্য পাঠালেন।যাবার সময় তিনি আমাকে ১৫ টাকা দিয়ে একটি ভাউচারে স্বাক্ষর নিয়ে নিলেন। লিখে নিলেন “১৫ (পনের) টাকা বুঝিয়া পাইলাম”। উল্লেখ্য যে, আমার বাবা আবু হোসেন সরকার অধ্যাপক আবু সাইয়িদ সাহেবকে ফুটবল খেলা পরিচালনায় আর্থিক সহায়তা করতেন। বিশেষত: হারিয়ানা সুগার মিল টিমের পুরো খরচই বহন করতেন আমার বাবা। কিন্তু তিনি যখন ১৫ টাকা দিয়ে ভাউচারে স্বাক্ষর নিলেন তখন খুব কষ্ট পেলাম। তারপরেও তাকে ধন্যবাদ যে, তিনি ঐ পরিস্থিতিতে টাকাগুলো দিয়েছিলেন।

প্রশ্ন- উচ্চতর ট্রেনিং সম্পর্কে কিছু বলবেন?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: হ্যাঁ! আমরা অধ্যাপক আবু সাইয়িদের ক্যাম্প থেকে উচ্চতর ট্রেনিং এর জন্য অন্য একটি ক্যাম্পে গেলাম। সেখানে প্রায় এক মাসের কঠোর ট্রেনিং চললো। খাওয়া-দাওয়ার সমস্যা ছিলো তবে মানকের চরের মতো ততোটা সমস্যা ছিলো না। ট্রেনিং শেষে আমাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের জন্য পাঠানো হলো।

প্রশ্ন- উচ্চতর প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন কিভাবে?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: প্রশিক্ষণ শেষে আমি সোজা চলে আসলাম তাহেজ চাচার বাসায়। চাচা তখন সপরিবারে স্ত্রী ৪ ছেলে ও ১ মেয়েকে নিয়ে পাঁচবিবি বর্ডারের একটি হিন্দু বাড়িতে থাকতেন। বাড়িটি ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। সেখানে অবস্থান করে আমরা বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিতাম।

প্রশ্ন- মুক্তিযুদ্ধকালীন সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ ও স্মরণীয় একটি ঘটনা বলুন।
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: হ্যাঁ! নভেম্বরের ২২ তারিখে দুপুর বেলা গোসল করছিলাম। এমন সময় খবর এলো আমাদের ক্যাম্প রাজাকাররা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ঘরে তো অস্ত্র থাকতো সব সময়, ওখান থেকে আমি একটা ও চাচাএকটা অস্ত্র নিয়ে ২ জনই লুঙ্গি পরে কাছা দিয়ে গিয়ে দেখলাম খুব ভয়াবহ অবস্থা, পাকিস্থান আর্মি রাজাকারদের সাথে মুভ করছে। শতশত আর্মি চলে আসছে। আমরা যে বাড়িতে থাকতাম ওখানে আর্মি র্মটার বসাইছে। কঠিন অবস্থা, আমরা দেখলাম রাজাকাররা লোকজনকে মারপিট করছে মহিলাদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছে, গুলি করছে, লাথি মারছে, প্রচন্ড একটি বিভিষিকাময় অবস্থা। সেখানে গিয়েই চাচাকে হারিয়ে ফেললাম। আমি একটি পুকুরের কচুরিপানার মধ্যে ঢুকে গুলি করে ৩ জন রাজাকারকে মেরে ফেললাম। মারার পর ওরাতো আমাকে খুঁজতেছে। কোত্থেকে গুলি আসলো? সে কোথায় গেলো? এগুলো বলে চিল্লাচ্ছে। আমি তো শেষ, আমি নাই,আরও রাতে আমাকে খুঁজে পাবে, আমাকে মেরে ফেলবে। আমি কোনভাবে কচুরীপানার মধ্যে নাক উঁচু করে ওর মধ্যে আটকে আছি। পায়ে, হাতে, পিঠে কী যেন কামড়াচ্ছে। পরবর্তীতে দেখলাম ওগুলো ছিলো জোঁক। যখন আমি কচুরীপানার মধ্যে থেকে বের হই তখন রাত বাজে দশটা। ওখান থেকে বের হয়ে আস্তে আাস্তে এসএমজিটা নিয়ে বাসায় ফিরলাম। এসে দেখি চাচা নাই ভাবলাম- চাচা শেষ,চাচা মারা গেছে। চাচী কাঁদতেছে ছোট ছোট বাচ্চারা গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে… কী এক অবস্থা!হৃদয় বিদারক পরিস্থিতি। রাত্রি সাড়ে এগারটার সময় দেখা গেল দূর থেকে একটা লোক খালি গায়ে কাঁধে এসএমজি নিয়ে কাছামেরে ধীর পায়ে আসছে। কাছে আসতে বুঝলাম তাহেজ চাচা বেঁচে আছেন। মুক্তিযোদ্ধা তাহেজ উদ্দিন সরকার ছিলেন আমার বাবার সহোদর ভাই। এ ঘটনার পর একটি আশাজাগানো সুসংবাদ পেলাম।

প্রশ্ন- সুসংবাদটি কী ছিলো?
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: ২৫ নভেম্বর খবর পেলাম আমাদের সকল মুক্তিযোদ্ধাকে একটি মাঠে যেতে হবে সেখানে ড. মফিজ চৌধুরী নামে প্রবাসী আওয়ামীলীগ সরকারের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন। তিনি ছিলেন প্রিন্স কোম্পানীর মালিক। পরবর্তীতে যিনি বঙ্গবন্ধুর ক্যাবিনেটের মন্ত্রী হয়েছিলেন। উনি আমাদেরকে খুব ভালো খাবার দিলেন যা আজও মনে আছে। আল্লাহ উনাকে বেহেশত নসীব করুন। ভালো খাবার তো পেতাম না। উনি বললেন “আপনারা বিশ্বাস করেন আর নাই করেন মনে রাখবেন ডিসেম্বরে আমরা দেশে পৌছে যাব ইনশাআল্লাহ। আমরা ২ তারিখে পাঁচবিবিতে পৌছে গেলাম। ৬ তারিখে ইন্ডিয়ায় স্বীকৃতি দিল। আমরা পাঁচবিবিতে যখন উল্লাস করে আসছি তখন আমাদের এক সাথী আব্দুল মজিদের পা মাইন বিষ্ফোরণে উড়ে গেলো।
তাহেজ চাচা আমাদেরকে রাস্তা দেখায়ে দেখায়ে সতর্কতার সাথে পাচবিবি শহরে নিয়ে আসলেন। যখন আমরা পাঁচবিবি পৌঁছলাম সারা শহরে হর্ষ ধ্বনি ফুলের মালা দিয়ে আমাদেরকে বরণ করে নিল সহস্র জনতা। “বারবার আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি” বাজছিলো প্রবাসী রেডিওতে।

প্রশ্ন- আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার: আপনাকেও ধন্যবাদ।

স্বাক্ষাৎকার গ্রহণ : ড. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, সহকারী অধ্যাপক, বোয়ালমারী কামিল মাদ্রাসা, সাঁথিয়া, পাবনা।

শেয়ার করুন: