আলাউল হোসেন
পাবনার এক প্রত্যন্ত গ্রামের ভ্যানচালক রিপন সেখ যেদিন কষ্টের টাকা জমিয়ে ছেলের হাতে মোবাইল ফোনটি তুলে দিয়েছিলেন, সেদিন তার বুকে ছিল স্বপ্ন। কারণ তার একমাত্র ছেলে আলিফ, জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে গোটা পাবনা জেলায় প্রথম হয়েছিল। একজন নিরক্ষর ভ্যানচালকের ঘরে এমন মেধাবী সন্তান— এ যেন স্বপ্নের চেয়েও বড় সত্য। কোভিড-১৯-এর দাপটে যখন স্কুল বন্ধ, অনলাইন ক্লাসের জোয়ার এসেছে, তখন দশম শ্রেণিতে পড়া আলিফের হাতে ফোন না দিলে পিছিয়ে পড়বে— এই ভয়ে বাবা ঋণ করে হলেও ফোন কিনে দিয়েছিলেন। অশিক্ষিত বাবা-মা ভেবেছিলেন, ছেলে সারাদিন ফোনে চোখ রেখে নিশ্চয়ই পড়াশোনা করছে। কিন্তু আলিফের চোখ তখন পাঠ্যবইয়ে নয়, আটকে গিয়েছিল স্ক্রিনের অন্য এক মায়াবী জগতে। এসএসসিতে অটোপাস জুটেছিল বটে, কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকের দেয়াল পেরোনো আর হয়নি। পাবনার সেই উজ্জ্বল নক্ষত্র আজ নিভে গেছে— শুধু একটি মোবাইল ফোনের নেশায়। আলিফের গল্প কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি কোভিড-পরবর্তী বাংলাদেশের হাজারো মেধাবী শিশুর করুণ জীবনকাহিনি।
এই বাস্তবতার মাঝেই সরকার আবার সেই পথে হাঁটতে চাইছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অজুহাতে স্কুল-কলেজে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তথাকথিত ‘অল্টারনেটিভ ডে’ মডেলে একদিন শ্রেণিকক্ষে, পরের দিন ঘরে বসে ডিভাইসের সামনে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে নীতিগত আলোচনা সম্পন্ন এবং মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব উত্থাপনও হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— যে পথে একবার হেঁটে আমরা হোঁচট খেয়েছি, সেই পথেই কি আবার যাত্রা শুরু করতে হবে?
গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড়। অভিভাবকদের কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট বেদনা। রোজা ও ঈদ মিলিয়ে প্রায় দেড় মাসের ছুটির পর সবেমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। বছরের তিন মাস পার হয়ে গেছে, তেমন কোনো ক্লাসই হয়নি। একজন অভিভাবক লিখেছেন, ‘কেবল স্কুল খুলেছে। এখন যদি ক্লাস আবার বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষার্থীদের খুবই ক্ষতি হবে। ছুটিতে বা বাড়িতে বসে থাকলে তারা পড়াশোনা করতে চায় না।’ অন্য আরেকজন বলেছেন, ‘সরকারকে বলবো হোম অফিস করুন, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আর ক্ষতি করবেন না। করোনায় অনলাইন ক্লাস, অটোপাস দিয়ে তিন-চার বছর কিছুই শেখেনি আমার ছেলে। আলিফের ঘটনা আমাদের সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, অনলাইন ক্লাসের নামে কী বিপত্তি ঘটতে পারে।’
ফেসবুকে অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন, জানুয়ারির প্রথম ১৫ দিন পাঠ্যবই বিতরণ ও অন্যান্য কাজে ক্লাস হয়নি। পরে ১০ দিন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। ফেব্রুয়ারিতে মাত্র পাঁচ দিন ক্লাস হয়েছে। মার্চ প্রায় পুরোটা ছুটিতে কেটেছে। এপ্রিলেই পুরোদমে ক্লাস হওয়ার কথা ছিল। সেই ক্লাস আবার বন্ধ করে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত? তিন মাসে যা পড়ানোর কথা, তার সামান্যই পড়ানো সম্ভব হয়েছে। এই শিক্ষার ঘাটতি পূরণের পথ যদি হয় আবারও অনলাইনের আশ্রয়, তাহলে সেটি সমাধান নয়, সমস্যার নতুন আবর্তন।
কোভিড-১৯-এর সময়ের অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে এখন আর অনুমানের বিষয় নয়, তথ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট ২০২২’-এর প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দেখিয়েছে, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা বাংলা ও গণিতে শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপে উঠে এসেছে, অনলাইন ক্লাসের সময়কালে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার ও শিশুশ্রম দুটোই বেড়েছে। ময়মনসিংহের মতো দরিদ্র ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা পিছিয়ে পড়েছে আরও বেশি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পরামর্শক কমিটির প্রধান অধ্যাপক মনজুর আহমদ সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনলাইন শিক্ষার অভিজ্ঞতা মোটেও ভালো নয় এবং সেই সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যা আজও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি।
অনলাইন শিক্ষার সমস্যা কেবল শিখন ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের সন্তানদের কাছে স্মার্টফোন বা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ— দুটোই বিলাসিতা। দেশের অর্ধেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসে অংশ নেওয়ার সক্ষমতাই রাখে না। ফলে এই ব্যবস্থা শিক্ষায় যে বৈষম্য তৈরি করে, তা দীর্ঘমেয়াদে সমাজকে আরও অসম করে তোলে। আর যারা ডিভাইস পায়, তাদের একটি বড় অংশ সেটিকে পাঠ্যক্রমের বাইরে ব্যবহার করতে শুরু করে— আলিফের মতো। ইতিমধ্যে কিছু মোবাইল কোম্পানি মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা আগাম জমায় ছয় মাসের কিস্তিতে বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকার ফোন বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে। দরিদ্র অভিভাবকদের সন্তানের ‘পড়াশোনার প্রয়োজনে’ ঋণের জালে জড়িয়ে যাওয়ার এই পথ নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
তাছাড়া একটানা স্ক্রিনের সামনে থাকায় চোখ ব্যথা, মাথাব্যথা, ঘাড় ও পিঠের সমস্যা শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কের অভাবে মানসিক একাকীত্ব বাড়ে। শ্রেণিকক্ষের সেই সজীব পরিবেশ, শিক্ষকের তাৎক্ষণিক সংশোধন, সহপাঠীর সঙ্গে আলোচনা— এসব কিছুই অনলাইনে অনুপস্থিত। বিজ্ঞানের ব্যবহারিক ক্লাস অনলাইনে করা আদৌ সম্ভব নয়। এই বাস্তবতা স্বীকার করে প্রস্তাবেই ব্যবহারিক ক্লাসগুলো সশরীরে রাখার কথা বলা হয়েছে— যা প্রমাণ করে, সরকারও জানে অনলাইন ক্লাস সব শিক্ষার বিকল্প নয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন উঠছে— জ্বালানি সাশ্রয়ের দায় কেন শুধু শিক্ষার্থীদের বহন করতে হবে? রাষ্ট্রের বিলাসিতামূলক ব্যয়, সরকারি দপ্তরের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, রাজনৈতিক আয়োজনের জৌলুস— এসব অব্যাহত রেখে কেবল কোমলমতি শিশুদের শ্রেণিকক্ষ বন্ধ রাখাটা কি ন্যায়সংগত? যদি সত্যিই জ্বালানি সংকট থাকে, তবে সমাধান খুঁজতে হবে সামগ্রিক পরিকল্পনায়— শিক্ষাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে নয়।
তবে সমাধান একেবারে অসম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে পরিণত, প্রযুক্তি-সচেতন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণে সক্ষম। পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের অনার্স-মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের জন্য তাত্ত্বিক ক্লাসগুলো অনলাইনে নেওয়া যেতে পারে। এতে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, শিক্ষাও ব্যাহত হবে না। কিন্তু প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য এই মুহূর্তে অনলাইন ক্লাসে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আলিফের মতো মেধাবী শিশুরা এ দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সম্ভাবনাকে ক্ষণিকের সুবিধার বেদিতে বলি দেওয়া জাতির জন্য আত্মঘাতী। সরকারের কাছে আবেদন— আরও ভেবে, আরও সাবধানে এই সিদ্ধান্ত নিন। শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিন, কারণ একটি জাতির উত্থান-পতন নির্ধারিত হয় তার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দিয়েই।
