ইসলামিক স্কুলের আঙিনা মুক্তপাঠের জানালা”

শেয়ার করুন:

অলোক আচার্য

শিশুর হাতে যখন একটি বই ওঠে, তখন তা কেবল কয়েকটি পৃষ্ঠা খুলে দেয় না— খুলে দেয় একটি নতুন পৃথিবী। গল্পের বই শিশুকে কল্পনা করতে শেখায়, কবিতা অনুভব করতে শেখায়, ইতিহাস তাকে অতীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান তার মনে প্রশ্ন জাগায়, আর উপন্যাস তাকে মানুষ ও সমাজকে নতুন চোখে দেখতে শেখায়। তাই একটি শিশুকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত করে তুলতে হলে তাকে শুধু পাঠ্যবই পড়ালেই হয় না; তার হাতে তুলে দিতে হয় বিচিত্র জ্ঞানের চাবিকাঠি।
এই ধারণা থেকেই ব্যতিক্রমী একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছে পাবনার বেড়া উপজেলার কাশিনাথপুরের ইসলাহুল উম্মাহ একাডেমি ও ক্যাডেট মাদরাসা।

প্রতিষ্ঠানটির আঙিনায় ঢুকতেই খোলা আকাশের নিচে গড়ে উঠেছে ‘ইসলাহুল উম্মাহ মুক্তপাঠাগার ও দেয়ালিকা’। কোনো বদ্ধ কক্ষে তালাবদ্ধ বই নয়, বরং শিক্ষার্থীদের চোখের সামনে, তাদের হাতের নাগালে সাজানো হয়েছে প্রায় এক হাজার বই। পাশে দেয়ালিকা—যেখানে ফুটে উঠেছে শিশুদের আঁকা ছবি, ক্যালিগ্রাফি, ছড়া ও কবিতা। পুরো আয়োজনটি বলে দেয়— শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালে বন্দি কোন বিষয় নয়।

আমাদের দেশে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে একটি প্রচলিত ধারণা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে—এখানে ধর্মীয় জ্ঞানই মুখ্য, সৃজনশীল সাহিত্য বা বিজ্ঞানভিত্তিক মুক্তপাঠের সুযোগ তুলনামূলক কম। বাস্তবতার সবখানে হয়তো এই ধারণা প্রযোজ্য নয়, কিন্তু এমন একটি সামাজিক ধারণা যে রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই জায়গায় ইসলাহুল উম্মাহর মুক্তপাঠাগার নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
বার্তাটি হলো— ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মুক্তচিন্তা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। কোরআন-হাদিসের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি একজন শিশু বিজ্ঞান পড়তে পারে, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের কবিতা পড়তে পারে, গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, ইতিহাস জানতে পারে, পৃথিবীর নানা সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে। বরং বিস্তৃত জ্ঞানই তাকে আরও পরিণত, বিবেচনাশীল ও মানবিক করে তুলতে পারে।

ইসলাহুল উম্মাহ একাডেমির শিক্ষা-পরিকল্পনায় সেই সমন্বয়ের একটি স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত সিলেবাসের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা পড়ছে নির্বাচিত কোরআন ও আরবি বই। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ড্রয়িং-ক্যালিগ্রাফি, স্পোকেন ইংলিশ, স্পোকেন অ্যারাবিক, আবৃত্তি, অভিনয় ও বিতর্কের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম। অর্থাৎ শিশুকে শুধু পরীক্ষার্থী হিসেবে তৈরি না করে তার ভেতরের মানুষটিকেও গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত ‘মুক্তপাঠাগার’ ধারণাটিই। একটি শিশুকে বই পড়তে বলা আর তার সামনে নিজের পছন্দের বই বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া— দুটি এক বিষয় নয়। স্বাধীনভাবে বই বেছে নেওয়ার সুযোগ শিশুর মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি করে। সে বুঝতে শেখে, বই পড়া কোনো শাস্তি নয়, কোনো পরীক্ষার বাধ্যতামূলক কাজও নয়; বই পড়া আনন্দের, আবিষ্কারের এবং নিজের সঙ্গে নিজের পরিচিত হওয়ার একটি পথ।

আর পাঠাগারটি যেহেতু খোলা প্রাঙ্গণে, তাই এর প্রতীকী অর্থও গভীর। জ্ঞানকে এখানে আলমারির ভেতর বন্দি রাখা হয়নি। যে কেউ বই হাতে নিতে পারে, পড়তে পারে। এমনকি অভিভাবকদের জন্যও যদি এই পাঠের পরিবেশ উন্মুক্ত থাকে, তাহলে সেটি আরও বড় একটি সামাজিক পাঠাভ্যাস তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ শিশুকে বই পড়ার অভ্যাস শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো— বাড়ির বড়দের বই পড়তে দেখা।

দেয়ালিকাটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিশুর আঁকা ছবি, লেখা কবিতা, ছড়া কিংবা ক্যালিগ্রাফি যখন প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে স্থান পায়, তখন শিশুর সৃষ্টিকে মর্যাদা দেওয়া হয়। সে বুঝতে পারে, তার ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ। তার আঁকা ছবি বা লেখা কেবল খাতার পাতায় শিক্ষক দেখবেন বলে নয়; অন্যরাও দেখবে, প্রশংসা করবে, সমালোচনা করবে। এই স্বীকৃতিই অনেক সময় একটি শিশুর সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার প্রথম ধাপ।

প্রতি তিন মাস অন্তর পাঠক সম্মেলনের আয়োজন এবং সেরা পাঠকদের পুরস্কৃত করার উদ্যোগটিও প্রশংসনীয়। পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে পুরস্কারই সবকিছু নয়, কিন্তু স্বীকৃতি শিশুকে উৎসাহিত করে। বিশেষ করে যখন শিক্ষাবিদ ও লেখকদের মতো ব্যক্তিরা এসে শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন, তখন বইয়ের সঙ্গে শিশুর সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে।

তবে একটি পাঠাগার স্থাপন করাই শেষ কথা নয়। এর সাফল্য নির্ভর করবে বই নির্বাচনের মান, নিয়মিত পাঠচর্চা, বই সংরক্ষণ, পাঠ-পরবর্তী আলোচনা এবং শিশুদের পাঠ-অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়নের ওপর। এক হাজার বই দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছে— এটি আনন্দের খবর। কিন্তু আগামী দিনে বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত শিশু-কিশোর সাহিত্য, বিজ্ঞানবিষয়ক বই, জীবনী, ইতিহাস, ভ্রমণকাহিনি, দর্শন, পরিবেশ ও প্রযুক্তিবিষয়ক বই দিয়ে সংগ্রহ আরও সমৃদ্ধ করা গেলে এই উদ্যোগের পরিধি বহুগুণ বাড়তে পারে।

কাশিনাথপুরের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আয়োজন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের শিক্ষা-ভাবনায় একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্নও ছুঁড়ে দেয়— আমরা কি আমাদের শিশুদের শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য তৈরি করছি, নাকি জীবনকে বোঝার জন্যও প্রস্তুত করছি?

আজকের পৃথিবীতে জ্ঞানের কোনো দেয়াল নেই। ধর্মীয় জ্ঞান যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্কতা। নৈতিক শিক্ষা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সাহিত্যবোধ। নিজের সংস্কৃতিকে জানা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি পৃথিবীকে জানা। একজন পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি হয় এই বহুমাত্রিক জ্ঞানের সমন্বয়ে।

ইসলাহুল উম্মাহ একাডেমি ও ক্যাডেট মাদরাসার মুক্তপাঠাগার সেই সমন্বয়েরই একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়াস। ধর্মীয় চিন্তাচেতনার একটি প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় যখন শিশুরা কোরআনের পাশাপাশি গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও বিজ্ঞানবিষয়ক বই হাতে নেয়, তখন আসলে একটি নতুন শিক্ষাদর্শের দরোজা খুলে যায়।

এই দরোজা যত বেশি খুলবে, তত বেশি শিশু বইয়ের জগতে প্রবেশ করবে। আর বইয়ের জগতে প্রবেশ করা শিশু কেবল পরীক্ষার উত্তর শেখে না—সে প্রশ্ন করতে শেখে, ভাবতে শেখে, কল্পনা করতে শেখে, অন্যকে বুঝতে শেখে এবং শেষ পর্যন্ত নিজেকেও আবিষ্কার করতে শেখে।

কাশিনাথপুরের খোলা আকাশের নিচে তাই শুধু একটি পাঠাগার দাঁড়ায়নি; দাঁড়িয়েছে একটি স্বপ্ন। যে স্বপ্নের কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক প্রজন্ম— যারা ধর্মীয় মূল্যবোধে আলোকিত হবে, বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোয় পথ চিনবে, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ হবে এবং সর্বোপরি জ্ঞানকে কোনো সংকীর্ণ সীমানায় আবদ্ধ না রেখে মানুষ হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করবে।

এক হাজার বই দিয়ে শুরু হওয়া এই পথচলা একদিন আরও বড় হোক—আর দেশের প্রত্যন্ত জনপদের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় এমন ‘মুক্তপাঠের জানালা’ খুলে যাক। কারণ একটি শিশুর হাতে একটি ভালো বই তুলে দেওয়া মানে তার সামনে খুলে দেওয়া অজস্র সম্ভাবনার দরোজা।

অলোক আচার্য : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন: