মাধবী একটি মেয়ে; যে নার্স হওয়ার স্বপ্ন দেখতো :: তুই বাঁশফোঁড়ের মেয়ে, তোর স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই

মাধবী একটি মেয়ে; যে নার্স হওয়ার স্বপ্ন দেখতো
শেয়ার করুন:
মাধবী একটি মেয়ে; যে নার্স হওয়ার স্বপ্ন দেখতো
অনলাইন থেকেঃ স্বপ্ন দেখতো- অসুস্থ মানুষের কপালে হাত রেখে যন্ত্রণায় কাতর কোনো মায়ের পাশে বসে বলবে, “ভয় নেই, আমি আছি।” এটুকুই তার চাওয়া ছিল। ব্যাস্ এটুকুই। কিন্তু এই সমাজ তাকে মনে করিয়ে দিল- “তুই বাঁশফোঁড়ের মেয়ে। তোর স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই।”
পাবনার কাশিনাথপুরে একখানা দোচালা ঘর। চারপাশে সরকারি খাসজমি। সেই ঘরে থাকে মাধবী রাণী- হরিজন সম্প্রদায়ের বাঁশফোঁড় গোত্রের একটি মেয়ে। তার বাবা সন্তোষ কুমার- প্রতিবন্ধী। মাসে পাঁচশো টাকার সরকারি ভাতা ছাড়া তার আর কিছু নেই। হাত নেই, পা নেই এমন নয়- কিন্তু ভাগ্যের কাছে সে বহু আগেই পরাজিত।
তার মা ডলি রাণী- প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে হাটবাজার পরিষ্কার করেন। কোনো মাসিক বেতন নেই। বাজারের তোলা চাল-ডাল-তরকারি যা পান, তাই দিয়ে সংসার চলে। রাস্তা-ঘাটে-বাজারের মরা কুকুর, শেয়াল টেনে সরিয়ে দিলে দু’টো পয়সা বাড়তি পান। এই পরিবারের কোনো জমি নেই। বসতভিটা নেই। অতীত নেই, ভবিষ্যৎও নেই- শুধু আছে প্রতিটি দিনের বেঁচে থাকার যুদ্ধ।
আর এই যুদ্ধের মাঝখানে বড় হয়েছে মাধবী রাণী।
অভাব তাকে ভাঙতে পারেনি। লাঞ্ছনা তাকে থামাতে পারেনি। বইখাতা কিনতে না পারলেও পড়া থামায়নি সে। কারণ সে জানত- একদিন নার্স হবে। একদিন সাদা পোশাক পরে কারো পাশে দাঁড়াবে, যেভাবে কেউ কখনো তার পরিবারের পাশে দাঁড়ায়নি। মাধবীর ভেতরে অদম্য সাহস আর স্বপ্ন দেখে সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছিলেন কাশিনাথপুরের এক মানবিক চিকিৎসক ডা. শামীম হুসাইন। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মাধবী সফলতার সাথে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে। এই বছর সে BSc নার্সিং ভর্তি পরীক্ষায় বসে। পরীক্ষা দেয়। ফলাফলে তার অবস্থান- ১১,৮২০তম।
একটু ভাবুন- লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর ভিড়ে, বই কিনতে না পারা ঘরের একটি মেয়ে ১১,৮২০তম হয়েছে। কিন্তু সে ভর্তি হতে পারল না। পশ্চাৎপদ জাতিগোষ্ঠীর কোটায় যশোরের সরকারি নার্সিং কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন বিপীন চাকমা- মেধাতালিকায় তার অবস্থান ১১,৮৮১তম। মাধবী রাণী তার চেয়ে ৬১ ধাপ এগিয়ে। তবুও সে বাদ। কেন? কারণ বিপীন চাকমার সম্প্রদায় সরকারি গেজেটে আছে। আর মাধবীর বাঁশফোঁড় গোত্রের নাম- সরকারি কাগজে নেই।
পাবনার জেলা প্রশাসন জানিয়ে দিয়েছিল- গেজেটে নাম নেই, তাই প্রত্যয়নপত্র দেওয়া যাবে না। প্রত্যয়নপত্র নেই, তাই কোটায় আবেদন করা যায়নি। কোটায় আবেদন নেই, তাই ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না। একটা কাগজ! একটা গেজেট! একটা মেয়ের সারাজীবনের স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দিতে একটা কাগজই যথেষ্ট।
তারা হাটবাজার পরিষ্কার করে। মরা জানোয়ার সরায়। নগর-জনপদের ময়লা-আবর্জনা বহন করে। আমাদের শহর সুন্দর রাখতে তারা নিজেদের জীবন কুৎসিত করে রাখে। অথচ তাদের নাম সরকারি গেজেটে নেই। তারা মানুষ- কিন্তু রাষ্ট্রের চোখে যেন তারা অদৃশ্য। অথচ দেশে বাঁশফোঁড় সম্প্রদায়ের মানুষ কম করে হলেও পাঁচ লক্ষ।
মাধবী রাণী এখন একা দাঁড়িয়ে। একজন প্রতিবন্ধী বাবা, একজন ক্লান্ত মা, একখানা দোচালা ঘর- আর বুকের ভেতরে একটি স্বপ্নের ছাই।
সে কি আইনের লড়াই লড়বে? কিন্তু কার টাকায়? কার সাহায্যে? সে কি হাল ছেড়ে দেবে? তাহলে কি বাকি জীবন মায়ের মতো হাটবাজার ঝাড়ু দেবে? বাজারের মরা কুকুর টানবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন আমাদের কাছে।
আপনি যদি আইনজীবী হন- মাধবী রাণীর পাশে দাঁড়ান। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে তাকে সাহায্য করুন। আপনি যদি কোনো বেসরকারি নার্সিং কলেজের সাথে যুক্ত হন- দরিদ্র মেধাবী কোটায় তাকে বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ করে দিন। আপনি যদি সাধারণ মানুষ হন- এই লেখাটি শেয়ার করুন। ছড়িয়ে দিন সারাদেশে। নীরব থাকবেন না। কারণ আপনার সরবতাও একটি রায়।
পাঁচ লাখ বাঁশফোঁড়ের পক্ষে মাধবী রাণী আজ দাঁড়িয়ে। তার চোখে জল। তার স্বপ্নে আগুন।
মাধবী রাণী শুধু নার্স হতে চায়। একটি অসহায় মানুষের কপালে হাত রেখে বলতে চায়- “ভয় নেই, আমি আছি।” অথচ, আজ সে নিজেই অসহায়।
কেউ কি তার কান্না শুনতে পান? কেউ কি তার পাশে এগিয়ে আসবেন?
শেয়ার করুন: