দেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ জেনেটিক ল্যাব চালু: ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন টিএমএসএসের

শেয়ার করুন:

দেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ জেনেটিক ল্যাব চালু: ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন টিএমএসএসের

এ কে খান :
দেশে প্রথমবারের মতো জেনেটিক ও মলিকুলার ক্যান্সার শনাক্তকরণে একটি পূর্ণাঙ্গ ল্যাব চালু করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএস। বগুড়া ঠেঙ্গামারাস্থ ১০০০ শয্যার টিএমএসএস মেডিকেল কলেজ ও রফাতুল্লাহ কমিউনিটি হাসপাতালের ১৮ তলায় স্থাপিত এই অত্যাধুনিক ল্যাবটিতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং (NGS)’ প্রযুক্তি, যা ক্যান্সার নির্ণয়ে বিশ্বের সর্বাধুনিক জিনভিত্তিক প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচিত। রবিবার (১৩ জুলাই, ২০২৫) বগুড়া প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিএমএসএস কর্তৃপক্ষ এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। এই ল্যাব বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করা হচ্ছে, যা ক্যান্সার রোগ শনাক্তকরণ ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। এর ফলে বিদেশে গিয়ে ব্যয়বহুল জেনেটিক টেস্ট করার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে আসবে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এই ল্যাব সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিএমএসএস প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপিকা ড. হোসনে আরা বেগম, টিএমএসএস উপ-নির্বাহী পরিচালক ডাঃ মোঃ মতিউর রহমান, চেয়ারম্যান ও সিইও, মিহেলথঅমিক্স অস্ট্রেলিয়া এবং জিং-টেকনোলজিস প্রফেসর ডঃ পল মেইনওয়ারিং, এমডি, জিং- টেকনোলজিস মোসাদ্দেক শহীদ, মান নিশ্চিতকরণ বিশেষজ্ঞ এবং পরামর্শদাতা, মেডিকেল ল্যাব আইএসও পরিদর্শক মিঃ প্যাট্রিক মাতেটা, ISO ১৫১৮৯:২০২২ স্ট্যান্ডার্ড রাইটার এবং মেডিকেল ল্যাব ISO পরিদর্শক মিসেস শিলা উডকক, সহকারী অধ্যাপক এবং QC ব্যবস্থাপক, TBL ডঃ ফরহাদ আহমেদ সহ বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধান, ডাক্তার ও কর্মকর্তাবৃন্দ। বক্তারা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১.৬ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে ১০-১৫ শতাংশ ক্যান্সার জেনেটিক কারণে হয়ে থাকে। বিশেষ করে স্তন, ডিম্বাশয়, অন্ত্র, থাইরয়েড ও রক্তের ক্যান্সারের সঙ্গে BRCA1, BRCA2, HNPCC প্রভৃতি জিনের পরিবর্তন জড়িত। এই ল্যাব সেসব জেনেটিক মিউটেশন শনাক্ত করে চিকিৎসকদের রোগীর জন্য সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর চিকিৎসা নির্ধারণে সহায়তা করবে। এই পদ্ধতি ‘Precision Medicine’ নামে পরিচিত, যা রোগীর জিনগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সুনির্দিষ্ট থেরাপি নির্ধারণ করে। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সাশ্রয়ী পরীক্ষা
টিএমএসএসের এই ল্যাবে রিয়েল-টাইম পিসিআর, জেনেটিক অ্যানালাইজার, ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি এবং লিকুইড বায়োপসি সহ অত্যাধুনিক পরীক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। সর্বোপরি, উচ্চমানের NGS বা নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যান্সার শনাক্তকরণ এখন আরও দ্রুত, নির্ভুল ও সাশ্রয়ী হবে। যদিও এই ল্যাবটি আন্তর্জাতিক মানের, এর পরীক্ষাগুলোর খরচ বিদেশি ল্যাবের তুলনায় অনেক কম। ভবিষ্যতে আরও কম মূল্যে এসব পরীক্ষা সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে। টিএমএসএসের স্বাস্থ্যসেবায় অবদান টিএমএসএস বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জনসাধারণের জন্য সুলভ মূল্যে অত্যাধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২২ সাল থেকে বগুড়ার ঠেঙ্গামারায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুপার স্পেশালাইজড ক্যান্সার সেন্টার পরিচালনা করছে। এটি একটি কমপ্রিহেনসিভ ক্যান্সার কেয়ার সেন্টার, যেখানে ক্যান্সার স্ক্রিনিং, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপিসহ আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিসমূহ বিদ্যমান। রোগ নির্ণয়ের জন্য এখানে সিটি স্ক্যান, এমআরআই, হিস্টোপ্যাথলজি, ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি, ইমেজ-গাইডেড এফএনএসি ও কোর বায়োপসি সহ প্রায় সকল প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক পদ্ধতির ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়াও, চিকিৎসা শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে টিএমএসএস প্রশংসনীয় অবদান রেখে চলেছে। দেশব্যাপী টিএমএসএস মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং কলেজ, কমিউনিটি প্যারামেডিক ইনস্টিটিউট, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল এবং বিভিন্ন হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট সফলতার সাথে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ৮টি হাসপাতাল ও সেন্টার, ১১টি চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১৩০টির বেশি রুরাল সাব-সেন্টার টিএমএসএসের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত এই ল্যাবে ১৯২টির বেশি জটিল জেনেটিক ক্যান্সার পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, যার মধ্যে ছিল স্তন ক্যান্সার, লিউকেমিয়া, থাইরয়েড ক্যান্সার, লাং ক্যান্সার ও কোলন ক্যান্সার। এই ল্যাব বাস্তবায়নে টিএমএসএস অস্ট্রেলিয়ার XING Group Holdings, MiHealthOmix এবং দি রোটারি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতা পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে ল্যাবটি বর্তমানে ISO ১৫১৮৯ স্বীকৃতির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই স্বীকৃতি সম্পন্ন হলে এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম GB স্বীকৃত অ্যাক্রেডিটেড মলিকুলার ল্যাব। টিএমএসএসের এই ল্যাবকে ভবিষ্যতে একটি গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে, যেখানে জিনতাত্ত্বিক ভিত্তিতে নতুন ওষুধ ও থেরাপি উদ্ভাবনের কাজ হবে। সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন, এই ল্যাবের মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ক্যান্সার “নিরাময়যোগ্য” এই বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

শেয়ার করুন: