লেখক – অধ্যাপিকা ডক্টর হোসনে আরা বেগম ।।
অত্র উপমহাদেশের বহু আন্দোলনের ইতিহাস পড়েছি, আন্দোলন স্বচক্ষে দেখেছি। যেমন ফকির বিদ্রোহ, সন্ন্যাস বিদ্রোহ, ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীর আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, মাতৃভাষার দাবিতে আন্দোলন, আইয়ুব শাসনে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, এরশাদ শাসনের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ঐক্যজোট সরকারের বিরুদ্ধে লগি-বৈঠার আন্দোলন, চলমান ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও জনতার আন্দোলন; সকল আন্দোলনের বিজয়গাঁথা উদ্যাপনকালে লুটতরাজ, হিংশ্রতা, মূল্যবোধহীন আচরণ বিবেচনায় বিজ্ঞানের ও সভ্যতার উৎকর্ষ সাধন আমলে একটানা দেড় যুগের অধিক দেশ শাসনের দম্ভতায় দেশ শাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় ইস্তফা দিয়ে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। যিনি বলতেন, “শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালানোর মানুষ না, কখনোই বাংলাদেশ ছেড়ে যাবে না”।
প্রিয় পাঠক, রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান, পেশাজীবী পরিবারের গৃহিনী, পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদদের আত্মবিশ্বাস ছিল তার শাসনামলে দেশের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। এই শাসকরা যে সমস্ত দৃশ্যমান মেগা উন্নয়ন নিয়ে গর্ব করতেন, সেই উন্নয়নগুলোর আড়ালে মেগা দুর্নীতির জন্য অনুশোচনা অনুভূত হয় নাই। অনুশোচনা যে হয় নাই তার সূচক “আমার পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক, হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না”। আওয়ামী লীগের ঘোষণাপত্রে উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা। একজন পিয়নের এতো টাকা হওয়ার পর সে কেন চাকরি করবে। সে বিদেশে যাবে, বিলাস জীবন-যাপন করবে। সরকার প্রধান তার এই পথ সুগম করে দিয়ে নিজ ইশতেহারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখালেন। ২০১৮ সালে ব্যাপক কোটাবিরোধী আন্দোলনের মুখে পবিত্র সংসদে ঘোষণা দিয়ে কোটা শূন্য করলেন, রাগ-বিরাগ, অনুরাগ-অভিমান এর ঊর্ধ্বে উঠে দেশ শাসনের জন্য শপথনামা পাঠকারী ছাত্রদের আন্দোলনের মুখেই শপথ ভঙ্গ করে একটি অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা দিলেন। এতে করে তিনি Out of oath-এ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শাসনে থাকলেন। দেশের মানুষের মানবিক উন্নয়ন তো দূরে থাকলো, মন বোঝারও চেষ্টা করলেন না। প্রধানমন্ত্রীর চারিপার্শ্বে যারা ছিলেন, থাকতেন, তারাও জাতির পালস্ হৃদয়াঙ্গম করার এবং করানোর মৌলিক দায়িত্বটুকুও পালন করলেন না। তাদের উদ্দেশ্য ক্ষমতার অংশীজন ও উপকারভোগী হয়ে বিত্ত-বৈভবশালী হবো। নীতি-নৈতিকতা, গণতন্ত্র, মত ও দ্বিমত প্রকাশ ইত্যাদির স্বাধীনতা নানাভাবে আইনী ও অভিনব অনুশাসনে এবং কূটকৌশলে বন্ধ করে উন্নয়নের অলংকার, উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে গণমানুষের গুরুত্ব ক্ষীণ থেকেও ক্ষীণকার করা হলো, গণতন্ত্রকে দারুণভাবে গুরুত্বহীন করে তোলা হলো। টিএমএসএস এর পরিচালনা পর্ষদের সেন্সরশীপের আওতায় থেকেই একবার একটি জনপ্রিয় টকশোতে স্বাভাবিকভাবে বলে ফেলেছিলাম “গণমানুষ বিগত ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভোট দিতে পারে নাই, তরুণ যুবকেরা ভোটকেন্দ্র দেখে নাই, ভোটবিহীন নেতাকে ভক্তি ভরে মেনে নিতে চায় না।” জনতার মূল্যবোধ, মানবিক উন্নয়ন ব্যতিরেকে বৈশ্বয়িক উন্নয়নের গুরুত্ব নাই। সততা, নৈতিকতা দ্বারা মানবিক উন্নয়ন হয়, মানবিক উন্নয়ন ছাড়া অবকাঠামোর উন্নয়ন, দৃশ্যমানতার উন্নয়ন তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে যাবে, টিকবে না। টিএমএসএস এর দালানকোঠা, অকাঠামো উন্নয়ন দেখে সহকর্মী কেউ কেউ আত্মতুষ্টি প্রকাশ করে হেতু অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রকৃত উন্নয়ন নয়, এই অভিমতে যৌক্তিকতাসহ অনেক প্রবন্ধ লিখেছি; যা “ছুটকথা” বইগুলোতে আছে। জাতির মূল্যবোধের গতির বিপরীতে টিএমএসএস ক্ষুদ্র কমিউনিটির মানবিক উন্নয়ন পূর্ণাঙ্গ হবে না। তাই জাতির উন্নয়নের প্রতিই ভরসা। ৬ জন সংগ্রামরত ছাত্র মৃত্যুর পর জাতির উদ্দেশ্যে শোক ভাষণ এবং এক পর্যায়ে তিনি অভিমত দেন, “এই আন্দোলন এই পর্যায়ে যাবে ভাবি নি।” তার চারিপার্শ্বে যারা ছিলেন তারা শুধু গ্রহণ করতেন, ভোগ করতেন, তাকে কিছু দিতেন না। তথ্যই ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীকে যেমন তথ্য শূন্যতায় রাখতেন, তিনিও SSF বেষ্টিত থাকতেন। ৭জন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের রিটের প্রেক্ষিতে কোটা রহিতকরণ প্রজ্ঞাপন বাতিল হলো। যে প্রজ্ঞাপন সরকারের পলিসি ইস্যু ছিল। মহামান্য বিচারপতি কোন মানের বিচারক যে তিনি পলিসি লেভেল প্রজ্ঞাপন বাতিল করলো। পলিসি লেভেল অর্থাৎ নীতিনির্ধারণী সরকারি প্রজ্ঞাপন বাতিল করার এখতিয়ার আদালতের নাই। এই মর্মে আদালতের রায় আছে। মহামান্য বেঞ্চ কোন বিবেকে কোন আক্কেলে রিট দাখিলের প্রেক্ষিত যে প্রজ্ঞাপন বাতিল করলেন, তাতে যে Demurrage হলো-হচ্ছে, এর ক্ষতিপূরণ কি ঐ জাতীয় অপরিপক্ক মহামান্যগণ পুষে দিতে পারবেন? উপযুক্ত নয় এরুপ অর্বাচিন মহামান্য বিচারপতি পূর্বেও দেখেছি। তবে, তাদের দ্বারা জাতিকে ততো মূল্য দিতে হয় নাই। ২০২৪ সাল শোকাবহ আগস্ট মাসের ৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগের পূর্বেই তার অনেক উন্নয়নের জিকিরকারী সঙ্গী-সাথী দেশত্যাগ করেছেন। জনভিত্তিহীন রাজনৈতিক সঙ্গীদের পরামর্শে জামায়াত-শিবিরকে কথিত নিষিদ্ধ করায় আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে যা ঘটল, নির্ধারিত দিনের একদিন পূর্বেই (মার্চ টু ঢাকা ছিল ৬ তারিখ) কারফিউ ভঙ্গ করে ঢাকার রাজপথ বিভিন্ন শহর-বন্দর, সড়ক-মহাসড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হলো। এই জনসমুদ্রের মধ্যে অর্ধেকের কম ছিল রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র-ছাত্রী, বেশিরভাগ ছিল উন্নয়নের জারিতে কষ্টপ্রাপ্ত জনতা। তারা যা ঘটালো ছাত্র-ছাত্রী এবং রাজনৈতিক দল তা থামাতে ব্যর্থ হলো। রাষ্ট্রীয় টাকা ব্যয়ে প্রধানমন্ত্রীর আবাসন গণভবন, সংসদ ভবন, বিভিন্ন অফিস, মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ি, থানা, এমনকি পার্টির লোকজনের ব্যবসাকেন্দ্র, সহায়-সম্পদ লুটতরাজ হতে থাকল, আনন্দ-উল্লাস হলো। পিতার অপরাধে পুত্র দায়ী নয়, পুত্রের অপরাধে পিতা দায়ী নয়, এই তত্ত্বে বিশ্বাসী মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী করোনাকালে যে ভূমিকা রেখেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত মানুষকে যেমন কাঁধে করে নিয়ে রক্ষা করেছেন, সেই পুলিশকে হত্যা করা, সংখ্যালঘুদের উপরে চড়াও হওয়া, এগুলো মানবিক উন্নয়নের লেশমাত্র থাকলে হতো না। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এই বিজয় উল্লাসের ভাষণে তাঁর অত্যন্ত গঠনমূলক মানবিকতায় ভরপুর ভাষণে বলেন, “বিজয়কারীদের দ্বারা পরাজিতগণ যদি সুরক্ষিত থাকে, শান্তিতে থাকে, সেটাই বিজয়ের মহত্ত্ব”। অবকাঠামোর উন্নয়ন এতো না হয়ে মানবিক উন্নয়ন করে জাতির মূল্যবোধের উন্নয়ন করলে এই সমস্ত জঘন্য কাজ হতো না। পাঠক হয়তো বলতে পারেন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, তাহলে রাষ্ট্রীয় সম্পদগুলো স্তুপাকার করে আগুনে ভষ্মীভূত করে দিলে Hungriness কিভাবে কমবে। এদেশে যে সরকারই আসুক না কেন, সবারই মনে রাখতে হবে জনতাই মূল শক্তি, জনতাই দেশের মালিক, সংবিধানে ৭ নং ধারায় স্পষ্টত লেখা আছে। এই জনতাকে, এই মানুষকে বাদ দিয়ে মাটির উন্নয়ন অর্থাৎ অবকাঠামো উন্নয়ন করলে সব সরকারেরই এরূপ পরিণতি হবে। বাংলার মানুষ আবেগী মানুষ। আজকে যারা লুটতরাজ করছে তারা অনেকেই এই সরকারের ভোটারবিহীন ভোট কেন্দ্রের শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। অন্যায় যে করে এবং যে সয় উভয়ই সমঅপরাধী হয়। তাই লুটতরাজকারীদেরও বিচার করা দরকার। কঠোর হস্তে নীতি-নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ অবলম্বনে দেশ শাসন না করলে ৫-ই আগস্টের পরিণতি সবার জন্যই অপেক্ষা করবে। সাধু সাবধান!
