আকাশ লাল, আতঙ্কে ইরান: হতবাক তেহরানবাসী, নিহত শীর্ষ জেনারেল ও বিজ্ঞানীরা

শেয়ার করুন:

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, শুক্রবার, ১৩ জুন ২০২৫ : ইসরায়েলের আকস্মিক ও ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাতভর চলা এই হামলায় অন্তত ৭৮ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সূত্রে জানা গেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মোহাম্মদ বাঘেরি, আইআরজিসি প্রধান হোসেইন সালামি ও পারমাণবিক কর্মসূচির সাথে যুক্ত একাধিক বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তা।

তেহরানের বিভিন্ন স্থানে ভবন ধ্বংস, আগুন এবং ধোঁয়ার কুণ্ডলী আতঙ্ক ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একাধিক তীব্র বিস্ফোরণে আকাশ লাল হয়ে ওঠে। উদ্ধারকারীরা ভোর হতেই ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষজনকে উদ্ধারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

একজন বাসিন্দা গোলনার বলেন, “জানালাগুলো কাঁপছিল, পুরো ভবন যেন কেঁপে উঠেছিল। কেউ জানত না কি হচ্ছে — যুদ্ধ, না প্রাকৃতিক দুর্যোগ।”

উত্তর তেহরানের সাদাত আবাদের ১২তলা একটি আবাসিক ভবনের ওপর হামলায় কমপক্ষে দুইটি তলা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। শহরের উত্তরে একটি শপিংমলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে নাতাঞ্জ, আরাক ও তাবরিজে সরাসরি হামলা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সূত্র। নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় “স্থল স্তরে কিছু ক্ষয়ক্ষতি” হলেও প্রাণহানির কথা অস্বীকার করেছে ইরান।

তেহরানের শাহ আরা ও কারাজ এলাকার বাসিন্দারা সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, তারা ব্যাপক চিৎকার, কাচ ভাঙার শব্দ ও ধ্বংসাবশেষের মুখোমুখি হয়েছেন।

“হামলা জনসাধারণের নয়, সরকারের বিরুদ্ধে”
ইসরায়েল জানিয়েছে, এই হামলা ছিল “একটি বৃহত্তর অভিযানের সূচনা”, যা কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের যুদ্ধ ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং ৪৬ বছরের দমন-পীড়ন চালিয়ে যাওয়া ধর্মতন্ত্রের বিরুদ্ধে।”

তবে তেহরানের মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকরা বলছেন, এই ধরনের হামলার প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ আরও দুর্ভোগের শিকার হবে। খাবার ও ওষুধের দাম ইতিমধ্যেই আকাশচুম্বী, এবং বোমা আশ্রয়কেন্দ্রের অনুপস্থিতিতে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

“আমরা কোথায় যাব? আমরা তো পালাতে পারি না,” বলছিলেন এক অধিকারকর্মী।

তবে শাসনের বিরোধিতাকারীরা মনে করেন, এই হামলা ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হ্রাস করবে। আজাদেহ নামে এক বাসিন্দা বলেন, “এই হামলা যদি শুধুই সামরিক বা শাসনের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে আমরা কিছুটা স্বস্তি পাই।”

তথ্য ও প্রচার নিয়ন্ত্রণ
ইরানের সাংবাদিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা হামলার ছবি ও ভিডিও প্রকাশ না করেন। কেবল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সাংবাদিকদের নির্ধারিত এলাকা কভার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনার আশঙ্কা
ইসরায়েলি হামলার পর ইরান এর কঠোর জবাবের হুমকি দিয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বলেছেন, “ইসরায়েল তাদের রক্তাক্ত হাত দেখিয়েছে এবং এর জন্য তিক্ত পরিণতির মুখোমুখি হবে।” যদিও ইরান থেকে ছোঁড়া ১০০ ড্রোনের একটিও ইসরায়েলের মাটিতে আঘাত করেনি বলে দাবি করছে তেল আবিব।

এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি যুদ্ধের মাত্রা আরও বাড়াতে পারে এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

শেয়ার করুন: