মুক্তিযোদ্ধা টেপরী রাণী চলে গেলেনঃঃঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে শোকের ছায়া

ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে শোকের ছায়া
শেয়ার করুন:
মুক্তিযোদ্ধা টেপরী রাণী চলে গেলেন
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় বীরাঙ্গনা টেপরী রাণী আর নেই। ১২ মে, ২০২৬ (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার নন্দুয়ার ইউনিয়নের বলিদ্বারা গ্রামে নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ঘটনা ১৯৭১,
…যুদ্ধ চলছে। টেপরী রাণীর বয়স তখন মাত্র ১৭। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে তার পরিবার। তখনই পরিবারকে বাঁচানোর নাম করে এগিয়ে এল এক রাজাকার। সে টেপরীর বাবাকে বলল—
“তোমার মেয়েকে যদি পাকিস্তানি ক্যাম্পে দাও, তাহলে পুরো পরিবার বেঁচে যাবে।”
পরিবারকে রক্ষা করতে টেপরীকে ‘বিসর্জন’ দেওয়ার কথা ভাবল তার অসহায় বাবা। বাবার কথা শুনে কিশোরী টেপরীও আর বাধা দিল না। সে জানত ক্যাম্পে গেলে কি হবে তার সঙ্গে। তবু পরিবারকে বাঁচাতে হবে। নিজের বাবা তার মেয়ের হাত ধরে পৌঁছে দিলো ক্যাম্পে, জমের মুখে। সেদিন সারাটা পথ বাবা-মেয়ে একটিও কথা বলেনি। মেয়েকে তুলে দেওয়া হচ্ছে পাকিস্তানি ক্যাম্পে। পাকসেনারা তাকে ধ*র্ষণ করবে, ধ*র্ষণের পর মেরেও ফেলতে পারে। এই যখন হবিতব্য, কি কথা বলবে বাবা মেয়েকে?
সেদিন টেপরিকে ক্যাম্পে তুলে দিয়ে মাথা নিচু করে ফিরে আসেন নির্বাক বাবা। এই নিরবতার অর্থ বোঝেন? নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে (নিজেকে বাবা বা মেয়ের স্থানে বসিয়ে) কল্পনা করেন তো!!
টেপরী আর পাঁচটা মেয়ের মতো মরে যেত পারত। কিন্তু কপাল খারাপ তার, সে মরেনি। দীর্ঘ ছয় মাসের নরকযন্ত্রণা ভোগ করে ফিরে আসে সে। এমন কোনো রাত যায়নি, পাকসেনারা তাকে ধ*র্ষণ করেনি। আজ শুনতে ‘বাড়াবাড়ি’ মনে হচ্ছে না? ইয়েস, একাত্তর মিথ না, এই ‘বাড়াবাড়ির’ নামই একাত্তর!
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়ি ফেরেন টেপরী। শুরু হয় আরেক যন্ত্রণা। অনাগত সন্তানকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত না সমাজ। সন্তানকে ‘নষ্ট’ করে ফেলার জন্য নানা আসে চারদিক থেকে। তখন মেয়ের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান তার বাবা। তিনি বলেছিলেন, “না মা, রাখ। এ-ই হবে তোর সম্বল। তোকে তো আর কেউ গ্রহণ করবে না। শেষ বয়সে এই সন্তানই হবে তোর বেঁচে থাকার অবলম্বন হবে।”
হয়েছেও তাই। ছেলে সুধীর বর্মনের আশ্রয়েই তার বাকি জীবনটা কেটেছে।
কিন্তু সমাজের কটূক্তি সুধীরেরও পিছু ছাড়েনি। সুধীরকে ‘পাঞ্জাবির বাচ্চা’ বলে অপমান করা হয়েছে নিয়ত। একবার তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সে প্রতিবাদ করে না কেনো?
সুধীরের উত্তর—“ঝগড়া করতে তো লোক লাগে, কিন্তু আমার কে আছে?”
না, সুধীরের পাশে কেউ নেই। তখনও ছিল না, এখনও নেই। কিন্তু এরপরও সুধীর বেঁচে আছে মাথা উঁচু করে। তার একটা মেয়ে আছে, নাম—‘জনতা’।
জনতা কি ভাবে জানেন? তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তার দাদিকে নিয়ে। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল—
“দেশে যদি আবার যুদ্ধ হয়, দাদীর মতো আমিও দেশের জন্য নিজের সব কিছু বিসর্জন দিতে দ্বিতীয়বার ভাববো না।”
এই আমাদের ‘জনতা’, একাত্তরের উত্তরসূরি।
দীর্ঘ অবহেলার পর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনা (হওয়ার উচিত ‘মুক্তিযোদ্ধার’) স্বীকৃতি পান টেপরী রাণী।
তাকে তখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কি চান তিনি। বৃদ্ধবয়সী টেপরী রানী বলেছিলেন: মৃত্যুর পর তাঁর দেহটাকে লাল-সবুজের পতাকায় মুড়িয়ে জাতি বিদায় জানাবে। এর চেয়ে আর বেশি কিছু তার চাওয়া নেই।
তার সেই চাওয়া পূরণ হয়েছে।
আসেন আমরা অন্তর থেকে তাঁকে স্যালুট জানাই। তাঁর স্মরণে একা একা এক মিনিট নিরবতা পালন করি। একশো থেকে এক হাজার, এক হাজার থেকে এক লক্ষ, লক্ষ থেকে কোটি মানুষ নিরবতা পালন করুন এই মায়ের জন্য। সুধীর ও জনতার জন্য।
দীর্ঘ সময় অবহেলা ও অর্থকষ্টে জীবন কাটানো এই বীর নারীর মৃত্যুতে ঠাকুরগাঁও জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
শেয়ার করুন: