পূর্ব ভূমধ্যসাগরের জ্বালানি রাজনীতি: গাজা যুদ্ধের আড়ালের অর্থনীতি
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত—বিশেষ করে গাজাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ—দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলেও, বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন এর পেছনে আরও গভীর অর্থনৈতিক বাস্তবতা কাজ করছে। সেই বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বিপুল জ্বালানি সম্পদ।
১৯৯৯ সালে British Gas গাজা উপকূলের কাছে ‘গাজা মেরিন ১’ ও ‘গাজা মেরিন ২’ নামের প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। গাজা উপকূল থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ক্ষেত্রগুলোতে আনুমানিক ১.৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স চুক্তি থাকলেও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত জটিলতায় এই সম্পদ এখনো উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে, ২০১০ সালে United States Geological Survey পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ‘লেভান্ত বেসিন প্রভিন্স’ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন প্রকাশ করে। তাদের হিসাবে, এই অঞ্চলে প্রায় ১২২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ১.৭ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের সম্ভাব্য মজুদ রয়েছে—যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অফশোর জ্বালানি অঞ্চলে পরিণত করেছে।
এই লেভান্ত বেসিন বিস্তৃত Gaza Strip, Israel, Lebanon, Syria এবং Cyprus-এর উপকূল জুড়ে। এর ভেতরেই অবস্থিত উল্লেখযোগ্য গ্যাসক্ষেত্র যেমন ‘তামার’ ও ‘লেভিয়াথান’, যেগুলো ইতোমধ্যেই উৎপাদনে রয়েছে। ‘লেভিয়াথান’ ক্ষেত্রটি পরিচালনায় যুক্ত রয়েছে Chevron, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনাও নিয়েছে।
অন্যদিকে, United Nations Conference on Trade and Development (UNCTAD) জানিয়েছে, গাজা উপকূলের গ্যাসক্ষেত্র থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত থাকার ফলে ফিলিস্তিনিরা কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য রাজস্ব হারিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইউরোপে জ্বালানি সংকট—বিশেষ করে Russia–Ukraine War-এর পর—পূর্ব ভূমধ্যসাগরের গ্যাসের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ কেবল আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লেবাননের উপকূলীয় অঞ্চলও এই জ্বালানি সমৃদ্ধ বেসিনের অংশ। অনুমান করা হয়, দেশটির সমুদ্রসীমায় উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুদ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই কারণে, লেবাননকে ঘিরে উত্তেজনাও কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক নয়, বরং জ্বালানি ভূরাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে অনেকে মনে করেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে শুধুমাত্র জ্বালানি সম্পদের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। এখানে ঐতিহাসিক বিরোধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সব মিলিয়ে, পূর্ব ভূমধ্যসাগরের তলদেশে থাকা জ্বালানি সম্পদ নিঃসন্দেহে একটি বড় ফ্যাক্টর, যা এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু চলমান সংঘাতের ব্যাখ্যা করতে গেলে একাধিক কারণকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়াই বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
