১৮ই জিলহজ পালিত হয় ঈদে গাদির মোবারক—ইসলামের ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন, যেদিন রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘোষণায় বলেছিলেন: “من كنت مولاه فعليٌّ مولاه”—যার আমি নেতা, আলীও তার নেতা। এই দিনটি ইসলামী নেতৃত্ব ও ঐক্যের প্রতীক।
প্রতিবেদন: ১৪ জুন ২০২৫ঃ ইসলামের ইতিহাসে ১৮ই জিলহজ একটি স্মরণীয় দিন—এই দিনটিকে বলা হয় “ঈদে গাদির মোবারক”। হিজরী ১০ম সালের এই দিনে, হজ্ব থেকে ফেরার পথে রাসুলুল্লাহ ﷺ গাদিরে খুম নামক স্থানে দাঁড়িয়ে যে ঘোষণা দেন, তা ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চিরন্তন বার্তা:
“من كنت مولاه فعلي مولاه”
(যার আমি নেতা, আলীও তার নেতা)
এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-কে তার পরবর্তী নেতা হিসেবে মনোনীত করেন বলে বহু ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সূরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াত নাজিল হয়:
“হে রাসূল! আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে তা পৌঁছে দিন…”
এই আয়াত ও ঘটনাটি ইসলামী ইতিহাসে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুফাসসির মনে করেন এটি ছিল ইসলামী নেতৃত্বের ঘোষণার আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত।
ঈদে গাদির শুধুমাত্র একটি ইতিহাসের দিন নয়, বরং এটি নেতৃত্ব, দায়িত্ব ও ঐক্যের প্রতীক। মুসলিম সমাজ আজ যেসব বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার প্রেক্ষাপটে গাদিরের বার্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সঠিক নেতৃত্ব ও ঐক্যের গুরুত্ব কতটা গভীর।
এই দিনটি মুসলিমবিশ্বে বিশেষভাবে শিয়া মুসলমানদের মধ্যে উদযাপিত হলেও, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সকল মুসলিমের কাছেই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। গাদিরের ঘোষণাটি ইসলামী নেতৃত্বের প্রশ্নে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়, যা শুধু ধর্মীয় নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদে গাদির মোবারক দিনটি ইতিহাসের একটি মোড় পরিবর্তনকারী মুহূর্ত। এটি কেবল শিয়া বা সুন্নি পরিচয়ের বাইরে গিয়ে একটি সাধারণ বার্তা দেয়—ন্যায়, নেতৃত্ব, এবং দায়িত্বের প্রতি আনুগত্য। এই দিনটির শিক্ষা ও গুরুত্ব বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে আবারও একতার পথে আহ্বান জানায়।
সূরা মায়েদা আয়াত নং ৬৭ এর ইতিকথা। যা মুসলিম জাতির নিকট মহাসত্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে। ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী স্বীয় তাফসীরে দুররে মনসুর-এ উল্লেখ করেন, ﻭَﺃﺧﺮﺝ ﺍﺑْﻦ ﺃﺑﻲ ﺣَﺎﺗِﻢ ﻭَﺍﺑْﻦ ﻣﺮْﺩَﻭَﻳْﻪ ﻭَﺍﺑْﻦ ﻋَﺴَﺎﻛِﺮ ﻋَﻦ ﺃﺑﻲ ﺳﻌﻴﺪ ﺍﻟْﺨُﺪْﺭِﻱّ ﻗَﺎﻝَ : ﻧﺰﻟﺖ ﻫَﺬِﻩ ﺍﻟْﺂﻳَﺔ } ﻳَﺎ ﺃَﻳﻬَﺎ ﺍﻟﺮَّﺳُﻮﻝ ﺑﻠﻎ ﻣَﺎ ﺃﻧﺰﻝ ﺇِﻟَﻴْﻚ ﻣﻦ ﺭَﺑﻚ { ﻋﻠﻰ ﺭَﺳُﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳﻠﻢ ﻳَﻮْﻡ ﻏَﺪِﻳﺮ ﺧﻢ ﻓِﻲ ﻋَﻠﻲّ ﺑﻦ ﺃﺑﻲ ﻃَﺎﻟﺐ ﻭَﺃﺧﺮﺝ ﺍﺑْﻦ ﻣﺮْﺩَﻭَﻳْﻪ ﻋَﻦ ﺍﺑْﻦ ﻣَﺴْﻌُﻮﺩ ﻗَﺎﻝَ : ﻛُﻨَّﺎ ﻧَﻘْﺮَﺃ ﻋﻠﻰ ﻋﻬﺪ ﺭَﺳُﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳﻠﻢ } ﻳَﺎ ﺃَﻳﻬَﺎ ﺍﻟﺮَّﺳُﻮﻝ ﺑﻠﻎ ﻣَﺎ ﺃﻧﺰﻝ ﺇِﻟَﻴْﻚ ﻣﻦ ﺭَﺑﻚ { ﺃَﻥ ﻋﻠﻴﺎ ﻣﻮﻟﻰ ﺍﻟْﻤُﺆﻣﻨِﻴﻦَ . ﻭَﺇِﻥ ﻟﻢ ﺗﻔﻌﻞ ﻓَﻤَﺎ ﺑﻠﻐﺖ ﺭﺳَﺎﻟَﺘﻪ ﻭَﺍﻟﻠﻪ ﻳَﻌْﺼِﻤﻚ ﻣﻦ ﺍﻟﻨَّﺎﺱ অর্থাৎ অর্থাৎ ইবনে আবী হাতেম, ইবনে মারদুবিয়া এবং ইবনে আসাকিরের বর্ণনায় রয়েছে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (رضي الله عنه) বলেছেন,গাদীরে খুমে কুপের নিকট হযরত আলী (رضي الله عنه) এর শানে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। ইবনে মারদুবিয়ার বর্ণনায় রয়েছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (رضي الله عنه) বলেন, আমরা রেসালাতের যুগে এ আয়াতটি পাঠ করতাম “ইয়া আইয়ুহার রাসূল বাল্লিগ মা উনঝিলা ইলাইকা মিররব্বিক। ইন্না আলিয়ান মাওলাল মুমিনিনা ওয়া ইল্লাম তাফয়াল ফামা বাল্লাগতা রিসালাতাহু ওয়াল্লাহু ইয়া’সিমুকা মিনান্নাস” অর্থাৎ হে রাসূল! আপনার রবের নিকট থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা প্রচার করুন। নিশ্চয়ই আলী (رضي الله عنه) মুমিনদের মাওলা (অভিভাবক)। যদি আপনি এরূপ না করেন তবে তো আপনি তাঁর রেসালাত প্রচার করলেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। (সূত্রঃ ইমাম সুয়ুতী: তাফসীরে দুররে মনসুর, ২য় খন্ড পৃষ্ঠা নং ২৯৮) ইহা হতে “আন্না আলীউন মাওলাল মোমেনীন” কথাটি কোরান হতে বাদ দেয়া হয়েছিল ওসমানের (র) প্রকাশনা হতে। মুসা নবীর সঙ্গে যেমন হারুনের নাম কোরানে উল্লেখ করা হয়েছে, সেইরুপে আলী (আ) নামও কোরানে কয়েকবার ছিল। ( ইবনে আবি হাতেম বর্ননা করেছেন, আবু সাঈদ খুদরী হতে উক্ত আয়াত হযরত আলীর শানে নাজেল হয়েছে। ইবনে মারদুইয়া ইবনে ওমর হতে বর্ননা করেন যে, আমরা উক্ত আয়াত রসুলের (আ) এর সামনে এইভাবে পড়তামঃ তফসীরে দোররে মনসুর; মোল্লা জালালউদ্দিন শিউতী; ২য় খন্ড, মিশর থেকে প্রকাশিত) সূরা মায়েদার ৬৭ নং আয়াতের সমর্থনে কতিপয় হাদীস নিম্নে উপস্থাপন করা হলো

(১) গ্রন্থঃ মিশকাতুল মাসাবীহ (মিশকাত) ৬১০৩- বারা’ ইবনু ‘আযিব ও যায়দ ইবনু আরকাম (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন খুম্ নামক স্থানে ঝিলের কাছে অবতরণ করলেন, তখন তিনি ‘আলী (রাঃ)-এর হাত ধরে বললেন, এটা কি তোমরা জান না, আমি মুমিনদের কাছে তাদের আত্মা অপেক্ষা অধিক প্রিয়? লোকেরা বলল, হ্যাঁ। তিনি (সা.) আবার বললেন, তোমরা কি জান না, আমি প্রত্যেক মুমিনের কাছে তার প্রাণ অপেক্ষা অধিক প্রিয়? তারা বলল, হ্যাঁ। তখন তিনি (সা.) বললেন, হে আল্লাহ! আমি যার (মাওলা) বন্ধু ‘আলীও তার (মাওলা) বন্ধু। (তারপর তিনি এ দু’আ করলেন,) হে আল্লাহ! যে লোক ‘আলীকে ভালোবাসে তুমিও তাকে ভালোবাস। আর যে লোক তাকে শত্রু ভাবে, তুমিও তার সাথে শত্রুতা পোষণ কর। (বর্ণনাকারী বলেন,) এরপর যখন ‘আলী (রাঃ)-এর সাথে ‘উমার (রাঃ)-এর সাক্ষাৎ হয়, তখন তিনি তাকে বললেন, ধন্যবাদ হে আবূ ত্বালিব-এর পুত্র! তুমি সকাল-সন্ধ্যা (অর্থাৎ সবসময়) প্রত্যেক ঈমানদার নারী-পুরুষদের (মাওলা) বন্ধু হয়েছ। (আহমাদ) اَلْفصْلُ الثَّالِثُ (بَاب مَنَاقِب عَليّ بن أبي طَالب) وَعَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ وَزَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا نَزَلَ بِغَدِيرِ خُمٍّ أَخَذَ بِيَدِ عَلِيٍّ فَقَالَ: «أَلَسْتُمْ تَعْلَمُونَ أَنِّي أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ؟» قَالُوا: بَلَى قَالَ: «أَلَسْتُمْ تَعْلَمُونَ أَنِّي أَوْلَى بِكُلِّ مُؤْمِنٍ مِنْ نَفْسِهِ؟» قَالُوا: بَلَى قَالَ: «اللَّهُمَّ مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلِيٌّ مَوْلَاهُ اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ» . فَلَقِيَهُ عُمَرُ بَعْدَ ذَلِكَ فَقَالَ لَهُ: هَنِيئًا يَا ابْنَ أَبِي طَالِبٍ أَصْبَحْتَ وَأَمْسَيْتَ مَوْلَى كلَّ مُؤمن ومؤمنة. (২) গ্রন্থঃ সূনান আত তিরমিজী [তাহকীককৃত] ৩৭১৩। আবূ সারীহাহ অথবা যাইদ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি যার সাথী বা পৃষ্ঠপোষক, আলীও তার সাথী বা পৃষ্ঠপোষক। ( আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা) حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ بَشَّارٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، عَنْ سَلَمَةَ بْنِ كُهَيْلٍ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا الطُّفَيْلِ، يُحَدِّثُ عَنْ أَبِي سَرِيْحَةَ، أَوْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ شَكَّ شُعْبَةُ – عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ “ مَنْ كُنْتُ مَوْلاَهُ فَعَلِيٌّ مَوْلاَهُ ” . (৩) গ্রন্থঃ সুনানে ইবনে মাজাহ ৮/১২১। সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুআবিয়াহ (রাঃ) একবার হাজ্জ (হজ্জ) করতে আসেন। সা’দ (রাঃ) তার নিকট উপস্থিত হলে লোকেরা আলী (রাঃ) সম্পর্কে (অশোভন) উক্তি করে। এতে সা’দ (রাঃ) অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন, তোমরা এমন এক ব্যাক্তি সম্পর্কে কটূক্তি করলে যার সম্পর্কে আমি রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ আমি যার বন্ধু, আলী তার বন্ধু। (আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা)। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরো বলতে শুনেছিঃ তুমি আমার কাছে ঐরূপ যেরূপ ছিলেন হারূন (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মূসা (আলাইহিস সালাম) এর নিকট। তবে আমার পরে কোন নবী নেই। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আরো বলতে শুনেছিঃ আজ (খায়বার যুদ্ধের দিন) আমি অবশ্যই এমন ব্যাক্তির হাতে (যুদ্ধের) পতাকা অর্পণ করবো, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। ” بَاب فَضْلِ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ، حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ مُسْلِمٍ، عَنِ ابْنِ سَابِطٍ، – وَ