স্কুলের সরবরাহকৃত খাবারে ভরসা, কুপনে শঙ্কা
সরদার জিয়া উদ্দিন-
উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
ক্ষুধার্ত পেটে পড়া মাথায় ঢোকে না, গ্রামের যেকোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এ কথা হাড়ে হাড়ে জানেন। সকালে কিছু না খেয়েই যে শিশু স্কুলে আসে, দুপুর গড়াতেই তার মনোযোগ হারিয়ে যায় ক্লাসরুমের জানালা গলে। এই বাস্তবতা থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে মানবিক উদ্যোগগুলোর একটি। বর্তমানে দেশের ১৫০টি উপজেলায় প্রায় ৩১ লাখ শিশু সপ্তাহে পাঁচ দিন রুটি, ডিম, ইউএইচটি দুধ, ফর্টিফায়েড বিস্কুট ও মৌসুমি ফল পাচ্ছে। সাপাহার, সারিয়াকান্দি ও বেলকুচি উপজেলার শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, বর্ষা-বাদলেও উপস্থিতি কমেনি, শিশুরা জানে, স্কুলে গেলে খাবার আছে। সরকার ঘোষণা দিয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় এক কোটি দশ লাখ শিক্ষার্থী এর আওতায় আসবে। এটি নিঃসন্দেহে সাহসী ও প্রশংসনীয় অঙ্গীকার। স্কুল ফিডিংয়ের সুফল কেবল একবেলা খাবারে সীমিত নয়। এটি ঝরে পড়া কমায়, মেয়েশিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখে, অপুষ্টি ও খর্বতার বিরুদ্ধে লড়ে এবং দরিদ্র পরিবারের ওপর থেকে খরচের চাপ খানিকটা সরায়। এক কাতারে বসে খাওয়া শিশুদের মধ্যে সাম্য ও সামাজিকতার বোধও গড়ে তোলে। ধনী-গরিবের দেয়াল সেখানে কিছুটা হলেও নিচু হয়। কিন্তু এই ভালো উদ্যোগের সামনে এখন একটি প্রশ্নবিদ্ধ প্রস্তাব কুপন পদ্ধতি। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অনিয়ম-দুর্নীতি ঠেকাতে প্রতিটি শিশুকে ৩৮ টাকা ৫০ পয়সার কুপন দেওয়ার কথা ভাবছে সরকার, যা দিয়ে তারা স্থানীয় তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পছন্দের খাবার কিনবে, পছন্দের খাবার না পেলে টাকা থাকবে শিশুর কাছেই। উদ্দেশ্য সৎ হলেও নকশাটি গভীর ঝুঁকিতে ভরা। প্রথমত, ছয় থেকে দশ বছরের শিশুর কাছে পুষ্টি নয়, স্বাদই মুখ্য। হাতে কুপন পেলে সে ডিম-দুধের বদলে চিপস, চানাচুর, রঙিন জুস বা মিষ্টি বেছে নেবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে পুষ্টি নিশ্চিতের মূল লক্ষ্যই হারিয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, টাকা শিশুর কাছে থাকবে”এই বিধান কর্মসূচিকে খাদ্য সহায়তা থেকে নগদ সহায়তায় রূপান্তর করে। অভাবী পরিবারে সেই টাকা শিশুর পেটে নয়, সংসারের অন্য খাতে যাবে। কুপন কেনাবেচা ও বাট্টায় বিনিময়ের একটি ছোট বাজারও তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, দুর্নীতি দূর হবে না, শুধু ঠিকানা বদলাবে। তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ী” বাছাইয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, সিন্ডিকেট, ভুয়া কুপন জমা দিয়ে বিল তোলা এসব আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হাজার হাজার ছোট দোকানের খাদ্যমান ও স্বাস্থ্যবিধি তদারকির সক্ষমতা কি উপজেলা শিক্ষা অফিসের আছে? চতুর্থত, চর, হাওর ও পাহাড়ি এলাকার অনেক বিদ্যালয়ের আশপাশে উপযুক্ত খাবারের দোকানই নেই। সেখানে কুপন কার্যত অকেজো। আবার কুপন বিতরণ, হিসাব ও সমন্বয়ের নতুন বোঝা চাপবে শিক্ষকদের কাঁধে, যা পাঠদানের সময় কেড়ে নেবে। পঞ্চমত, শিশুরা যখন আলাদা দোকানে আলাদা খাবার কিনবে, তখন একসঙ্গে বসে খাওয়ার সামাজিক শিক্ষা ও সাম্যের বোধটিও হারিয়ে যাবে।অনিয়মের সমাধান কর্মসূচির মূল দর্শন পাল্টে দেওয়া নয়, তদারকি শক্ত করা। নির্ধারিত পুষ্টিকর মেনু বহাল রেখে বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক ও মা সমাবেশকে মান যাচাইয়ে যুক্ত করা, সরবরাহকারী ও বিতরণের তথ্য ডিজিটালি উন্মুক্ত রাখা, স্থানীয় কৃষকের ডিম-দুধ-ফল সংগ্রহে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং অভিযোগ জানানোর হটলাইন চালু করা এগুলোই টেকসই পথ। কুপন পদ্ধতি সারা দেশে চাপিয়ে দেওয়ার আগে অন্তত সীমিত পরিসরে স্বাধীন মূল্যায়নসহ পাইলট করা হোক। শিশুর থালা পরীক্ষাগার নয়। যে কর্মসূচি শিশুদের ক্লাসরুমে ফিরিয়ে আনছে, তাকে দুর্বল করে নয় আরও জবাবদিহিমূলক করেই এগিয়ে নিতে হবে।
