লেখক – অধ্যাপিকা ডক্টর হোসনে আরা বেগম ।।
পৃথিবীর প্রথম বিশ্বের পুলিশের মান-সম্মান, সুবিধা, গণমানুষের আস্থা এগুলো আইন সেবাদাতা, সেবাগ্রহীতা উভয়ের নিকটই আনন্দদায়ক, আকর্ষণীয়। সেই উন্নত বিশ্বের ব্রিটিশের পৌনে ২০০ বছর দখলে থাকা বাংলাদেশ পুলিশের জন্য প্রণীত আইন তা এখনও ব্রিটিশের আইন। উপনিবেশবাদের আইন এবং স্বাধীন দেশের আইন (আজকের স্বাধীন দেশের পুলিশ ১৮৬১ সালের আইনে চলে) কখনোই দেশবাসীর সহায়ক হয় না। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টের পালন, দুষ্টের দমন তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে বিড়ম্বনা হচ্ছে। বাংলাদেশের আদর্শিক আমলা মরহুম আকবর আলী খান, আমার দেখা তাঁর জীবনমান আইন সংস্কারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। এখনও আইন সংস্কারের জায়গায় তেমন হাত পড়ে নাই। আর তা পড়বেই বা কিভাবে! আইনসভার সভ্য পার্লামেন্ট সদস্যগণের আইন নিয়ে কাজ করা অপেক্ষা অবকাঠামো নিয়ে কাজ করার আগ্রহ অপরিসীম। ক্ষমতার তখ্তকে তাজা এবং স্থায়ী করার জন্য মন্ত্রীসভাও এমপি-গণকে কাজের কমিশনভাগী করার জন্য কন্ট্রাক্টর তদারকির কাজ দেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ করতে চাইলেও মূলে পরিবর্তন, সংস্কার আনা হচ্ছে না। ২০২৪ সালের ১লা জুলাই থেকে ৫-ই আগস্ট পর্যন্ত মাঠ কামড়ে ধরে থাকার তারুণ্য ছাত্র-সমাজ কোটা সংস্কার থেকে রাষ্ট্র সংস্কার, বাংলাদেশের অন্যতম বড় জাতীয়তাবাদী দলের রাষ্ট্র মেরামতের প্রস্তাবের সাদৃশ্য প্রস্তাব করায় গণমানুষের বিএনপি’র সমর্থক জনগোষ্ঠী কোটা সংস্কারকারীগণের সঙ্গী হওয়ার ঘোষণা দিলেন, আন্দোলন তুঙ্গে উঠল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের ক্ষমতাধররা মানুষের মন, মাটির গন্ধ অনুভব করতে পারলেন না। তাদের স্বভাবজাত হায়-হুঙ্কার দিতেই থাকলেন। ছাত্র বান্ধব, মানুষ বান্ধব ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীকে সে সময় সংগ্রামী ছাত্র সমাজের মুখোমুখী আলোচনার আগ্রহ অপেক্ষা দমনের দম্ভ এবং দুরুহ অভিপ্রায় করলেন। ফলে ৫-ই আগস্টে বিপ্লব, অভ্যুত্থান ঘটে গেল। সংস্কার সংগ্রামের ৩৬ দিনে ছাত্র হত্যা, সাধারণ মানুষ হত্যা, পুলিশ হত্যা ইত্যাদি দুঃখজনক, অসহ্য বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটছে। শুধু তাই নয়, ১৫ বছর শাসনামলে তিন, তিন বার গণমানুষের মতামত (ভোট) বিহীনভাবে নির্বাচন সমাপ্ত গণতন্ত্রের জয় গাঁথাতে পুলিশের অংশগ্রহণ অস্বীকার করা যায় না। আগস্ট বিপ্লব ২০২৪ এর পর অসংখ্য পুলিশের কান্না, কর্মত্যাগ এই চিত্রগুলো কোনো স্বাধীন দেশের বৈশিষ্ট্য নয়। পুলিশের আস্তানা, অফিস সহ শত শত স্থাপনা, সম্পদ লুট করা হয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে, আগুনে ভস্মীভূত করা হয়েছে, পুলিশ পরিবারের সন্তানকেও ইয়াতিম করা হয়েছে, নারীকে বিধবা করা হয়েছে। সুযোগ-সুবিধার পর্বততুল্য বৈষম্য ঘাড়ে নিয়ে মাঠের মানি কালেক্টর পুলিশদেরকে সরকারের লেজুড়বৃত্তি করতে লেলানো হয়েছে; আজকের কান্নায় পুলিশরা এই কাহিনীগুলো বলছেন। তাদের যেন আর সরকারের লেজুড়বৃত্তি করতে না হয় সেই উলম্ফন করছেন। কতটা বাস্তবায়ন হবে বিধাতাই জানে। বহুবিধ অসংখ্য মিডিয়ার মাধ্যমে মাঠে সাধারণ জনতা এবং পুলিশের মৃত্যুর চিত্র, পারিবারিক আহাজারি এই দৃশ্যগুলো দেখায় চোখের পানি সাগর পেরিয়ে যাবে। পুলিশ একাই কাঁদছেন না। মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ, দেশের ভিতর-বাহিরে সবাই কাঁদছেন। এর মধ্যেও লুটেরা শ্রেণী যা করছে, লজ্জায়-কষ্টে-ক্ষোভে-দুঃখে মাথা হেঁট হয়।
৫-ই আগস্ট বিপ্লব পরবর্তীতে ধ্বংসলীলা, লুটতরাজ, হতাহত, অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ইত্যাদি বীভৎস তান্ডব অবলোকন, কষ্ট সংগ্রামে রত তরুণদের পক্ষ থেকে আমরা যারা তাকওয়ার তিল মাত্র অনুসরণ করি না, বিশ্বাস করি না, যে বিশ্ব ব্যক্তিত্বকে সুদখোর-রক্তচোষা বলে গালি দিয়েছি, তারাই তাঁকে সিভিল সরকার প্রধানের প্রস্তাব দিয়ে নানা প্রকার সেবা কাজ, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজ, ট্রাফিকিং করার কাজ, দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জান-মাল পাহারা দেওয়ার কাজ, এই তরুণরাই করছে, তাতে দুঃখ লাঘব হয়, ভবিষ্যতে স্বর্ণযুগের আশায় বুক ভরে যায়। সকল অমানিশার পর চাঁদের আলো আসে। তাই সেইদিন মা-ছেলে উভয়ের বক্তব্যই বৈষম্যবিরোধী, সংস্কারবাদী তরুণ আন্দোলনকারীদের সাথে সমস্বরে বললেন, সকল অন্যায়ের বিচার হবে, বিএনপি’র কেউ অন্যায় করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিন, সেনাবাহিনী প্রধান একই কথা বলেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভাবি প্রধানমন্ত্রী (প্রধান উপদেষ্টা) বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব, অর্থনীতিবিদ, নোবেল লরেট, স্পষ্টবাদী, আকাশের মতো উদার মানসিকতা, যিনি ফকুন্নীদের গড়া টিএমএসএস-কে সহায়তা করার জন্য উত্তরবঙ্গের বগুড়ায় টিএমএসএস ফাউন্ডেশন অফিসে দুই-দুইবার পদধূলি দিয়েছেন, অপেশাদার টিএমএসএস-কে পেশাদার করার জন্য গ্রামীণ ব্যাংকের অভিজ্ঞ জনবলকে (হাবিবুল হাছান ছিদ্দিকী, আতাউর রহমান) লিয়েনে নিযুক্ত করা ছাড়াও গ্রামীণ ব্যাংকের অডিট টিম পাঠিয়ে Close Carpet অডিট করেছেন বারবার। ওয়াশিংটন ডিসিতে মাইক্রোক্রেডিট সামিটে আমাকে প্যানেল বক্তা হিসেবে আধভাঙ্গা ইংরেজী ভাষায় বক্তব্যের সুযোগ করে দিয়েছেন, নারী নেতৃত্বকে তুলে ধরেছেন। বিদ্বেষ বিবর্জিত, নিরহংকার অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের আনন্দে তুষ্ট ব্যক্তিত্বের হাতে যে কয়দিনই এই দেশের শাসনভার থাকুক না কেন, দেশ ভালো চলবে, রাষ্ট্র মেরামত হবে। সম্পদহীন, পা-িত্বহীন জ্ঞানযুক্ত জনগণের মধ্যে শূন্য থেকে সৃষ্ট সংস্থা টিএমএসএস-এর ৪৪ বছর পরিচালন অভিজ্ঞতার সফলতা-বিফলতার আলোকে রাষ্ট্র মেরামত প্রেক্ষিত আমাদের কয়েকটি প্রস্তাব:
১) দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট;
২) কোনো পার্লামেন্ট মেম্বারকে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নয়, আইন সংস্কার, আইন প্রবর্তন, আইন পরিবর্তন, সুশাসন-শুদ্ধাচার ইত্যাদি অর্জনের দায়িত্ব দিতে হবে;
৩) রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যকরণের নিমিত্তে গণভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন Referendum পদ্ধতি চালুকরণ, এক ব্যক্তি একটানা দুই বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত না হওয়ার পদ্ধতি প্রবর্তন,
৪) ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের নিমিত্তে দেশকে কয়েকটি প্রদেশে বিভক্ত করে প্রাদেশিক সরকার গঠন,
৫) আনুপাতিকহারে ভোটের ভিত্তিতে সরকার গঠন, যাতে ভোট সংগ্রহকালে ভোট চুরি, ব্যালট ছিনতাই, ভোটে বাঁধা ইত্যাদি না হয়, সকল দল গুরুত্ব পায়,
৬) দুর্নীতিকে শূন্যের কোঠায় আনতে হবে। এজন্য সরকারি, বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আয়ের বৈধতা এবং আয়ের সাথে সম্পদের সামঞ্জস্যতা নিরূপণ করে অসামঞ্জস্য সম্পদ রাষ্ট্র অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিধান/আইন প্রবর্তন করতে হবে,
৭) আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের জন্য অনুন্নত অঞ্চলে শিল্প-কারখানা, শহর-নগর সৃষ্টির জন্য সহজ শর্তে, স্বল্প সুদে ঋণ দিতে হবে, প্রণোদনা দিতে হবে,
৮) শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন করতে হবে,
৯) বিচার ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে নির্বাহী ব্যবস্থা থেকে আলাদা এবং স্বাধীন করতে হবে, যাতে মোবাইল কোর্ট নামে আইনের অপব্যবহারের আবশ্যকতা না হয়,
১০) এই ৩৬ দিনের সংগ্রামে নিহত, আহত, লুট-ভাংচুরের স্বীকার ক্ষতিগ্রস্থদের ন্যায়-ন্যায্য বিচার বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারকে আকর্ষণীয় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে,
১১) বাংলাদেশিদের মধ্যে ধর্ম-জাতি-গোষ্ঠী ভিন্নতা জনিত কারণে এবং দল বিরোধী/প্রতিপক্ষ জনিত কারণে যেন কেউই ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। ভোটে যারা বিজয় পায় না, তারা যেন সাধুবাদ-স্বাগত জানায়, এরূপ শান্ত সমাজ গঠন করতে হবে,
১২) জাতীয় নির্বাচনে ‘না ভোট’ এর প্রবর্তন এবং শতকরা ৫০ ভাগ ভোটারের উপস্থিতবিহীনতাকে নির্বাচন গ্রহণ না করা। সকল জাতীয়ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর (বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলায় যে সমস্ত রাজনৈতিক দলের দৃশ্যমান কার্যক্রম আছে) অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠানকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। পবিত্র কোরআন এর ভাষ্যমতে, সকল মানুষ সম-সম্মানিত। তাই খোদাতায়ালার সৃষ্ট জীব মানুষকে অযোগ্য গণ্য করে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রাখলে শুধু খোদাদ্রোহীতাই নয়, সম্পদ-সময়ের অপচয়, ব্যুরোক্রেসির বিষাক্ত বাহাদুরী। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে অবাসযোগ্য করে তোলা, জনজট, যানজট এর জব্বর জ্বালানী ক্ষয় করা ইত্যাদি বহুবিধ দিক বিবেচনা করে ১৮ কোটি মানুষের বসবাসকারী বাংলাদেশে কমপক্ষে i) ঢাকা প্রদেশ, ii) উত্তরবঙ্গ প্রদেশ, iii) দক্ষিণবঙ্গ প্রদেশ, iv) পূর্ববঙ্গ প্রদেশ, ইত্যাদি গঠন করে প্রাদেশিক সরকার, প্রাদেশিক বিধান সভা, প্রাদেশিক পার্লামেন্ট, প্রাদেশিক বাজেট ইত্যাদি থাকলে ৫-ই আগস্টের মতো অভ্যুত্থানে ওতো মানুষ লাগতো না, যেত না, লজ্জাজনক লুন্ঠন, লুটতরাজ হতো না। জনগণের গণদাবি, জনস্বীকৃতিকে উপেক্ষা করলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দীর্ঘ বছরের দল আঃলীগের প্রধানকে যেভাবে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে, তা থেকেও খারাপ পরিণতিতে পাশের পড়শি বেশি আস্কারা দিবে। সাধু সাবধান!
অধ্যাপিকা ড. হোসনে-আরা বেগম,
নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস, বগুড়া
তাং ৭.৮.২৪
