হাদীসে গাদীরে খুম :: উত্তরাধিকারী মনোনীত

প্রতিকি ছবি
শেয়ার করুন:
হাদীসে গাদীরে খুম :: উত্তরাধিকারী  মনোনীত হযরত ইমাম আলী (আ.)
নবী (সা.) বিদায় হজ্জ শেষে মদীনার দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে ‘গাদীরে খুম’ নামক একটি স্থানে পৌছানোর পর পবিত্র কুরআনের সূরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াতটি অবতির্ণ হয় । মহানবী (সা.) তাঁর যাত্রা থামিয়ে দিলেন । অত:পর তার আগে চলে যাওয়া এবং পেছনে আগত সকল মুসলমানদেরকে তার কাছে সমবেত হবার আহবান করেন । সবাই মহানবী (সা.)এর কাছে সমবেত হবার পর তাদের উদ্দেশ্যে তিনি এক মহা মূল্যবান ও ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদান করেন । এটাই সেই ঐতিহাসিক ‘গাদীরে খুমের’ ভাষণ হিসেবে পরিচিত । এই ভাষণের মাধ্যমেই তিনি হযরত ইমাম আলী (আ.)-কে তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন ।
হযরত বুরআ (রা.) বলেনঃ বিদায় হজ্জের সময় আমি মহানবীর পবিত্র সান্নিধ্যে উপস্থিত ছিলাম । যখন আমরা ‘গাদীরে খুম’ নামক স্থানে পৌছলাম, তখন মহানবী (সা.) আমাদেরকে ঐ স্থানটি পরিস্কার করার নির্দেশ দিলেন । এরপর তিনি হযরত ইমাম আলী (আ.)-কে তার ডান দিকে এনে তার হাত দু‘টি জনসমক্ষে উপর দিকে উচিয়ে ধরলেন । তারপর তিনি বললেনঃ আমি কি তোমাদের অভিভাবক (কর্তা) নই? সবাই উত্তর দিল, আমরা সবাই আপনারই অধীন । অতঃপর তিনি বললেন : আমি যার অভিভাবক ও কর্তা আলীও তার অভিভাবক ও কর্তা হবে। হে আল্লাহ্! আলীর বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব কর এবং আলীর শত্রুর সাথে শত্রুতা কর । এরপর দ্বিতীয় খলিফা ওমর বিন খাত্তাব হযরত আলী (আ.) কে সম্বোধন করে বললেন : ‘তোমার এই অমূল্য পদমর্যাদা আরও উন্নত হোক! কেননা তুমি আমার এবং সকল মু’মিনদের অভিভাবক হয়েছ ।’ -আল্ বিদায়াহ্ ওয়ান নিহায়াহ, ৫ম খণ্ড, ২০৮ নং পৃষ্ঠা, এবং ৭ম খণ্ড, ৩৪৬ নং পৃষ্ঠা । যাখাইরূল উকবা, (তাবারী), ১৩৫৬ হিজরী মিশরীয় সংস্করণ, ৬৭ নং পৃষ্ঠা । ফুসুলুল মুহিম্মাহু , (ইবনে সাব্বাগ), ২য় খণ্ড, ২৩ নং পৃষ্ঠা । খাসাইসুন -নাসাঈ, ১৩৫৯ হিজরীর নাজাফীয় সংস্করণ, ৩১ নং পৃষ্ঠা ।
জনাব আল্লামা বাহরানী (রহঃ) তার ‘গায়াতুল মারাম’ নামক গ্রন্থে সুন্নী সূত্রে বর্ণিত ৮৯ টি হাদীস এবং শীয়া সূত্রে বর্ণিত ৪৩টি হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
সাফিনাতুন নুহের হাদীসঃ
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেনঃ মহানবী (সা.) বলেছেন যে, ‘আমার আহলে বাইতের উদাহরণ হযরত নুহ (আ.) এর নৌকার মত । যারা নৌকায় আরহণ করল, তারাই রক্ষা পল । আর যারা তা করল না তারা সবাই ডুবে মরল’ । (‘যাখাইরূল উকবা’ ২০ নং পৃষ্ঠা । ‘আস সাওয়াইকুল মুহরিকাহ (ইবনে হাজার)’ মিশরীয় সংস্করণ, ৮৪ ও ১৫০ নং পৃষ্ঠা । ‘তারীখুল খুলাফাহ (জালালুদ্দীন আস সূয়ুতী)’ ৩০৭ নং পৃষ্ঠা। ‘নরুল আবসার (শাবালঞ্জি)’ মিশরীয় সংস্করণ, ১১৪ নং পৃষ্ঠা।)
জনাব আল্লামা বাহরানী, তার ‘গায়াতুল মারাম’ নামক গ্রন্থের ২৩৭ নং পৃষ্ঠায় সুন্নীদের ১১টি সূত্র থেকে এবং শীয়াদের ৭টি সূত্র থেকে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ।
হাদীসে সাকালাইনঃ
হযরত যাইদ বিন আরকাম (রা.) বলেন : মহানবী (সা.) বলেছেনঃ মনে হচ্ছে আল্লাহ যেন আমাকে তাঁর দিকেই আহবান জানাচ্ছেন, অবশ্যই আমাকে তার প্রত্যুত্তর দিতে হবে । তবে আমি তোমাদের মাঝে অত্যন্ত ভারী (গুরুত্বপূর্ণ) দু‘টি জিনিস রেখে যাচ্ছি : তা হচ্ছে আল্লাহর এই ঐশী গ্রন্থ (কুরআন) এবং আমার পবিত্র আহলে বাইত। তাদের সাথে কেমন ব্যাবহার করবে, সে ব্যাপারে সতর্ক থেকো । এ দু’টা (পবিত্র কুরআন ও আহলে বাইত) জিনিষ ‘হাউজে কাউসারে’ (কেয়ামতের দিন) আমার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত কখনোই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। (আল বিদাহয়াহ্ ওয়ান্ নিহায়াহ্ ৫ম খণ্ড, ২০৯ নং পৃষ্ঠা । যাখাইরূল উকবা, (তাবারী) ১৬ নং পৃষ্ঠা । ফুসুলুল মুহিম্মাহু , ২২নং পৃষ্ঠা । খাসইসুন্ -নাসাঈ, ৩০ নং পৃষ্ঠা । আস্ সাওয়াইকুল মুহরিকাহ , ১৪৭ নং পৃষ্ঠা ।)
গায়াতুল মারাম’ গ্রন্থে ‘ আল্লামা বাহরানী ৩৯টি সুন্নী সূত্রে এবং ৮২টি শীয়া সূত্রে উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন । ‘হাদীসে সাকালাইন’ একটি বিখ্যাত ও সর্বজনস্বীকৃত এবং অকাট্যভাবে প্রমাণিত সূত্রে বর্ণিত । উক্ত হাদীসটি অসংখ্য সূত্রে এবং বিভিন্ন ধরণের বর্ণনায় (একই অর্থে ) বর্ণিত হয়েছে । উক্ত হাদীসের সত্যতার ব্যাপারে সুন্নী ও শীয়া, উভয় সম্প্রদায়ই স্বীকৃতি প্রদান করেছে । এ ব্যাপারে তারা উভয়ই সম্পূর্ণরূপে একমত । আলোচ্য হাদীসটি এবং এ ধরণের হাদীস থেকে বেশ কিছু বিষয় আমাদের কাছে প্রমাণিত হয় । তা হল :
১. পবিত্র কুরআন যেভাবে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত মানব জাতির মাঝে টিকে থাকবে, মহানবী (সা.) এর পবিত্র আহলে বাইত ও তার পাশাপাশি মানব জাতির মাঝে কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবেন । অর্থাৎ এ বিশ্বের কোন যুগই ইমাম বা প্রকৃত নেতাবিহীন অবস্থায় থাকবে না ।
২. নবী (সা.) মানব জাতির কাছে এই দু’টো অমূল্য আমানত গচ্ছিত রাখার মাধ্যমে তাদের সর্ব প্রকার ধর্মীয় ও জ্ঞানমূলক প্রয়োজন মেটানো এবং বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে গেছেন । মহানবী (সা.) তাঁর পবিত্র আহলে বাইতগণকে (আ.) সকল প্রকার জ্ঞানের অমূল্য রত্ন ভান্ডার হিসেবে মুসলমানদের মাঝে পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন । মহানবী (সা.) তাঁর পবিত্র আহলে বাইতগণের (আ.) যে কোন কথা ও কাজকেই নির্ভরযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন ।
৩. পবিত্র কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর পবিত্র আহলে বাইতকে অবশ্যই পরস্পর থেকে পৃথক করা যাবে না । মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইতের পবিত্র জ্ঞানধারা থেকে মুখ ফিরিয়ে তাদের উপদেশ ও হেদায়েতের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাবার অধিকার কোন মুসলমানেরই নেই ।
৪. মানুষ যদি পবিত্র আহলে বাইতগণের (আ.) আনুগত্য করে এবং তাদের কথা মেনে চলে, তাহলে কখনোই তারা পথভ্রষ্ট হবে না । কেননা, তারা সর্বদাই সত্যের সাথে অবস্থান করছেন ।
৫. মানুষের জন্যে প্রয়োজনীয় সর্ব প্রকার ধর্মীয় ও অন্য সকল জ্ঞানই পবিত্র আহলে বাইতগণের (আ.) কাছে রয়েছে। তাই যারা তাদের অনুসরণ করবে, তারা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না, এবং তারা অবশ্যই জীবনের প্রকৃত সাফল্য লাভ করবে । অর্থাৎ, পবিত্র আহলে বাইতগণ (আ.) সর্ব প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত ও পবিত্র ।
এ থেকেই বোঝা যায় যে, পবিত্র আহলে বাইত বলতে মহানবী (সা.) এর পরিবারের সকল আত্মীয়বর্গ ও বংশধরকেই বোঝায় না । বরং পবিত্র আহলে বাইত বলতে নবী বংশের বিশেষ ব্যক্তিবর্গকেই বোঝানো হয়েছে । ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া এবং সর্বপ্রকার পাপ ও ভুল থেকে তাদের অস্তিত্ব মুক্ত ও পবিত্র হওয়াই ঐ বিশেষ ব্যক্তিবর্গের বৈশিষ্ট্য । যাতে করে তারা প্রকৃত নেতৃত্বের গুণাবলীর অধিকারী হতে পারেন । ঐ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ হচ্ছেন : হযরত ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) এবং তার বংশের অন্য এগারোজন সন্তান। তাঁরা প্রত্যেকেই একের পর এক ইমাম হিসেবে মনোনীত হয়েছেন । একই ব্যাখা মহানবী (আ.) এর অন্য একটি হাদীসে পাওয়া যায় ।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেনঃ আমি মহানবী (সা.) কে জিজ্ঞাস করলাম যে, আপনার যেসব আত্মীয়কে ভালবাসা আমাদের জন্যে ওয়াজিব, তারা কারা? মহানবী (সা.) বললেনঃ ‘তারা হলেন আলী, ফাতিমা, হাসান এবং হোসাইন। (-ইয়ানাবী-উল-মুয়াদ্দাহ , ৩১১ নং পৃষ্ঠা।)
হযরত যাবির (রা.) বলেন : নবী (সা.) বলেছেন : মহান আল্লাহ প্রত্যেক নবীর বংশকেই স্বীয় পবিত্র সত্তার মাঝে নিহিত রেখেছেন । কিন্তু আমার বংশকে আলীর মাঝেই সুপ্ত রেখেছেন । (-ইয়ানাবী-উল-মুয়াদ্দাহ, ৩১৮ নং পৃষ্ঠা ।)
হাদীসে হাক্কঃ
হযরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন আমি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে, তিনি বলেছেনঃ ‘আলী পবিত্র কুরআন ও সত্যের সাথে রয়েছে । আর পবিত্র কুরআন ও সত্যও আলীর সাথে থাকবে এবং তারা ‘হাউজে কাওসারে আমার সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত কখনই পরস্পর বিচ্ছিন হবে না । উক্ত হাদীসটি ‘গায়াতুল মারাম’ গ্রন্থের ৫৩৯ নং পৃষ্ঠায় একই অর্থে সুন্নী সূত্রে ১৪টি এবং শীয়া সূত্রে ১০টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে ।
হাদীসে মানযিলাতঃ
হযরত সা’দ বিন ওয়াক্কাস (রা.) বলেনঃ আল্লাহর রাসূল (সা.) হযরত আলী (আ.) কে বলেছেনঃ ‘তুমি কি এতেই সন্তুষ্ট নও যে, তুমি (আলী) আমার কাছে মুসা (নবী) আর হারুনের মত? শুধু এই টুকুই পার্থক্য যে, আমার পর আর কোন নবী আসবে না । (বিদায়াহ্ ওয়ান্ নিহায়াহ, ৭ম খণ্ড, ৩৩৯ নং পৃষ্ঠা । যাখাইরুল উকবা, (তাবারী ), ৫৩ নং পৃষ্ঠা । ফুসুলুল মুহিম্মাহ, ২১ নং পৃষ্ঠা । কিফায়াতুত তালিব (গাঞ্জী শাফেয়ী), ১১৪৮ – ১৫৪ পৃষ্ঠা । খাসাইসুন্ – নাসাঈ, ১৯- ২৫ নং পৃষ্ঠা । আস্ সাওয়াইকুল মুরিকাহ , ১৭৭ নং পৃষ্ঠা ।) ‘গায়াতুল মারাম’ গ্রন্থের ১০৯ নং পৃষ্ঠায় জনাব আল্লামা বাহরানী উক্ত হাদীসটি ১০০টি সুন্নী সূত্রে এবং ৭০টি শীয়া সূত্রে বর্ণনা করেছেন ।
আত্মীয়দের দাওয়াতের হাদীসঃ
মহানবী (সা.) তার নিকট আত্মীয়দেরকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন । আমন্ত্রিত অতিথিদের খাওয়া শেষ হওয়ার পর তিনি তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন : এমন কোন ব্যক্তির কথা আমার জানা নেই, যে আমার চেয়ে উত্তম কিছু তার জাতির জন্যে উপহার স্বরূপ এনেছে । মহান আল্লাহ তোমাদেরকে তার প্রতি আহবান জানানোর জন্যে আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন । অতএব তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে আমাকে এ পথে সহযোগিতা করবে? আর সে হবে আমার উত্তরাধিকারী এবং আমার খলিফা বা প্রতিনিধি । উপস্থিত সবাই নিরুত্তর রইল । অথচ আলী (আ.) যদিও উপস্থিত সবার মাঝে কনিষ্ট ছিলেন, তিনি বললেনঃ ‘আমিই হব আপনার প্রতিনিধি এবং সহযোগী’ । অতঃপর মহানবী (সা.) নিজের হাত তাঁর ঘাড়ের উপর রেখে বললেন : ‘আমার এ ভাইটি আমার উত্তরাধিকারী এবং আমার খলিফা । তোমরা সবাই অবশ্যই তাঁর আনুগত্য করবে’ । এ দৃশ্য প্রত্যক্ষের পর উপস্থিত সবাই সেখান থেকে উঠে গেল এবং এ বিষয় নিয়ে ঠাট্রা-বিদ্রূপ করতে লাগলো । তারা জনাব আবু তালিবকে বললঃ মুহাম্মদ তোমাকে তোমার ছেলের আনুগত্য করার জন্যে নির্দেশ দিয়েছে । (তারীখু আবিল ফিদা, ১ম খণ্ড, ১১৬ নং পৃষ্ঠা।)
এ জাতীয় হাদীসের সংখ্যা অনেক, যেমন : হযরত হুযাইফা বলেন মহানবী (সা.) বলেছেনঃ তোমরা যদি আমার পরে আলীকে খলিফা ও আমার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নিযুক্ত কর, তাহলে তোমরা তাকে একজন দিব্য দৃষ্টি সম্পন্ন পথ প্রদর্শক হিসেবেই পাবে, যে তোমাদেরকে সৎপথে চলতে উদ্বুদ্ধ করবে । তবে আমার মনে হয় না যে, এমন কাজ তোমরা করবে ।
(খলিফাতুল আউলিয়া, আবু নাঈম, ১ম খণ্ড, ৬৪ নং পৃষ্ঠা । কিফায়াতুত তালিব, ৬৭ নং পৃষ্ঠা, ১৩৫৬ হিজরীর নাজাফিয় মুদ্রণ ।)
হযরত ইবনু মারদুইয়াহ (রা.) বলেনঃ মহানবী (সা.) বলেছেন যে, যে ব্যক্তি আমার মতই জীবন যাপন ও মৃত্যুবরণ করতে চায় এবং বহেশতবাসী হতে চায়, সে যেন আমার পরে আলীর প্রেমিক হয় ও আমার পবিত্র আহলে বাইতের অনুসারী হয় । কারণ, তারা আমারই রক্ত সম্পর্কের ঘনিষ্ট আত্মিয়বর্গ এবং আমারই কাদামাটি থেকে সৃষ্টি হয়েছে । আমার জ্ঞান ও বোধশক্তি তারাই লাভ করেছে । সুতরাং হতভাগ্য সেই, যে তাদের পদমর্যাদাকে অস্বীকার করবে । অবশ্যই আমার সুপারিশ (শাফায়াত) থেকে তারা বঞ্চিত হবে । (মুন্তাখাবু কানযুল উম্মাল, মুসনাদে আহমাদ, ৫ম খণ্ড, ৯৪ নং পৃষ্ঠা ।}
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস সমূহের বক্তব্যে শীয়াদের বক্তব্যেরই সমর্থন পাওয়া যায় । অবশ্য ঐসব হাদীসের যথেষ্ট অপব্যাখা করা হয়েছে । আর এই অপব্যাখার মাধ্যমে ঐগুলোর মূল অর্থকে গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে ।
পূ্র্বোক্ত আলোচনার পক্ষে কিছু কথা
নবী (সা.) জীবনের শেষ দিনগুলো যখন অসুস্থ অবস্থায় কাটাচ্ছিলেন । তখন একদল সাহাবী রাসূল (সা.)-এর কাছে উপস্থিত ছিলেন । হযরত রাসূল (সা.) সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিলেন : আমার জন্যে কাগজ ও কলম নিয়ে এসো । কারণ, আমি এমন কিছু তোমাদের জন্য লিখে রেখে যেতে চাই, যা মেনে চললে তোমারা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না । উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে কিছু লোক বললো : ‘এ লোক তো অসুস্থতার ফলে প্রলাপ (?) বকছে । কারণ, আল্লাহর কুরআনই তো আমাদের জন্যে যথেষ্ট’!! এ নিয়ে উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল । রাসূল (সা.)-এ অবস্থা দেখে বললেন : তোমারা এখান থেকে উঠে পড় । আমার কাছ থেকে দুর হয়ে যাও । আল্লাহর রাসূলের কাছে হৈ চৈ করা উচিত নয়’ ।[আল বিদায়াহ্ ওয়ান্ নিহায়াহ্ , ৫ম খণ্ড, ২৭৭ নং পৃষ্ঠা । শারহু ইবনি আবিল হাদিদ, ১ম খণ্ড, ১৩৩ নং পৃষ্ঠা । আল কামিল ফিত তারীখ (ইবনে আসির), ২য় খণ্ড, ২১৭ নং পৃষ্ঠা । তারীখুর রাসূল ওয়াল মুলুক (তাবারী), ২য খণ্ড, ৪৩৬ নং পৃষ্ঠা ।]
পূ্র্বোক্ত অধ্যায়ের বিষয়বস্তু এবং এ অধ্যায়ে বর্ণিত ঘটনা প্রবাহ যদি আমরা আলোচনা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, যারা রাসূল (সা.)-এর ঐ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সেদিন বাধা প্রদান করেছিল, তারাই রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুর পর খেলাফত নির্বাচনের ঘটনা থেকে লাভবান হয়েছিল । বিশেষ করে তারা হযরত আলী (আ.) ও তার অনুসারীদের অজ্ঞাতসারেই খেলাফত নির্বাচনের’ পর্বটি সম্পন্ন করে ।
তারা হযরত আলী (আ.) ও তার অনুসারীদের বিপরীতে ঐ কাজটি সম্পন্ন করেছিল । এরপর সন্দেহের কোন অবকাশ থাকে না যে, উপরোক্ত হাদীসে বর্ণিত ঘটনায় মহানবী (সা.) তার পরবর্তী উত্তরাধিকারী বা স্থলাভিষিক্ত হিসেবে হযরত আলী (আ.)-এর নাম ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন । মহানবী (সা.)-এর নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধা প্রদানপূর্বক ঐ ধরণের কথা বলার মাধ্যমে কথা কাটা-কাটি বা বিতর্ক সৃষ্টিই ছিল মূল উদ্দেশ্য, যাতে করে এর ফলে মহানবী (সা.) তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন থেকে বিরত হতে বাধ্য হন । সুতরাং অসুস্থতাজনিত প্রলাপ বকার কারণে তার নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধা দেয়াই তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল না ।
কারণ,
প্রথমত : আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর পবিত্র মুখ থেকে অসুস্থ কালীন সময়ে অসংলগ্ন একটি কথাও শানা যায়নি । আর এ যাবৎ এ ধরণের কোন ঘটনাও (অসংলগ্ন কথাবার্তা) কেউই বর্ণনা করেনি । ইসলাম নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী কোন মুসলমানই মহানবী (সা.)- এর প্রতি প্রলাপ বকার (?) মত অপবাদ আরোপ করতে পারে না । কারণ, আল্লাহর রাসূল (সা.) ছিলেন ঐশী ‘ইসমাত’ বা নিষ্পাপ হওয়ার গুণে গুণান্বিত।
দ্বিতীয়ত : যদি তাদের কথা (প্রলাপ বকার মিথ্যা অভিযোগ সত্যই হত, তাহলে এর পরের কথাটি (কুরআনই আমাদের জন্যে যথেষ্ট) বলার কোন প্রয়োজন হত না । কারণঃ তাদের পরবর্তী কথার অর্থ হচ্ছে, কুরআনই তাদের জন্যে যথেষ্ট, এরপর রাসূল (সা.)-এর বক্তব্যের কোন প্রয়োজন নেই । কিন্তু রাসূল (সা.) এর সাহাবীরা ভাল করেই জানতেন যে, পবিত্র কুরআনই মহানবী (সা.) এর অনুসরণকে সবার জন্যে ফরজ হিসেবে ঘোষণা করেছে । রাসূল (সা.)-এর বাণীকে আল্লাহর বাণীরই মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে । পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট দলিল অনুসারে আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.)-এর নির্দেশের মোকাবিলায় মানুষের ইচ্ছার কোন স্বাধীনতা বা অধিকার নেই ।
তৃতীয়ত : প্রথম খলিফার মৃত্যুর সময় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল । তখন প্রথম খলিফা তার পরবর্তী খলিফা হিসেবে দ্বিতীয় খলিফার নামে খেলাফতের ওসিয়ত (উইল) লিখে যান । তৃতীয় খলিফা ওসমান যখন প্রথম খলিফার নির্দেশে উক্ত ‘ওসিয়ত’ (উইল) লিখছিলেন, তখন প্রথম খলিফা সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু, তখন বার দ্বিতীয় খলিফা প্রথম খলিফার ব্যাপারে মোটেই প্রতিবাদ করেননি, যে প্রতিবাদটি তিনি আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর ব্যাপারে করেছিলেন।[আল কামিল ফিত তারীখ (ইবনে আসির), ২য় খণ্ড, ২৯২ নং পৃষ্ঠা । শারহু ইবনি আবিল হাদিদ, ১ম খণ্ড, ৪৫ নং পৃষ্ঠা]
এ ছাড়া হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণিত হাদীসে[শারহু ইবনি আবিল হাদিদ, ১ম খণ্ড, ১৩৪ নং পৃষ্ঠা ।] দ্বিতীয় খলিফার যে স্বীকারোক্তি উল্লিখিত হয়েছে, তাতে তিনি বলেছেনঃ আমি বুঝতে পরে ছিলাম যে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) আলীর খেলাফতের বিষয়টি লিখে দিতে চেয়েছিলেন । কিন্তু বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে তা আমি হতে দেইনি । তিনি আরও বলেন যে ‘আলীই ছিল খেলাফতের অধিকারী ।[তারিখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড, ১৩৭ নং পৃষ্ঠা] কিন্তু সে যদি খেলাফতের আসনে বসত, তাহলে জনগণকে সত্যপথে চলার জন্যে উদ্বুদ্ধ করত । কিন্তু কুরাইশরা তার আনুগত্য করত না । তাই আমি তাকে খেলাফতের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছি’ !!!
ইসলামের নীতি অনুযায়ী সত্য প্রত্যাখানকারীদের জন্যে সত্যবাদীদেরক পরিত্যাগ না করে বরং সত্য প্রত্যাখানকারীদেরকে সত্য গ্রহণে বাধ্য করা উচিত। যখন প্রথম খলিফার কাছে সংবাদ পৌছলো যে মুসলমানদের একটি গোত্র যাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, তৎক্ষণাত তিনি তাদের সাথে যুদ্ধের নির্দেশ দিলেন এবং বললেন : আল্লাহ রাসূল (সাঃ) কে মাথার রূমাল বাধার যে দড়ি দেয়া হত, তা যদি আমাকে না দেয়া হয়, তাহলেও তাদের সাথে আমি যুদ্ধে অবতির্ণ হব।[আল বিদায়াহ্ ওয়ান্ নিহায়াহ্, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩১১ নং পৃষ্ঠা] অবশ্য এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে কোন মূল্যের বিনিময়েই হোক না কেন, সত্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। অথচ, সত্য ভিত্তিক খেলাফতের বিষয়টি মাথার রূমাল বাধার দড়ির চেয়ে অবশ্যই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ছিল।
মূল: আল্লামা মুহাম্মদ হুসাইন তাবাতাবাঈ
সম্পাদনা ও সঙ্কলন: এম এফ বারী। তথ্য সুত্রঃ  ফেসবুক থেকে নেওয়া।
শেয়ার করুন: