নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করাতে ২য় বারের মত অপহৃত হলেন কাশিনাথপুরের এক কলেজ শিক্ষক!
নিজস্ব প্রতিনিধি : পাবনার বেড়া উপজেলার কাশিনাথপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজে উপাধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষায় একজন প্রার্থী অপহৃত হয়েছেন জানার পর কলেজ অধ্যক্ষ বুধবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ২য় বারের মত নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করেছেন। প্রায় দু’বছর আগেও এই পদের পরীক্ষায় একই প্রার্থী মজিবুর রহমান রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ ছিলেন। তখনও তার অনুপস্থিতির কারণে কলেজের নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হয়েছিল। মজিবুর রহমান এই কলেজেরই অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তার এমন অপকর্মের জন্য বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানিয়েছেন হয়রানির শিকার অন্যান্য পরীক্ষার্থী ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগী মহল।
জানা গেছে, কাশিনাথপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজে উপাধ্যক্ষ পদে বুধবার সকাল ১০টায় নিয়োগ পরীক্ষা এ কলেজেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি ড. আমিনউদ্দিন মৃধা স্বচ্ছ পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীকে উপাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ করার ঘোষণা দেন।
কলেজের অধ্যক্ষ রোকসানা খানম জানান, ‘সহকারী অধ্যাপক ও উপাধ্যক্ষ প্রার্থী মজিবর রহমান এর পরিবারের লোকজন সকালে কলেজ অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করে জানান, মজিবুর রহমানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাকে অপহরণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ না করতে কে বা কারা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন করেছিল।’
কলেজের অধ্যক্ষ আরও জানান, ‘ওই প্রার্থীর পরিবারের দেয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তিনিসহ নিয়োগ পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টরা পরীক্ষা স্থগিত করার নির্দেশ দেন।’ এসময় মাউশি ডিজির প্রতিনিধি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিদের এবং উপস্থিত অন্যান্য প্রার্থীদের অধ্যক্ষ বিদায় করে দেন।
কলেজের একটি সূত্র জানান, অপহরণের বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে কলেজের শিক্ষকসহ অনেকেই অধ্যাপক মজিবর রহমানের খোঁজ নেয়া শুরু করেন। দুপুর ১ টার দিকে স্থানীয় লোকজন কাশিনাথপুর বাজারে তাকে দেখে কলেজে খবর দেন। অবস্থা বেগতিক দেখে স্থানীয়দের চাপের মুখে মজিবুর রহমান কলেজে উপস্থিত হন। এ সময় কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতিসহ অন্যান্য সদস্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। সে সময় তিনি অপহরণের বিষয়টি অস্বীকার করে জানান, পরীক্ষায় তার প্রস্তুতি ভাল ছিল না; তাই তিনি পরীক্ষা দিতে আসেননি। তার পরিবারের দেয়া অপহরণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, পরিবারের কাউকেই আমি কলেজে পাঠাইনি। তার অসংলগ্ন কথাবার্তায় অপহরণ নাটকের ঘটনা উপস্থিত শত শত মানুষের মধ্যে প্রকাশ পেয়ে যায়।
মজিবর রহমানকে অপহরণ করা হয়েছিল- এটা তিনি নিশ্চিত কিনা এ প্রশ্নে কলেজের অধ্যক্ষ জানান, ‘তার কথাবার্তা ও ভীতি দেখে অপহরণ বলেই মনে হয়েছে। কলেজের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে জানার পরই তাকে অপহরনকারীরা ছেড়ে দেয়।’ এ ব্যাপারে থানায় কোন অভিযোগ করা হয়েছে কিনা- এ প্রশ্নে অধ্যক্ষ জানান, ‘তিনি কোন লিখিত অভিযোগ দেননি, তবে আমিনপুর থানার ওসিকে তিনি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন।’
আমিনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রওশন আলী জানান, ‘থানায় এ ব্যাপারে কোন অভিযোগ দায়ের করা হয়নি।’
শাহনাজ পারভীন নামের এক প্রার্থী জানান, ‘৩ জন পরীক্ষার্থী উপস্থিত হলেই পরীক্ষাগ্রহণ করা বৈধ। সেখানে আমরা ৫ জন প্রার্থী উপস্থিত হওয়ার পরেও কেন নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করা হলো- তা আমাদের বোধগম্য নয়। কোনো অশুভ শক্তির কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে।’
আব্দুল আলীম নামের আরেক প্রার্থী জানান, ‘ইতিপূর্বেও একবার উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পরীক্ষার দিন ধার্য হয়েছিল। সেদিনও অভিযুক্ত প্রার্থী মজিবুর রহমান ফোন বন্ধ রেখে অনুপস্থিত ছিলেন। তখনও নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এধরণের ঘটনা দু:খজনক।’
এদিকে কথিত অপহৃত সহকারী অধ্যাপক মজিবর রহমাননের মোবাইল ফোনে অনেকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।
কলেজের সহকারী অধ্যাপককে অপহরণ করার কারণে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও থানায় অভিযোগ না দেয়ার ব্যাপারে কলেজের অধ্যক্ষ রোকসানা খানম কে জিজ্ঞেস করা হলে জানান, ‘এটি ওই শিক্ষকের পরিবারের ব্যাপার।’ তাহলে কিসের ভিত্তিতে অপহরণ এর কথা বলে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হলো? এ প্রশ্নে অধ্যক্ষ জানান, ‘তার পরিবারের লোকজনের কথায় তাদের বিষয়টি অপহরণ বলে মনে হয়েছিল।’
এদিকে এই শিক্ষক দুই বছর আগেও অনুপস্থিত ছিলেন। তখনও নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল। এভাবে কি নিয়োগ স্থগিত হতেই থাকবে? এ প্রশ্নে অধ্যক্ষ জানান, ‘পরিস্থিতি ভাল না হলে তো পরীক্ষা নেয়া যাবে না।’
স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষানুরাগী জানান, ‘কলেজ গভর্নিং বডির সভাপতি নীতি নৈতিকতায় অপোষহীন। তাই কারো কারো কারো স্বার্থ রক্ষায় অপহরণ নাটক সাজিয়ে পরীক্ষা বিলম্বিত করা হয়েছে। এর বড় প্রমাণ ওই কলেজ শিক্ষক থানায় অভিযোগ দায়ের করেননি।’
তারা প্রশাসনের প্রতি বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। তারা জানান, ‘এ কৌশলের সাথে কলেজের ক্ষমতাধর কেউ জড়িত আছেন। মজিবর রহমানসহ কয়েকজনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) যাচাই করলেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।’ তারা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বাধাগ্রস্থ করছেন। এজন্য দায়িদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তারা।
