আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪ বছর

আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪ বছর
শেয়ার করুন:

আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪ বছর “
” নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন বিপ্লবী চে গুয়েভারা “
নারায়ণগঞ্জে এসেছিলেন বিপ্লবী চে গুয়েভারা

ভোরের সাইরেন বাজলে শীতলক্ষ্যার দুই পাড় জেগে উঠত। সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীনগরের সরু গলি ধরে হাজার হাজার মানুষ হাঁটত একটাই গন্তব্যে, যেখানে তাঁতকলের একটানা গর্জন ছিল শহরের নিজস্ব হৃৎস্পন্দন। ২০০২ সালের ৩০ জুন সেই হৃৎস্পন্দন চিরতরে থেমে যায়। সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল আদমজীর হৃৎস্পন্দন; দেখতে দেখতে ঐতিহ্যবাহী এই পাটকলের দরজা বন্ধ হওয়ার ২৪টি বছর অতিক্রান্ত হলো।
যে মিলকে একসময় বলা হতো পৃথিবীর বৃহত্তম পাটকল, তার জমিতে আজ দাঁড়িয়ে আছে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)।
১. সোনালি আঁশের জনপদ: নারায়ণগঞ্জে পাটের কথকতা
নারায়ণগঞ্জের পরিচয় গড়ে উঠেছিল মূলত জলপথ ও নদীকে ঘিরে। শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীর বহু শতক ধরে ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সতেরো ও আঠারো শতকে পর্তুগিজ ও ইংরেজ ব্যবসায়ীদের আগমনের পর এই বন্দর-জনপদের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। তবে উনিশ শতকের শুরু পর্যন্ত এটি খুব ব্যস্ত এলাকা ছিল না।
এই জনপদের বদলে যাওয়ার মূল চালিকাশক্তি ছিল পাট। ইতিহাস-সংকলন সূত্র বলছে, ১৮৩০ সালে ‘র‍্যালি ব্রাদার্স’ নামের একটি বিদেশি কোম্পানি নারায়ণগঞ্জে প্রথম পাটের ব্যবসা শুরু করে। তারা আসামের বেশ কিছু কোম্পানিকেও এই বন্দর দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে পাট পাঠাতে সহায়তা করত। তখনো পাটের কোনো নিয়মিত বাজার ছিল না; ব্যাপারীরা নৌকায় করে বিক্রেতার গুদাম থেকে পাট আনতেন, দরদামের পর ওজন হতো এবং নমুনা যাচাই করে দাম নির্ধারণ হতো।
শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে ফতুল্লা, বন্দর, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের পলিমাটিতে তখন সবুজ হয়ে উঠত পাটের খেত। আষাঢ়-শ্রাবণে কাটা পাট জাক দেওয়া হতো খালে-বিলে, তারপর আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানোর দৃশ্য ছিল এখানকার নিত্যদিনের রূপ।
২. ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ উপাধির পেছনের ইতিহাস
স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহর ছিল পাট ও লিনেন শিল্পের বিশ্বখ্যাত কেন্দ্র। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, নেপোলিয়নের যুদ্ধের সময় রাশিয়া থেকে শন-জাতীয় আঁশের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পাটের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নারায়ণগঞ্জের চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থান ও উৎকৃষ্ট কাঁচাপাটের সুবাদে শহরটি দ্রুত বিশ্ব বাণিজ্য মানচিত্রে জায়গা করে নেয় এবং উপাধি পায় ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ (উঁহফবব ড়ভ ঃযব ঊধংঃ)। কিন্তু বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, কলকাতায় প্রচুর পাটকল থাকলেও এবং স্কটল্যান্ডের ডান্ডিতে কল চললেও কাঁচাপাটের সিংহভাগই সরবরাহ হতো পূর্ব বাংলা তথা নারায়ণগঞ্জ থেকে।
৩. কীভাবে গড়ে উঠল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ পাটকল
১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই অঞ্চলের ইন্ডাস্ট্রিয়াল চিত্রে এক বিশাল পরিবর্তন আনে। দেশভাগের সময় বাংলায় ১০৮টি পাটকলের সবগুলোই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে পড়েছিল, অথচ কাঁচাপাটের মূল উৎপাদনক্ষেত্র ছিল তদানীন্তন পূর্ব বাংলা। এই বৈষম্য কাটাতে তৎকালীন সরকার মুসলিম শিল্পোদ্যোক্তাদের পাটকল স্থাপনে আহ্বান জানায়।
আদমজী পরিবারের পরিকল্পনা ও নির্মাণ
১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে কলকাতাভিত্তিক শিল্পপতি আদমজী ব্রাদার্স—তিন ভাই ওয়াহেদ আদমজী, জাকারিয়া আদমজী ও গুল মোহাম্মদ আদমজী—একটি বিনিয়োগ-প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসেন। পরিকল্পনানুসারে মূলধনের অর্ধেক জোগায় আদমজী পরিবার এবং বাকি অংশ দেয় সরকারি শিল্প-উন্নয়ন সংস্থা পিআইডিসি (চওউঈ)।
ক্স স্থান নির্বাচন: নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার উত্তরে সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়া/সোনাচর এলাকাকে বেছে নেওয়া হয়। প্রধান কারণ ছিল নদী, সড়ক ও রেলপথ—তিন ধরনের যোগাযোগের চমৎকার সুবিধা।
ক্স জমির পরিমাণ: মিলটির জন্য ২৯৪ থেকে ২৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয় (বাংলাপিডিয়ার প্রারম্ভিক সূত্রে ২২৭ একর বলা হলেও মোট এলাকা পরবর্তীতে প্রায় ২৯৫ একরে রূপ নেয়)।
ক্স উৎপাদন সূচনা: ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রায় ৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে ১,৭০০ হেসিয়ান ও ১,০০০ বস্তা-বোনা তাঁত নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে মূলধন ৭ কোটি টাকায় উন্নীত করে তাঁতের সংখ্যা ৩৩০০-এ নেওয়া হয়। ১৯৫৫ সালের জুনের মধ্যে মিলে ৩,০০০ লুম ও ৩১,২০০ টাকু প্রস্তুত ছিল।
উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আদমজী জুট মিলস তৎকালীন বিশ্বের শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসে। মিলটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৮৮ টন চট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদিত হতো, যা বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনত। এখানে তৈরি চট, বস্তা ও কার্পেট ব্যাকিং ক্লথ চীন, ভারত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতার সময়ে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে নিবন্ধিত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিক মিলিয়ে এতে ২৫,০০০ থেকে ৩৫,০০০ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছিল।
মিলের ওপর ভিত্তি করে শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে বাজার, স্কুল, কোয়ার্টার, মসজিদ-মন্দির ও হাসপাতালসহ আস্ত এক জীবন্ত শহর গড়ে উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর এটিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি গণ্য করে ১৯৭২ সালে (মতান্তওে ১৯৭৪ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশে) বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে জাতীয়করণ করা হয়।
৪. আদমজীতে বিশ্বনেতা ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের পদচারণা
বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল হওয়ায় দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের ঢাকা সফরে আদমজী পরিদর্শন ছিল এক অনন্য আকর্ষণ।
রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ (১৯৬১)
পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ঢাকা সফরে আসলে তাঁর অন্যতম প্রধান আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল আদমজী জুট মিল। বুড়িগঙ্গায় নৌবিহার শেষে শীতলক্ষ্যার তীরের এই ঐতিহ্যবাহী কারখানায় গিয়ে তিনি স্বচক্ষে দেখেন কীভাবে কাঁচাপাট থেকে চট ও থলে তৈরি হয়। স্কটল্যান্ডের ডান্ডির দেশের রানীর ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’তে এই আগমন ছিল শিল্প ইতিহাসের এক প্রতীকী ঘটনা।
বিপ্লবী চে গুয়েভারা (১৯৫৯)
আদমজীর ইতিহাসে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ঘটনাটি হলো কিউবার বিপ্লবী নেতা আর্নেস্তো ‘চে’ গুয়েভারার সফর। ১৯৫৯ সালে কিউবান বিপ্লবের পর ফিদেল কাস্ত্রো তাঁকে ৩ মাসের এক এশীয়-আফ্রিকীয় কূটনৈতিক সফরে পাঠান। চের স্ত্রী অ্যালেইদা মার্চের স্মৃতিচারণ ও নথিপত্র অনুযায়ী, সেই সফরে তিনি পূর্ব পাকিস্তানও পরিদর্শন করেন [পরঃব:ঁংবৎথগবেষণা ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৫৯ সালের জুলাই মাসে সাদা প্রাইভেট কারে করে চে গুয়েভারা ৩ নম্বর মিলের জেনারেল ম্যানেজার ও শ্রমিক নেতাদের সাথে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন। শ্রমিক নেতা ছায়দুল হক ছাদু দীর্ঘদিন পর চের ছবি দেখে নিশ্চিত হন যে সেদিন আসা সেই নিরহংকারী ব্যক্তিটিই ছিলেন কিউবার মহান বিপ্লবী ‘চে’।
এছাড়াও চিনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই সহ বহু দেশের প্রখ্যাত কূটনীতিকেরা এই শিল্প বিস্ময় দেখতে আদমজীতে এসেছিলেন।
৫. আদমজী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে আসল ইতিহাস
যে কারখানা একসময় বছওে ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আনত, তা কীভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকে বন্ধ হয়ে গেল? ইতিহাসে এর পেছনে বেশ কয়েকটি যৌক্তিক কারণ উঠে আসে:
ক্স দীর্ঘ লোকসান ও অব্যবস্থাপনা: ১৯৭২ সালে জাতীয়করণের পর পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভাব, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত অদক্ষ লোকবল নিয়োগে মিলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৮০-র দশকের পর প্রায় প্রতিটি বছরই মিলটি শত কোটি টাকার লোকসান গুনতে থাকে।
ক্স কৃত্রিম আঁশ ও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন: সত্তরের দশক থেকে বিশ্ববাজারে পলিথিন ও প্লাস্টিকের সস্তা ব্যবহার পাটের আন্তর্জাতিক বাজারে ধস নামায়। পাশাপাশি ভারতের পাটশিল্পের আগ্রাসী বিস্তার বাজার ছোট করে দেয়।
ক্স উগ্র সিবিএ ও রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক সংঘর্ষ: কারখানার ভেতরে দলীয়করণের আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র সংঘাত কাজের পরিবেশ বিনষ্ট করে। ১৯৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের সময় ট্রেড ইউনিয়ন নেতা তাজুল ইসলাম মিলের ভেতরেই সশস্ত্র হামলায় নিহত হন, যা শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক কালিমালিপ্ত দিন।
ক্স বিশ্বব্যাংকের চাপ ও সরকারি সিদ্ধান্ত: ক্রমাগত লোকসানে থাকা কারখানাটি বন্ধে বিশ্বব্যাংকের সংস্কার প্রস্তাবনা ও চাপ বড় ভূমিকা পালন করে। তৎকালীন সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মিলটির পুঞ্জীভূত লোকসান প্রায় ১,২০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল।
৬. ২০০২ সালের ৩০ জুন: চিরতরে বন্ধের দিন
২০০২ সালের ৩০ জুন তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আদমজী বন্ধ ঘোষণা করে। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে কর্মকর্তা-শ্রমিকদের বিদায় দেওয়া হয়। সেদিন কান্নার রোলে ভারী হয়ে উঠেছিল সিদ্ধিরগঞ্জের বাতাস।
আদমজী জুট মিল বন্ধের ২৪ বছর: পাটকল থেকে ইপিজেড
২০২৬ সালের ৩০ জুন এসে মিল বন্ধের ২৪ বছর পূর্ণ হয়। এই ২৪ বছরে আদমজীর জমিতে এক নতুন অর্থনৈতিক দিগন্তের উন্মোচন ঘটেছে।
২০০৬ সালের ৬ মার্চ বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলের জমিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তি স্থাপন করা হয় ‘আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল’ (অফধসলবব ঊচত)-এর। প্রায় ২৯২.৬২ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই ইপিজেড আজ এক অর্থনৈতিক বিস্ময়।
পরিসংখ্যানের আয়নায়: পাটকল ও বর্তমান ইপিজেড
শিল্পের ধরন ও কাঠামোর দিক থেকে দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিশাল ব্যবধান দেখা যায়। তৎকালীন আদমজী জুট মিল মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একক পাট ও পাটজাত শিল্প হিসেবে পরিচালিত হতো, যেখানে কৃত্রিম তন্তুর উত্থানের মুখে ১,২০০ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে প্রায় ২৪,৯১৬ থেকে ৩৫,০০০ শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারান।
অন্যদিকে, বর্তমানে ২৯২.৬২ একরের ওপর অবস্থিত আদমজী ইপিজেড একটি বহুমাত্রিক বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক রপ্তানিমুখী হাবে পরিণত হয়েছে। এখানে যুক্তরাজ্য, জাপান, চীন, জার্মানি ও স্পেনের মতো ১৭টিরও বেশি দেশের বিনিয়োগে ৫০টির বেশি সক্রিয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে পোশাক, জুতা, অটোমোবাইল সিট ট্রিম ও কেমিক্যালসহ নানাবিধ পণ্য প্রস্তুত হয়। প্রায় ৮৪০.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ এবং ১০,৯৩৪.৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম সেরা সফল ইপিজেডে রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি, বর্তমানে এখানে ৭৫,৯৫৯ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যার মধ্যে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।
৭. স্মৃতির অ্যালবামে আদমজী
আদমজী জুট মিল নামের সাথে জড়িয়ে আছে বহু ত্যাগী ব্যক্তিত্ব¡, রাজনৈতিক নেতা এবং রক্তভেজা শ্রমিক আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক দলিল। আদমজীর উত্থান-পতন, সংগ্রাম এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে চিরতরে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের নাম:
ক্স তাজুল ইসলাম (শহীদ শ্রমিক নেতা): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে আরামদায়ক ক্যারিয়ারের চিন্তা বাদ দিয়ে যিনি ভিড়েছিলেন আদমজীর সাধারণ শিফট শ্রমিকের সারিতে। তিনি ছিলেন শ্রমিক কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং পাঁচ দফা দাবির অন্যতম সংগঠক। ১৯৮৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি আদমজীর ভেতরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও শ্রমিক ধর্মঘটের সময় সশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত হন এবং পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাহাদাত বরণ করেন। আদমজীর রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ইতিহাসে তাজুল ইসলাম এক অমর প্রতীক।
ক্স ছায়দুল হক ছাদু (শ্রমিক ইউনিয়নের প্রবীণ নেতা): সাধারণ শ্রমিক থেকে উঠে এসে পরবর্তীতে আদমজী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি হওয়া ছায়দুল হক ছাদু ছিলেন এই কারখানার ইতিহাসের এক জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। ১৯৫৯ সালে সাধারণ পোশাকে আসা অচেনা এক অতিথির সাথে আধা ঘণ্টার কথোপকথন এবং বহু বছর পর বইয়ের পাতায় তাকে বিশ্ববিপ্লবী ‘চে গুয়েভারা’ হিসেবে আবিষ্কার করার রোমাঞ্চকর স্মৃতিকথা তাঁর মাধ্যমেই উন্মোচিত হয়। আদমজীর প্রতিটি আন্দোলন ও শেষলগ্নের কান্নার সাক্ষী ছিলেন তিনি।
ক্স কাজী জহিরুল কাইয়ুম (শ্রমিক অধিকার সংগ্রামের এক নায়ক): দেশভাগের পর এবং পাকিস্তান আমলে আদমজীতে শ্রমিকের শোষণ ও মজুরি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী নেতৃবৃন্দ। কাজী জহিরুল কাইয়ুমের মতো নেতারা আদমজীর শ্রমিকদের সংগঠিত কওে ৬ দফা ও ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বিশাল ভূমিকা পালন করান, যা আদমজীকে কেবল কারখানায় নয়, রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রস্থলে পরিণত করে।
ক্স মুক্তিযুদ্ধে আদমজীর শহীদ শ্রমিকবৃন্দ: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আদমজী পাটকলের বাঙালি শ্রমিকদের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। কারখানার সীমানার ভেতরে ও বাইরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের বিহারি দোসরদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বীর বাঙালি শ্রমিকেরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। আদমজীর মিল প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশে পাকিস্তানি সেনারা পৈশাচিক ‘যমঘর’ ও টর্চার সেল তৈরি করে শত শত বাঙালি শ্রমিককে নৃশংসভাবে হত্যা করে। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ও নির্যাতনে শহীদ হন আবুল হাসেম, নূর মোহাম্মদ, আব্দুল আজিজ, সিরাজুল ইসলাম সহ বহু অকুতোভয় শ্রমিক। স্বাধীনতার পর তাঁদেও রক্তস্নাত এই আত্মত্যাগ আদমজীর ইতিহাসকে দিয়েছে বীরত্ব ও গৌরবের অমর মর্যাদা।
ক্স সাইফুল ইসলাম কালু ও বন্ধের সময়কার সংগ্রামী নেতৃত্ব: সাধারণ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন সোচ্চার থাকা সাইফুল ইসলাম কালু ছিলেন আদমজী সিবিএ ও শ্রমিক আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। ২০০২ সালে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত আসার পর যে ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছিল, সেখানে সাধারণ শ্রমিকদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াকু নেতৃত্ব দেন তিনি। রাজপথের মিছিল, গেট মিটিং, অবস্থান ধর্মঘট কিংবা শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের সুযোগ-সুবিধা আদায়ের দাবিতে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কালু। মিল বন্ধের পর শ্রমিকদের আবাসন ও বকেয়া আদায়ের দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক লড়াইয়েও সাইফুল ইসলাম কালু ও সহযোদ্ধা নেতৃবৃন্দের এই নামগুলো আদমজীর সাধারণ শ্রমিকদের হৃদয়ে আজও বেঁচে আছে।
শেষ কথা
আদমজী পাটকল আজ আর নেই। নেই সেই পাটের ধুলোমাখা গন্ধ, ধুঁকতে থাকা বিশাল সব লুমের শব্দ। সময়ের পরিক্রমায় পাটকলের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়েছে অত্যাধুনিক রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল। আদমজীর গল্পে নায়ক-খলনায়ক খোঁজা সহজ, কিন্তু ইতিহাস সেভাবে চলে না। উত্থান-পতনের এই গল্পে নানান অধ্যায়ে লেখা আছে শিল্পোদ্যোগের সাহস, জাতীয়করণের আশা আর অব্যবস্থাপনার ক্ষয়, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, রক্তপাত, কঠিন সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষের যুক্তি-তর্ক-লড়াই, শ্রমিকের চোখের জল আর রূপান্তরের কথা।
অর্থনৈতিক বিচারে ইপিজেড হয়তো লাভজনক ও সফল, কিন্তু বাঙালির স্মৃতিপট থেকে আদমজী পাটকলের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কখনো মুছে যাবে না। এটি চিরকাল রয়ে যাবে ‘সোনালী আঁশের’ সেই সোনালী যুগের এক চিরভাস্বর প্রতীক হয়ে। আর শেষে একটি প্রশ্ন আজও থেকে যায়, তা হলো পাট থেকে ইপিজেড যাত্রায় আমরা কী পেলাম, আর কী চিরতরে হারালাম, তা কি আমরা ঠিকঠাক হিসাব করেছি?

শেয়ার করুন: