ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধে চীন কেন এখন মধ্যস্থতা করতে চায়?

শেয়ার করুন:

ইউক্রেনের সংঘাতের অবসানের লক্ষ্যে চীন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে চাইছে এবং এজন্য কতগুলি নীতিমালা ঘোষণা করেছে।

এই নীতিমালায় দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা, দু’দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানো এবং হানাহানি বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে বেইজিং সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে চীন একদিকে মস্কোকে সমর্থন করছে এবং অন্যদিকে নিজেকে নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

ইউক্রেন থেকে রুশ সৈন্য প্রত্যাহারের দাবিতে এক প্রস্তাবের ওপর জাতিসংঘে বৃহস্পতিবার এক ভোটে চীন ভোটদানে বিরত ছিল।

গত এক বছরে পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চীনের সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা করেছে। বেইজিং সরকার এখন সে বিষয়ে এপর্যন্ত সবচেয়ে সবল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, যা অনেক পশ্চিমা দেশের পছন্দ নাও হতে পারে।

সাম্প্রতিক দিনগুলিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র ইউরোপ সফরের মধ্য দিয়ে চীন সবার মন জয় করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, অবশ্য যেটি শেষ হয়েছে মস্কোতে মি. ওয়াংকে ভ্লাদিমির পুতিনের উষ্ণ অভ্যর্থনায় মধ্য দিয়ে।

ইউক্রেন প্রশ্নে চীন মূলত একটি নয় বরং দুটি অবস্থানের কথা ঘোষণা করেছে – প্রথমটি, যুদ্ধের অবসানে চীনা সমাধানের প্রস্তাব, এবং অন্যটি, বিশ্ব-শান্তির লক্ষ্যে এক পরিকল্পনার রূপরেখা। এগুলি মূলত চীনা বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি, গত এক বছর ধরে চীনা নেতারা যা বলে আসছেন। এতে রয়েছে: (ইউক্রেনের জন্য) সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান এবং (রাশিয়ার) জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থ রক্ষা করে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের) একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা।

এসব বিষয় পশ্চিমা দেশগুলোকে হয়তো খুশি করবে না, কিন্তু তাদের খুশি করা কখনই চীনের প্রধান লক্ষ্য ছিল না।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের যা লক্ষ্য তা হচ্ছে প্রথমত, বিশ্বের শান্তিরক্ষক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করা। তারা আসলে কাকে দলে টানতে চাইছে সেটার সুস্পষ্ট ইংগিত রয়েছে তাদের একটি দলিলে যেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা – তথাকথিত গ্লোবাল সাউথের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থার একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে চীন বিশ্বের বাদবাকি সেইসব দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে যারা এখন নজর রাখছে পশ্চিমা দেশগুলো কীভাবে ইউক্রেন সংকট মোকাবেলা করে তার ওপর।

চীনের আরেকটি লক্ষ্য হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি সুস্পষ্ট বার্তা পাঠানো।

ব্রিটেনের নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটির চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের একজন বিশেষজ্ঞ ড. আলেকজান্ডার কোরোলেভ বলছেন, “এর মধ্যে বিরুদ্ধাচরণের স্পর্ধা দেখানোর একটি ব্যাপারে রয়েছে।” “এটি বার্তা দিচ্ছে: ‘আমাদের মধ্যে সম্পর্ক যদি খারাপ হয়, তাহলে আমরা অন্য কারও কাছে যেতে পারি। রাশিয়া একা নয়, যার মানে হল যখন যুদ্ধ হবে তখন আমরাও একা থাকব না … তাই ধমকা-ধমকি করে পার পাবেন না।'”

যে সময়ে এই বক্তব্য দেয়া হয়েছে তা থেকে ব্যাপারটা খোলাসা হয়েছে, বলছেন পর্যবেক্ষকরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে সম্পর্ক এখন সবচেয়ে তিক্ত। এটি আরও খারাপ হয়েছে সম্প্রতি স্পাই বেলুন ঘটনায়। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, চীন কেন ঠিক এই সময়টাতে ইউক্রেনের শান্তির জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।

“নেতৃত্ব দেখানোর জন্য যথেষ্ট সুযোগ চীনের ছিল,” বলছেন ড. কোরোলেভ, “লড়াইয়ের অবসান ঘটাতে ভূমিকা রাখার জন্য প্রথম দিকেই তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল … যদি সত্যি তাদের লক্ষ্য থাকতো বিশ্বনেতা হিসেবে ভাবমূর্তি গড়ে তোলা, তাহলে গত একটি বছর দেশটি দর্শকের ভূমিকায় থাকতো না।”

চীনের তৃতীয় একটি লক্ষ্য রয়েছে, এবং মি. ওয়াংয়ের ভ্রমণ-সূচি থেকে এটা বোঝা যায়।

ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং হাঙ্গেরি, যে দেশগুলোর নেতারা রাশিয়ার প্রতি কম কট্টরপন্থী বলে চীন বিশ্বাস করে, এসব দেশ সফর করে মি. ওয়াং হয়তো দেখতে চাইছেন যে ইউরোপের কিছু অংশকে চীনা বলয়ের দিকে প্রলুব্ধ করা যায় কিনা।

শেয়ার করুন: