যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ষড়যন্ত্রের নাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

শেয়ার করুন:

 

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের শুরু হয় এ বছর ২৯ জুলাই। শেষ হয় ৮ আগষ্ট। এগারো দিন ধরে চলা এই ছাত্র আন্দোলনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ছিল ৪ আগষ্ট শনিবার। বিবিসির সাংবাদিক কাদির কল্লোলের মতে এদিন বেশ কয়েকটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সকালসকাল শিক্ষার্থীদের কাছে খবর আসে, তাদের একজনকে জিগাতলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের পাশে নির্বাচনী অফিসে ধরে নিয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছে। তার কিছুক্ষণ পর আরো একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে, আওয়ামী লীগ অফিসের ভেতর একটি মেয়েকে ধরে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এসব গুজবের কোন সত্যতা মেলেনি। তবে শেষ পর্যন্ত এসব গুজবের উ‌ৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশের এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন শক্তি এই নীল নকশায় জড়িয়ে থাকার অনেকগুলো প্রমাণ মিলেছে।

৪ আগষ্ট দিনের মত রাতেও বেশ কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা রাজধানীর বুকে ঘটতে থাকে। ছাত্র মৃত্যু আর ধর্ষণের গুজব, নিরাপদ সড়কের দাবী সুকৌশলে সরকার বিরোধী আন্দোলনের দিকে ধাবিত করে নেওয়া আর ড.কামালের হঠাৎ উত্থানের মত তিনটি ঘটনার পেছনে সেইসব ঘটনার একটা শক্ত যোগাযোগ আছে বলে প্রমান পাওয়া যায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। ১৯৯১ সালে ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশে ফিরে আসেন এবং ক্ষুধামুক্ত, আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ও ব্রত নিয়ে ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’ নামের একটি বহুল বিতর্কিত এনজিওর কাজ শুরু করেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সুপারিশে, নিজেদের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক বলে পরিচয় দেওয়া একটি জাতীয় দৈনিকের মাধ্যমে তিন দশকের ভেতর তিনি নিজেকে তথাকথিত সুশীল সমাজের একজন সক্রিয় প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত করে তোলেন। গত ৪ আগষ্ট রাতে এই বদিউল আলমের মোহাম্মদপুরের বাড়ীতে খুব গোপনে কয়েকজন অতিথি আসেন। ওই বাড়ির নিচতলার বাসিন্দা ইশতিয়াক মাহমুদের বরাতে জানা যায়, অতিথিদের তালিকায় ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, তার স্ত্রী মানবাধিকার কর্মী হামিদা হোসেন, সুজন সভাপতি হাফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি স্বউদ্যেগে বিষয়টি স্থানীয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অবহিত করেন। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুর থানার ওসি জামাল উদ্দিন মীর বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এই এলাকায় এলে তা আমাদের জানানোর কথা। কিন্তু আমাদের কিছু জানানো হয়নি।” পরের দিন দেশের সব পত্রিকায় এটি প্রকাশ হয়ে পড়ে। প্রসঙ্গক্রমে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল বলেন, ‘নিছক দাওয়াতের অনুষ্ঠান ছিল’।

এর আগে গত ২০ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নটরডেম সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করে ড. কামাল হোসেনকে। নিউইয়র্কে অবস্থানকালে কয়েকজন সিনেটর এবং কংগ্রেসম্যানকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্রিফ করেন ড. কামাল হোসেন। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে নিজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। পরদিন ২১ মে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা দেন গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন। জানা গেছে, বিএনপির পলাতক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে গোপন বৈঠক করার জন্যই তড়িঘড়ি করে লন্ডন গিয়েছিলেনন ড. কামাল হোসেন।

২৬ জুন গাজীপুর সিটি নির্বাচনের আগের দিন মার্কিন দূতাবাসের দুই কর্মকর্তা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সংগে সাক্ষাৎ করেন। নির্বাচনের পরদিনও ঐ দুই কর্মকর্তা গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় বৈঠক করেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে। ২৭ জুন বুধবার মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা মতিঝিলে ড. কামাল হোসেনের ল’ চেম্বারে গিয়ে একান্ত বৈঠক করেন। একই দিনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট দেখা করেন, বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক ডা. বদরুজ্জোদা চৌধুরীর সঙ্গে। ২৯জুন শনিবার মার্কিন রাষ্ট্রদূত দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে বারিধারায় আমেরিকান ক্লাবে চা চক্রে মিলিত হন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত যাদের সঙ্গে সেই চা চক্র করেন তাদের মধ্যে ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. দেবপ্রিয় ভট্রাচার্য, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান প্রমুখ। ৩০জুন রোববার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্যরিষ্টার মঈনুল হোসেন।

জুলাই মাসের ০২ তারিখে ‘আমার দেশ’ সহ বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের খবর উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। সেখানে প্রকাশ্যেই বলা হয় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি সর্বদলীয় মোর্চা গঠনের উদ্যোগে সহযোগিতা করছে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস। আগামী নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে একটি উদারপন্থীদের নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলেছে দূতাবাসের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। মূলত: মার্কিন উদ্যোগের কারণেই চলতি মাসেই বিএনপির নেতৃত্বে সংলাপ শুরু হচ্ছে। এই সংলাপে বিএনপির সঙ্গে বসবে বিকল্পধারা, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি এবং গণফোরাম। বিএনপির একাধিক নেতা এই সংলাপের উদ্যোগের কথা স্বীকার করেছে। বিএনপির একজন নেতা জানিয়েছেন, সফল ভাবে সংলাপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আগামী আগস্ট মাসে একটি নতুন জোট আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই জোটই আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে বলে বিএনপির ঐ নেতা ইঙ্গিত করেছেন।

জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাসায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের সাথে বৈঠকে বসেন অলি আহমেদ, ড কামাল হোসেন, বি চৌধুরী এবং মীর্জা ফখরুল। বৈঠকে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক সিনিয়র নেতার বরাত দিয়ে জানা যায় তারেককে সরিয়ে বিএনপিতে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসার পরামর্শ দেন বার্নিকাট। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদ এর অভিযোগে তারেকের এক ধরণের নেতিবাচক ইমেজ থাকার কারণেই তিনি এই এই পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা যায়। পরবর্তী বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তারেকের পরিবর্তে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে বিএনপির নেতৃত্বে নিয়ে আসার ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে জানা যায়। অন্যদিকে জোট গঠনের মাধ্যমে সরকার বিরোধী আন্দোলনের জন্য পরামর্শ দেন। তবে এই জোটের নেতৃত্বে কে থাকবে, সেটি পরিস্কার না করায় কিছুদিন বি.চৌধুরী আর ড.কামালের ভেতর দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এবারও এগিয়ে আসেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট ও ড.ইউনূস। তাদের পরামর্শে ড.কামালকেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নির্বাচিত করা হয়।

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী দৈনিক ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটসহ যেসব প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক গণতন্ত্রের র‍্যাংকিং প্রকাশ করে তাদের মতে ২০১৬ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র আর পূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়। এটি ‘পূর্ণ গণতন্ত্র’ থেকে ‘ ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ শ্রেণিতে নেমে গেছে। ২০১৭-এর সূচকে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের দেশগুলোর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়ারও নিচে নেমে গেছে।

কানাডা ভিত্তিক গবেষণা সংস্থা Centre for Research on Globalization (Global Research) এর গবেষক James A. Lucas তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ৩৭টি রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২০ মিলিয়ন তথা ২ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ‘আঙ্কটাড’ এর হিসাব অনুযায়ী অন্যায্য বৈশ্বিক বাণিজ্যের কারণে দরিদ্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রসহ ধনী দেশগুলো হতে যে সাহায্য পায় তার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি (প্রতিদিন ১.৩ বিলিয়ন পাউন্ড) তাদেরকে নানাভাবে পরিশোধ করে থাকে। লন্ডন ভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুযায়ী দরিদ্র রাষ্ট্রসমূহ প্রতিবছর ৫০-৫৫ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য প্রাপ্তির বিপরীতে ২০০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ ঋণ পরিশোধ ও শোষণমূলক বাণিজ্য, বাণিজ্য উদারীকরণ, ধনী রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে শিল্পের কাঁচামাল বিক্রিতে বাধ্য হওয়া, শর্তযুক্ত ঋণ গ্রহণ ইত্যাদির কারণে পরিশোধ করে থাকে।

যার নিজেরই ত্রুটিমুক্ত গণতন্ত্র নাই সে রাষ্ট্র কীভাবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র রফতানি করবে?

শেয়ার করুন: