
“আমার চোখের সামনে আমার স্বামী-সন্তান পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। যারা পেট্রোল বোমা মারছেন তাদের কাছে ১৬ কোটি সাধারণ জনগণের হয়ে মাফ চাচ্ছি। জনগণ কী অন্যায় করেছে? জনগণকে কেন পুড়িয়ে মারছেন? এভাবে মানুষ পুড়িয়ে মানুষের কল্যাণ করতে পারবেন না।” এ কথাগুলো অবরোধের সময়ে আগুনে পুড়ে নিহত যশোরের জাসদ নেতা নুরুজ্জামান পাপলুর স্ত্রী মাফরুহা বেগমের। স্বামী নুরুজ্জামানের কথা বলতে গিয়ে আরেক দফা কান্নায় ভেঙে পড়েন মাফরুহা। স্বামীর মৃত্যুতে বৃদ্ধ মা-বাবাসহ পরিবারের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, “তার ধর্মপ্রাণ স্বামী পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন। কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তার বুক পকেটে থাকা তসবিহটি অক্ষত রয়েছে”। তিনি আরও বলেন, “সাধারণ মানুষের কী অপরাধ? কেন এভাবে তাদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে? কী অধিকার আছে তাদের, সাধারণ মানুষকে হত্যা করার? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ, যারা পুড়িয়ে মানুষ মারছে, তাদের ধরুন, শাস্তি দিন”। স্বামী-মেয়েসহ হরতাল-অবরোধের আগুনে নিহত সবাইকে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা দেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীর কাঠেরপুলে বাসে পেট্রোল বোমা হামলায় বাদাম বিক্রেতা মোশারফ হোসেনের দুই হাত পুড়ে যায়। তার কথায় ফুটে ওঠে সেই আগুনের ভয়াবহতা। “আগুন যে এতো ভয়াবহ! আমরা কেন এর শিকার হব? আমরা তো সাধারণ মানুষ। আমাদের তো কাজ না পেলে চলবে না। আমাদের এই অবস্থা। এটা কেমন রাজনীতি? যারা করেছে, তারা সরকারের সাথে কমপিটিশন করুক। আমাদের সাধারণ মানুষের সাথে কেন?”
যাত্রাবাড়ীর ওই ঘটনায় মোশাররফ একাই পোড়েননি, পেট্রোল বোমায় মরেছে তার স্ত্রী-মেয়ে। ছেলেটাও পুড়েছে অবরোধকারীদের আগুনে। “আমার মা ও ছোট বোন মারা গেছে। বাবার দুই হাত গেছে। এখন কিভাবে চলবো?,” জিজ্ঞাসা ১৪ বছর বয়সী সুমনের।
রাজধানীর শ্যামলীতে গত ৭ ফেব্রুয়ারি হরতাল-অবরোধ সমর্থকদের ছোড়া হাতবোমায় মাথায় আঘাত পাওয়া ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট গোলাম মওলা তুলে ধরেন তার উপর হামলার ঘটনা। কোনো সংঘর্ষ বা বাদানুবাদ নয়, আকস্মিক এসে তার মাথা ও শরীরে একের পর বোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তের দল।
কাচের বোতলে পেট্রোল আর বোতলের মুখে আগুনের ফুলকি। ছুড়ে মারলেই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। সহজে নেভানো যায় না এ আগুন। পানির সাহায্যে তীব্রতা কমানো গেলেও আগুনের লেলিহান শিখায় ততক্ষণে পুড়ে যায় সবকিছু। আগুনে শুধু গাড়ি বা শরীরের বিভিন্ন অংশই পুড়ে যায় না, মাটিচাপা পড়ে যায় একটি জীবনের গল্প, পরিবার ও স্বজনের স্বপ্ন। পেট্রোল বোমা এক আতঙ্কের নাম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালের দিকে পেট্রোল বোমার ভয়াবহতা শুরু হয়। এ সময়কালে এমন একটি লিঙ্কের সন্ধান মেলে যারা পেট্রোল বোমা তৈরির ধারণা ও প্রস্তুত কৌশলের মদদদাতা। ‘তাজা খবর’ নামে একটি ফেসবুক কমিউনিটি পেজ এমনই একটি সাইট। যারা ২০১৩ সালের ৬ মে ‘পেট্রোল বোমা বানাবেন যেভাবে’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেয়। পেট্রোল বোমা নিক্ষেপকারী অঙ্কুর ও আকরাম পুলিশকে জানায়, পেট্রোল বোমার নেপথ্য শক্তির কথা। তারা জানায়, “‘তাজা খবর’ নামের সেই পেজ এবং রাজধানীতে পেট্রোল বোমার যাবতীয় ঘটনা শাহবাগ থানা ছাত্রদলের সভাপতি রুবেল তদারকি করে”। উল্লেখ্য যে, পেট্রোল বোমা হামলায় বিএনপির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়ে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০১৭ সালে কানাডার আদালত বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দায়ী করে রায় ঘোষণা করে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বিরোধিতা করে বিএনপি-জামায়াত সেসময় শত শত যানবাহন ভাংচুর করে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় তাদের পেট্রোল বোমা, হাতে বানানো বোমার আঘাতে এবং অন্যান্য সহিংসতায় ২০জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিন আবারও জ্বালাও-পোড়াও শুরু করে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চায় বিএনপি-জামায়াত জোট। ওই সময় ২৩১ জনকে হত্যা করে তারা। যাদের বেশিরভাগই পেট্রোল বোমা এবং আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায়। ওই ঘটনায় আহত হয় আরো ১ হাজার ১শ’ ৮০ জন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এমন বেদনাদায়ক দৃশ্যের অবতারণা করেছে বিএনপি, জামায়াত এর ক্যাডাররা
বিএনপি-জামায়াতের সেই সহিংসতায় ফলে দেশে প্রথমবারের মত একটি আন্তর্জাতিক মানের বার্ণ ইনস্টিটিউটের প্রয়োজন পড়ে। এর আগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেশের প্রথম বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটি ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে একশ’ আসনে উন্নীত করা হয়। কিন্তু ২০১৫ সালে বিএনপি-জামায়াত ঘোষিত ‘গৃহযুদ্ধে’ শতশত মানুষ নিহত-আহত হলে একটি পূর্ণাঙ্গ বার্ন হাসপাতালের প্রয়োজন পড়ে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৭ শে এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত উদ্যোগে রাজধানীর চাঁনখারপুলে ৯১২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় দুই একর জমিতে ১৮ তলাবিশিষ্ট শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট নির্মাণকাজ শুরু হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বিশ্বের কোথাও এত বড় বার্ন ইনস্টিটিউট নেই। এটি একাধারে পোড়া রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি গবেষণা ও অধ্যয়নের আদর্শ কেন্দ্র বলে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি পাবে”।
দেশের প্রথম বার্ন ইনস্টিটিউটের যাত্রা শুরু
আকাশছোঁয়া এ ভবনটি তিনটি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। একদিকে থাকবে বার্ন ইউনিট, অন্যদিকে প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট আর অন্য ব্লকটিতে করা হবে অ্যাকাডেমিক ভবন। দেশে প্রথমবারের মতো কোনো সরকারি হাসপাতালে হেলিপ্যাড সুবিধা রাখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোড়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য স্থাপিত এ প্রতিষ্ঠানটি দেশের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে নতুন এক দিগন্ত খুলে দেবে। রোগীদের পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হবে এটি।
