হজরত আবুবকর ও উমর কেন রাসুলের (সাঃ) কন্যাকে ‘ফদকের’ জমি থেকে বঞ্চিত করেছেন ?

হজরত আবুবকর ও উমর কেন রাসুলের (সাঃ) কন্যাকে 'ফদকের' জমি থেকে বঞ্চিত করেছেন ?
শেয়ার করুন:
হজরত আবুবকর ও উমর কেন রাসুলের (সাঃ) কন্যাকে ‘ফদকের’ জমি থেকে বঞ্চিত করেছেন ?
সুরা বনি ইস্রাইল, আয়াত- ২৭
“এবং পরামাত্নীয়,(১), অভাবগ্রস্থ এবং নিঃস্ব পথচারীদের তাঁদের প্রাপ্য প্রদান কর এবং কোন প্রকারেই অপচয় করো না”।
সঠিক তাফসীরঃ(১)
ইবনে জারীর হযরত আলী ইবনুল হুসাইন যায়নুল আবেদীন (আঃ) হতে বর্ননা করেছেন। তিনি এক শামদেশীয় লোককে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কো্রান পাঠ করেছ?’ সে বলল,’হ্যা’। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি সুরা বনী ইস্রাইলের ‘পরমাত্নীয়কে তাঁর প্রাপ্য দিয়ে দাও’ আয়াতটি পড়নি’?সে বলল, ‘অবশ্যই পড়েছি’। তিনি বললেন, “আমরা হলাম সেই পরমাত্নীয় যার প্রাপ্য প্রদানের আদেশ আল্লাহ দিয়েছেন”।
বাজ্জার, আবু ইয়ালা বিন আবী হাতিম এবং ইবনে মারদুইয়া আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ননা করেছেন, এই আয়াত নাযিল হলে রাসুল (সাঃ) হযরত ফাতিমাকে (আ)কে ডাকলেন এবং ফাদাকের ভুমি প্রদান করলেন। একই হাদিসে মারদুইয়া, ইবনে আব্বাস হতে বর্ননা করেছেন। (তাফসীরে দুররে মানসুর, ৪র্থ খন্ড, পাতা-১৭৬ দ্রষ্টব্য)।
একই হাদিস মিরাজুন নবুওত গ্রন্থেও বর্নিত হয়েছে।
ফদক, ১ম খলিফা আবুবকরের জাল হাদিস, ২য় খলিফা হযরত উমরের নিষ্ঠুর অবিচার।
ফদক মদিনার নিকটবর্তী হিজাজের (রাসুলের সাঃ দেয়া নাম) (বর্তমান সউদি আরব) একটা সবুজ গ্রাম এবং এটা শমরুখ নামক দুর্গ দ্বারা সংরক্ষিত স্থান ছিল (হামাবী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২৩৮; ৩য় খন্ড, পৃঃ ১০১৫; সামহুদী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ১২৮০)। ফদক ইহুদীদের দখলে ছিল। ৭ম হিজরীতে এক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে ফদকের মালিকানা রাসুলের (সাঃ) কাছে চলে যায়। এ চুক্তির মুল কারন হলো খায়বার দুর্গের পতনের পর ইহুদীরা মুসলিম শক্তি অনুধাবন করতে পেরেছিল এবং তাদের মনোবল ভেঙ্গে গিয়েছিল। তাছাড়া কিছু সংখ্যক ইহুদী রাসুলের (সাঃ) আশ্রয় প্রার্থনা করায় রাসুল (সাঃ) তাদের ছেড়ে দিয়েছেন। তারা একটা শান্তি প্রস্তাব করেছিল যে, ফদক নিয়ে তাদের অবশিষ্ট এলাকায় কোন যুদ্ব না করার জন্য। ফলে রাসুল (সাঃ) তাদের প্রস্তাব গ্রহন করলেন এবং তাদের জন্য সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করেছিলেন। এ ফদক তাঁর ব্যাক্তিগত সম্পদে পরিনত হলো এবং এতে কারো কোন স্বার্থ ছিল না। এতে কারো কোন স্বার্থ থাকতেও পারেন। কারন জিহাদে অর্জিত গনিমতের মালে মুসলমানদের অংশ ছিল। যেহেতু এই সম্পত্তি বিনা জিহাদে পাওয়া গেছে তাই এটাকে ‘ফায়’ বলা হতো এবং রাসুল (সাঃ) একাই এর মালিক ছিলেন।এতে অন্য কারো অংশ ছিল না। তাই আল্লাহ বলেনঃ “আল্লাহ ইহুদীদের কাছ থেকে তাঁর যে ফায় দিয়েছেন তার জন্য তোমরা অশ্ব বা উটে আরোহন করে যুদ্ব করনি।আল্লাহ যার উপর ইচ্ছা তাঁর রাসুলের কর্তৃ্ত্ব দান করেন” (কোরানঃ ৫৯ঃ৬)।
কোন প্রকার যুদ্ধ ছাড়াই ফদক অর্জিত হয়েছে এবিষয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। সুতরাং এটা রাসুলের (সাঃ) ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল এবং এতে কারো কোন অধিকার ছিল না। ঐতিহাসিকগন লিখেছেনঃ
যেহেতু মুসলিমগন তাদের ঘোড়া ও উট ব্যবহার করেননি সেহেতু ফদক রাসুলের (সাঃ) ব্যক্তিগর সম্পদ ছিল।
(তাবারী,১ম খন্ড, পৃঃ১৫৮২-১৫৮৩, আছীর, ২য় খন্ড,পৃঃ২২৪-২২৫; হিশাম, ৩য় খন্ড, পৃঃ৩৬৮; খালদুন, ২য় খন্ড, পৃঃ৪০; বাকরী,২য় খন্ড, পৃঃ৫৮; শাফী, ৩য় খন্ড, পৃঃ৫০; বালাজুরী, ১ম খন্ড, পৃঃ)।
২য় খলিফা হযরত উমর ইবনে খাত্তাবও মনে করতেন যে ফদক রাসুলের (সাঃ) অংশীদারবিহীন সম্পদ। তিনি ঘোষনা করেছিলেন যে, আল্লাহ তাঁর রাসুলকে যা দিয়েছিলেন বনি নজীরের সম্পত্তিও তার অন্তর্ভুক্ত । এতে কারো ঘোড়া বা উট ব্যবহার করা হয় নি। তাই এটা আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) ব্যক্তিগত সম্পদ।
(বুখারী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ৪৬; ৭ম খন্ড, পৃঃ৮২; ৯ম খন্ড, পৃঃ১২১-১২২; নায়সাবুরী, ৫ম খন্ড, পৃঃ১৫১; আশাছ, ৩য় খন্ড, পৃঃ১৩৯-১৪১; নাসাঈ, ৭ম খন্ড, পৃঃ১৩২; হাম্বল, ১ম খন্ড, পৃঃ২৫,৪৮,৬০,২০৮; শাফী, ৬ষ্ট খন্ড, পৃঃ২৯৬-২৯৯।)
বিশ্বস্ত সুত্রে এটা সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত যে, রাসুল (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশাতেই উক্ত ফদক তাঁর প্রানপ্রিয় কন্যা ফাতিমাকে দান করেছিলেন। আল-বাজ্জার, আবু ইয়ালা, ইবনে আবি হাতিম, ইবনে মারদুয়াই ও অন্যান্য অনেকে আবু সায়েদ খুদরী ও আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে বর্ননা করেছেন যে, যখন কোরানের আয়াত-“নিকটবর্তী আত্নীয় পরিজনকে তাদের প্রাপ্য দিয়ে দাও”-(১৭ঃ২৬)-নাজিল হয়েছিল তখন রাসুল (সাঃ) ফাতিমাকে ডেকে এনে তাঁকে ফদক দান করেছিলেন (শাফী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ১৭৭; শাফী, ৭ম খন্ড, পৃঃ৪৬; হিন্দি, ৩য় খন্ড, পৃঃ৪৯৩; শাফী, ১৫শ খন্ড, পৃঃ৬২)।
১ম খলিফা হযরত আবুবকর যখন ক্ষমতা দখল করেছিলেন তখন ফাতিমাকে বঞ্চিত ও দখলচ্যুত করে ফদক রাষ্টায়ত্ব করেছিলেন।
ঐতিহাসিকগন লিখেছেনঃ
“নিশ্চয়ই, আবুবকর ফাতিমার কাছ থেকে ফদক কেড়ে নিয়েছেন”
(হাদীদ, ১৬ খন্ড, পৃঃ২১৯; সামহুদী, ৩য় খন্ড,পৃঃ১০০০; হায়তামী, পৃঃ৩২)।
আবুবকরের এহেন কাজে ফাতিমা সোচ্চার হয়ে উঠলেন এবং তিনি প্রতিবাদ করে বললেন, “রাসুল (সাঃ) তাঁর জীবদ্দশায় আমাকে ফদক দান করে গিয়েছিলেন অথচ আপনি তা দখল করে নিয়ে নিয়েছেন।“ এতে আবুবকর সাক্ষী উপস্থাপন করার জন্য বললেন। ফলে, আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী ও উম্মে আয়মন ফাতিমার পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন । এখানে উল্লেখ্য যে, উম্মে আয়মন রাসুলের (সাঃ) একজন মুক্তিপ্রাপ্ত দাসী ছিলেন। তিনি উসামা ইবনে জায়েদ ইবনে আল-হারিছাহর মাতা ছিলেন। রাসুল (সাঃ) প্রায়ই বলতেন, “আমার মাতার ইন্তেকালের পর আয়মন আমার মাতা”। রাসুল (সাঃ) তাঁকে বেহেস্তবাসীর একজন বলে আখ্যায়িত করে ছিলেন। (নায়সাবুরী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ৬৩; তাবারী, ৩য় খন্ড, পৃঃ৩৪৬০; বার,৪র্থ খন্ড, পৃঃ১৭৯৩; আছির, ৫ম খন্ড, পৃঃ৫৬৭; সাদ, ৮ম খন্ড,পৃঃ১৯২; হাজর, ৪র্থ খন্ড,পৃঃ৪৩২)।
ফাতিমা আবুবকরকে বলেছিলেন, আল্লাহর রাসুল ফদক আলাদা করে আমাকে দিয়েছিলেন। সুতরাং আপনি আমাকে তা ফেরত দিন। এতে আবুবকর তাঁকে বললেন তিনি যেন উম্মে আয়মন ছাড়া আরো ১জন সাক্ষী হাজির করেন। আবুবকর আরো বললেন, হে রাসুলের কন্যা, আপনি জানেন যে, ২ জন পুরুষ বা ১ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা ছাড়া সাক্ষ্য গ্রহনীয় হয় না।
এসব ঘটনার পর একথা অস্বীকার করার উপায় থাকে না যে, ফদক রাসুলের (সাঃ) ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল এবং তাঁর জীবদ্দশায় তিনি এর দখল ফাতিমার হাতে তুলে দিয়ে তাঁকে তা দান করেছিলেন। কিন্তু আবুবকর তা বেদখল করে ফদক নিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি আলী ও উম্মে আয়মনের সাক্ষী বাতিল করেছিলেন। এ বাতিলের ক্ষেত্র হিসাবে তিনি উল্লেখ করলেন যে, ১জন পুরুষ ও ১জন মহিলার সাক্ষ্য পরিপুর্ন হয় না। এছাড়াও ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন ফাতিমার বক্তব্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু পিতামাতার পক্ষে সন্তানের সাক্ষ্য গ্রহনযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করে আবুবকর তা বাতিল করে দিয়েছিলেন। তারপর রাসুলের (সাঃ) গোলাম রাবাহকে সাক্ষী হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু তাকেও প্রত্যাখ্যান করা হলো।
(বালাজুরী, ১ম খন্ড, পৃঃ৩৫; ইয়াকুবী, ৩য় খন্ড, পৃঃ১৯৫; মাসুদী, ৩য় খন্ড, পৃঃ২৩৭; আশকারী, পৃঃ২০৯; সামহুদী, ৩য় খন্ড, পৃঃ৯৯৯-১০০১; হামাবি, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ২৩৯; হাদীদ, ১৬শ খন্ড, পৃঃ২১৬-২২০; হাজম, ৬ষ্ট খন্ড, পৃঃ৫০৭; শাফী, ৩য় খন্ড,পৃঃ ৩৬১; রাজী, ২৯তম খন্ড, পৃঃ২৮৪)।
এ পর্যায়ে একটা বিষয় বিবেচনার দাবী রাখে-তা হলো এটা ষ্পষ্ট হয়েছে যে, ফদক ফাতিমার দখলে ছিল এবং আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী তাঁর এক পত্রে উল্লেখ করেছেন, “ফদক আমাদের দখলে ছিল”। এ ক্ষেত্রে সাক্ষী উপস্থাপন করতে বলাটা কোন অর্থবহ নয়; এটা জুলুম করে অন্যের জমি দখল করার তালবাহানা মাত্র। কারন যার দখলে আছে তার সাক্ষী উপস্থাপন করার প্রয়োজন নেই- বরং যে দখলকারীকে উচ্ছেদ করতে চায় তার দাবীর জন্যই সাক্ষীর প্রয়োজন। কাজেই ফাতিমার সম্পত্তি দখল করার জন্য আবুবকরের সাক্ষী উপস্থাপন করা আইনসিদ্ধ ছিল। যেহেতু আবুবকর এমন কোন প্রমান উপস্থিত করতে পারেন নাই সেহেতু ফদকে ফাতিমার মালিকানাই আইনের চোখে সঠিক। কাজেই আরো সাক্ষী বা প্রমান হাজির করার জন্য তাকে বলাটা অন্যায় ছাড়া কিছু নয়।
এটা একটা অবাক করা বিষয় যে, আবুবকরের কাছে অনেকেই এরকম দাবী পেশ করেছিলেন। তিনি কোন সাক্ষী প্রমানের প্রশ্ন না তুলেই দাবিদারকে তাদের দাবীকৃত সম্পত্তি দিয়েছিলেন। অথচ ফাতিমার বেলায় তিনি এসব তালবাহানা করে তাঁদেরকে দুঃখ-কষ্ট ফেলেছিলেন। এবিষয়ে হাদিসবেত্তাগন লিখেছেনঃ
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী থেকে বর্নিত হয়েছে যে, আল্লাহর রাসুল বলেছেন যে, যখন বাহরাইন থেকে যুদ্বলব্ধ্ব মাল পৌঁছবে তখন জাবির অমুক অমুক জিনিসগুলো পাবে। কিন্তু রাসুলের ওফাতের আগে সেই মালগুলি এসে পৌঁছায় নি। আবুবকরের খেলাফতকালে তা মদীনায় পৌঁছালে জাবির আবুবকরের কাছে গিয়েছিল। তখন আবুবকর ঘোষনা করলেন যে, রাসুলের বিরুদ্বে যাদের কোন দাবি-দাওয়া আছে অথবা রাসুল যদি কাউকে কোন প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন সে যেন তার দাবী নিয়ে আসে। এতে জাবির বললো, রাসুল (সাঃ) আমাকে অমুক অমুক মালগুলো দেয়ার কথা বলেছিলেন।আবুবকর বাহরাইনের যুদ্বলব্ধ্ব মাল হতে জাবিরকে তা দিয়েছিলেন।
(বুখারী, ৩য় খন্ড, পৃঃ১১৯,২০৯,২৩৬;৪র্থ খন্ড, পৃঃ১১০;৫ম খন্ড, পৃঃ২১৮; নায়সাবুরী, ৩য় খন্ড, পৃঃ৭৫-৭৬; তিরমিজী, ৫ম খন্ড, পৃঃ১২৯; হাম্বল, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩০৭-৩০৮; সাদ, ২য় খন্ড, পৃঃ৮৮-৮৯)।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আসকালানী (হিঃ৭৭৩/১৩৭২-৮৫২/১৪৪৯) এবং হানাফী (৭৬২/১৩৬১-৮৮৫/১৪৫১) লিখেছেনঃ
এ হাদিস থেকে ষ্পষ্ট বুঝা যায় যে, শুধুমাত্র একজন সাহাবীর পুর্ন সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহন করা জায়েজ-এমনকি যদি সে সাক্ষ্য তার নিজের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যও হয়। কারন আবুবকর জাবিরকে তার দাবীর স্বপক্ষে কোন সাক্ষী হাজির করতে বলেননি। (আসকালানী, ৫ম খন্ড, পৃঃ৩৮০; হানাফী, ১২শ খন্ড, পৃঃ১২১)।
এখন প্রশ্ন হলো কোন সাক্ষ্য প্রমান ছাড়াই যখন জাবিরের দাবিকৃ্ত সম্পত্তি একইভাবে ফেরত দিতে কিসে আবুবকরকে বাধা দিয়েছিল? জাবিরের প্রতি তার যদি এমন ধারনা হয়ে থাকে যে, সে মিথ্যা বলে স্বীয় স্বার্থ উদ্বার করবে না; তবে ফাতিমার প্রতি তার এ ধারনা গ্রহনে কিসে তাকে বাধাগ্রস্ত করেছে যে, ফাতিমা এক টুকরা জমির জন্য রাসুল (সাঃ) সন্মন্ধে মিথ্যা বলতে পারে না। ফাতিমার সর্বজন স্বীকৃ্ত সত্যবাদীতা ও সততাই তো তাঁর দাবীর সত্যতা সম্পর্কে যথেষ্ট ছিল।তবু আবুবকরের সন্তুষ্টির জন্য তিনি আলী ও উম্মে আয়মনের মতো সম্মানিত সাক্ষী উপস্তিত করেছিলেন।একথা বলা হয়ে থাকে কোরানের নীচের আয়াতের নীতি অনুসারে ফাতিমার দাবী প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলঃ
২জন পুরুষ সাক্ষী রাখবে;২ জন পুরুষ সাক্ষী পাওয়া না গেলে ১জন পুরুষ ও ২জন নারী সাক্ষী রাখবে। (কোরানঃ ২ঃ২৮২)।
কোরানের উক্ত নীতি যদি সর্বক্ষেত্রে সার্বজনীন হয়ে থাকে তবে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এর প্রয়োগ থাকবে। কিন্তু একদিন একজন আরববাসী রাসুলের (সাঃ) সাথে একটি উট নিয়ে বিরোধ করে। এতে খুজায়মা ইবনে সাবিত আনসারী রাসুলের পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করলেন। এই একজনের সাক্ষীকে ২ জনের সাক্ষীর সাক্ষ্য হিসাবে গ্রহন করা হয়েছিল। কারন তার সততা ও সত্যবাদীতা সম্পর্কে কারো কোন সঙ্গশয় ছিল না। এ কারনেই রাসুল (সাঃ) তাকে “জুশ শাহাদাতাইন” (২জন সাক্ষীর সমান) উপাধীতে ভুষিত করেছিলেন (বুখারী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ২৪; ৬ষ্ট খন্ড, পৃঃ১৪৬; তায়ালিসী, ৩য় খন্ড, পৃঃ৩০২; হাম্বল ,৫ম খন্ড, পৃঃ১৮৮,১৮৯,২১৬; বার,২য় খন্ড,পৃঃ৪৪৮; আছীর, ২য় খন্ড, পৃঃ১১৪; সানানী, ৮ম খন্ড, পৃঃ৩৬৬-৩৬৮)।
ফলত এব্যাবস্থার কারনে আয়াতটির সাধারনত্ব প্রভাবিত হয় নি বা এটা সাক্ষ্য সংক্রান্ত বিধানের বিপরীত কিছু নয়। সুতরাং রাসুলের মতানুসারে সত্যবাদিতা গুনের জন্য একজন সাক্ষীকে ২জন সাক্ষীর সমান ধরে নেয়া হয়ে থাকে। তাহলে ফাতিমার পক্ষে আলী ও উম্মে আয়মনের সাক্ষ্য কি তাদের নৈ্তিক মহত্ব ও সত্যবাদীতার জন্য যথেষ্ট ছিল না? এছাড়া উক্ত আয়াতে এ দুপথ ছাড়া দাবী প্রতিষ্টা করার আর কোন পথ উল্লেখ করা হয় নি। এ বিষয়ে কাজী নুরুল্লা মারআশী (৯৫৬/১৫৪৯-১০১৯/১৬১০) লিখেছেনঃ
উম্মে আয়মনের সাক্ষ্য অসম্পুর্ন বলে যারা প্রত্যাখ্যান করেছে তারা প্রকৃতপক্ষে ভুল করেছে। কারন কোন কোন হাদিসে দেখা যায় ১জন সাক্ষীর ভিত্তিতে সিদ্বান্ত প্রদান করা বৈ্ধ এবং তাতে কোরানের নির্দেশ ভংগ হয়েছে বলে মনে করা হয় নি। কারন এ আয়াতের গুঢ়ার্থ হলো ২জন পুরুষ অথবা ১জন পুরুষ ও ২জন নারী সাক্ষীর ভিত্তিতে সিদ্বান্ত নেয়া যেতে পারে এবং তাদের সাক্ষ্যই যথেষ্ট। একথা দ্বারা এটা বুঝায় না যে, যদি সাক্ষীর সাক্ষ্য ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্র থেকে থাকে তা গ্রহনীয় হবে না এবং সে ভিত্তিতে রায় দেয়া যাবে না- এটাই হচ্ছে আয়াতটির মুল ভাব। কোন কিছুর ভাবার্থ চুড়ান্ত যুক্তি নয়। তাই এ ভাবার্থও গ্রাহ্য করা যায় না। বিশেষ করে হাদিসের বিপরীত ভাব ব্যাক্ত করেছে। এ ভাবার্থকে এড়িয়ে গেলে তা আয়াত অমান্য করা বুঝায় না।
দ্বিতীয়ত আয়াতটি দুটি বিষয়ের যে কোন একটিকে বেছে অনুমতি দেয়া হয়েছে। তা হলো ২ জন পুরুষ বা একজন পুরুষ ও ২ জন নারী। যদি হাদিস দ্বারা ৩য় একটি বিষয় বেছে নেয়ার জন্য যোগ করা হয় তাতে কি কোরানের আয়াত লংঘিত হয়েছে বলা যাবে? যাহোক এতে বুঝা যাচ্ছে যে, দাবীদার ২জন পুরুষ বা ১জন নারী ও ২জন নারী সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত করতে বাধ্য নয় কারন যদি কোন দাবীতে কোন সাক্ষী না থাকে তাহলে আল্লাহর নামে শপথ করে বললেই তার দাবী আইনসিদ্ধ হবে এবং তার অনুকুলে সিদ্বান্ত দেয়া যাবে। এতদ সংক্রান্ত বিষয়ে ১২ জনের অধিক সাহাবী বর্ননা করেছেন যে, আল্লাহর রাসুল শপথ গ্রহন পুর্বক ১জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সিদ্বান্ত গ্রহন করতেন।
রাসুলের (সাঃ) কতিপয় সাহাবা ও জুরিস্প্রুডেন্সের কতিপয় পন্ডিত ব্যক্তি বর্ননা করেছেন যে, এ সিদ্বান্ত বিশেষভাবে অধিকার, সম্পদ ও লেনদেনের সাথে সম্পৃক্ত এবং এ সিদ্বান্ত আবুবকর ,উমর ও উসমান খলিফাত্রয়ও মেনে চলতেন। (নায়সাবুরী, ৫ম খন্ড, পৃঃ১২৮; তায়ালিসী, ৩য় খন্ড, পৃঃ৩০৮-৩০৯; তিরমিজী, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৬২৭-৬২৯; মাযাহ, ২য় খন্ড, পৃঃ৭৯৩; হাম্বল, ১ম খন্ড, পৃঃ২৪৮, ৩১৫,৩২৩; ৩য় খন্ড, পৃঃ৩০৫; ৫ম খন্ড, পৃঃ২৮৫; আনাস, ২য় খন্ড, পৃঃ৭২১-৭২৫; শাফী, ১০ম খন্ড, পৃঃ১৬৭-১৭৬; কুন্তি, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ২১২ -২১৫; শাফী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ২০২; হিন্দি, ৭ম খন্ড, পৃঃ১৩)।
যেখানে শপথ করে সাক্ষ্য দিলে একজন সাক্ষীর ভিত্তিতে সিদ্বান্ত দেয়ার বিধান রয়েছে সেক্ষেত্রে যেহেতু আবু বকরের দৃষ্টিতে ফাতিমার সাক্ষী অসম্পুর্ন ছিল, সেহেতু তিনি ফাতিমার শপথ নিয়ে তাঁর অনুকুলে রায় দিতে পারতেন। কিন্তু এখানে মুল উদ্দেশ্য ছিল ফাতিমাকে বঞ্চিত করে আলী পরিবারকে অভাব-অনটনে নিপতিত করা এবং ফাতিমার সত্যবাদীতাকে কলঙ্কিত করা যাতে করে ভবিষতে তাঁর প্রশংসা চাপা পড়ে যায়।
যাহোক রাসুলের দানের ভিত্তিতে ফাতিমার দাবি এসব তালবাহানা করে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল তখন তিনি দাবী করলেন যে, রাসুলের উত্তরাধিকারিনী হিসাবে তিনিই ফদকের মালিক।
এ বিষয়ে ফাতিমা বলেছিলেনঃ
যদিও আপনি রাসুলের দানকে অস্বীকার করেছেন, কিন্তু ফদক ও খাইবারের রাজস্ব এবং মদিনার কাছে কিছু জমি যে রাসুলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি এ কথা অস্বীকার করতে পারবেন না। কাজেই আমিই রাসুলের একমাত্র উত্তরাধিকারী। কিন্তু আবুবকর নিজেই একটি হাদিস ব্যক্ত করে ফাতিমার উত্তরাধিকারীত্ব অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন রাসুল বলেছেন, “আমরা নবীগনের কোন উত্তরাধিকারী নেই; আমরা যা কিছু রেখে যাই তার সবই জাকাত হিসাবে বায়তুল মাল।”
(বুখারী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ৯৬; ৫ম খন্ড,পৃঃ ২৫, ২৬,১১৫,১১৭;৮ম খন্ড, পৃঃ১৮৫; নায়সাবুরি, ৫ম খন্ড, পৃঃ১৫৩-১৫৫; তিরমিজী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ১৫৭-১৫৮; তায়লিসী, ৩য় খন্ড, পৃঃ১৪২-১৪৩; নাসাঈ, ৭ম খন্ড, পৃঃ১৩২; হাম্বল, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ৪,৬,৯,১০; শাফী, ৬ষ্ট খন্ড,পৃঃ৩০০; সাদ,২য় খন্ড, পৃঃ৮৬-৮৭; তাবারী, ১ম খন্ড, পৃঃ১৮২৫; বাকরী, ২য় খন্ড, পৃঃ১৭৩-১৭৪)।
আবুবকর ছাড়া রাসুলের এহেন উক্তি কারো জানা ছিল না। এমনকি সাহাবীদের মধ্যে আর কেউ এমন কথা শুনেননি।
জালালুদ্দিন আবদার রহমান সয়ুতী (৮৪৯/১৪৪৫-৯১১/১৫০৫) এবং শিহাবুদ্দিন ইবনে হাজর হায়তামী (৯০৯/১৫০৪-৯৭৪/১৫৬৭) লিখেছেনঃ
রাসুলের (সাঃ) ইন্তেকালের পর তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। আবু বকর বলেছিলেন যে, রাসুল (সাঃ) নাকি তাকে বলেছিলেন, “আমরা অর্থাৎ নবীদের কোন উত্তরাধিকারী নেই এবং আমরা যা কিছু রেখে যাই সবই জাকাত হয়ে যায়”। এ বিষয়ে অন্য কেউ কোন কিছুই জ্ঞাত ছিলেন না। (সয়ুতী, পৃঃ৭৩; হায়তামী, পৃঃ১৯১)।
কোন বিচার বুদ্বিসম্পন্ন মানুষ একথা বিশ্বাস করতে পারে না যে, যারা রাসুলের ওয়ারিশ ছিলেন তাদের কাউকে কিছু না বলে ৩য় ব্যক্তির নিকট বলে গেছেন যে তাঁর কোন উত্তরাধিকারী নেই এবং সবচাইতে বিস্ময়কর হলো এ গুরুত্বপুর্ন বিষয়টি সম্মন্ধে সাহাবাগন অবহিত ছিলেন না। আর এটা তখনই প্রকাশ করা হলো যখন ফাতিমা ফদক ফেরত দেয়ার জন্য দাবী করলেন যা আর কারো জানা ছিল না। কিভাবে এ হাদিসটি গ্রহনীয় হতে পারে? যদি একথা বলা হয় যে, আবুবকরের মহৎ মর্যাদার কারনে এ -হাদিসটি নির্ভরযোগ্য তাহলে ফাতিমার সত্যবাদিতা, সততা ও মহৎ মর্যাদার কারনে কেন রাসুলের দান সংক্রান্ত তাঁর দাবী গ্রহন করা হলো না? তাছাড়া আমিরুল মু’মিনিন ও উম্মে আয়মনের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। যদি ফাতিমার দাবীর জন্য আরো সাক্ষীর প্রয়োজনীয়তা থেকে থাকে তা হলো এ হাদিসটি প্রমানের জন্য অবশ্যই সাক্ষীর দরকার রয়েছে। কারন এ হাদিসটি উত্তরাধীকার সংক্রান্ত কোরানের নির্দেশের পরিপন্থী। নবীদের উত্তরাধিকার সন্মন্ধে কোরানে বর্নিত হয়েছেঃ
“এবং সোলায়মান ছিল দাউদের উত্তরাধিকারী” (২৭ঃ১৬)। “সুতরাং তোমরা নিজের থেকে আমাকে একজন উত্তরাধিকারী দাও যে আমার উত্তরাধিকারী হবে এবং ইয়াকুবের পরিবারের উত্তরাধীকারী হবে-বললেন জাকারিয়া” (১৯ঃ৫-৬)।
উপরোক্ত আয়াতগুলোতে ভৌত সম্পদের উত্তরাধিকারীকেই বুঝানো হয়েছে।কেউ কেউ মনে করেন এমন আয়াত মানুষের নবুয়তের জ্ঞানের উত্তরাধিকারীকে বুঝানো হয়েছে। এটা একটা অসাড় যুক্তি এবং বাস্তব বিবর্জিত কথা। কারন নবীদের জ্ঞান উত্তরাধিকারের বস্তু হতে পারে না এবং এটা উত্তরাধিকারের মাধ্যমে হস্তান্তর যোগ্য নয়। এমনটি হলে সকল নবীর বংশধর নবী হতেন। সেক্ষেত্রে কোন কোন নবীর পুত্র নবী হয়েছিলেন এবং অন্যরা এটা থেকে বঞ্চিত হয়েছে- এরুপ ব্যবধানের কোন অর্থ হয় না।
নুরুদ্দিন ইবনে ইব্রাহিম হালাবী ( ৯৭৫/১৬-৫৬৭-১০৪৪/১৬৩৫) তাঁর গ্রন্থে শামসুদ্দিন ইউসুফ হানাফীর (৫৮১/১১৮৫-৬৫৪/১২৫৬) উদ্বৃতি দিয়ে বর্ননা করেছেনঃ
আবুবকর একদিন মিম্বরে বসা ছিলেন। এমন সময় ফাতিমা তার কাছে এসে বললেন, “হে আবুবকর, কোরান আপনার কন্যাকে আপনার উত্তরাধীকারী করেছে অথচ আপনি আমাকে আমার পিতার উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিত করেছেন”। একথা শোনা মাত্রই আবুবকর কাঁদতে কাঁদতে মিম্বর হতে নেমে পড়লেন। তারপর তিনি ফাতিমার অনুকুলে ফদক লিখে দিলেন। এসময় উমর সেখানে উপস্থিত হয়ে ওটা কি জানতে চাইলেন। প্রত্যুত্তরে আবুবকর বললেন, “এটা একটা দলিল যাতে আমি লিখে দিয়েছি যে, ফাতিমা তাঁর পিতার উত্তরাধিকারিনী।“ উমর বললো, “তুমি দেখছো আরবগন তোমার বিরুদ্বে যুদ্ধ ঘোষনা করতে যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে এ দলিল দিলে মুসলমানদের জন্য কোথা থকে তুমি ব্যয় করবে”। তারপর উমর ফাতিমার হাত থেকে দলিলখানা নিয়ে ছিড়ে ফেললেন (শাফী, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৬১-৩৬২)।
একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় আবুবকরের হাদিসটি জাল ও তার নিজের বানোয়াট এবং ফাতিমাকে ফদক ও রাসুলের (সাঃ) অন্যান্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্যই এই হাদিস রাসুলের (সাঃ) নাম দিয়ে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ফাতিমা এসব তালবাহানার জন্য আবুবকর ও উমরের উপর তাঁর রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে অছিয়ত করে দিলেন যে, এই ২ জন যেন তাঁর জানাযায় অংশ গ্রহন না করে।
আয়শা বর্ননা করেছেনঃ
রাসুলের (সাঃ) দেহত্যাগের পর আবুবকর যখন খলিফা হলেন তখন ফাতিমা রাসুল (সাঃ) কতৃক ত্যাজ্যবৃত্ত – ফদক এবং মদিনা ও খাইবারের এক পঞ্চমাংশ বার্ষিক আয়ের উত্তরাধিকার দাবি করলেন। আবুবকর ফাতিমাকে এর কোন কিছুই দিতে রাজী হলেন না। তখন থেকে ফাতিমা আবুবকরের ওপর রাগান্বিত ছিলেন এবং তাকে পরিত্যাগ করলেন এবং ইন্তেকাল পর্যন্ত আবুবকরের সাথে কখনো কথা বলেন নি। যখন ইন্তেকাল করলেন তখন তাঁর দাফন করলেন। তিনি আবুবকরকে ফাতিমার ইন্তেকালের খবর দেননি এবং জানাজার জন্যও ডাকেননি।
(বুখারি, ৫ম খন্ড, পৃঃ১৭৭,৮ম খন্ড, পৃঃ১৮৫; নায়সাবুরী, ৫ম খন্ড, পৃঃ ১৫৩- ১৫৫; শাফী, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ২৯; ৬ষ্ট খন্ড, পৃঃ ৩০০- ৩০১; সাদ, ২য় খন্ড, পৃঃ৮৬; হাম্বল, ১ম খন্ড,পৃঃ৯; তাবারী, ১ম খন্ড, পৃঃ১৮২৫; কাছীর, ৫ম খন্ড, পৃঃ ২৮৫-২৮৬; হাদীদ, ৬ষ্ট খন্ড, পৃঃ৪৬; সামহুদী, ৩য় খন্ড, পৃঃ৯৯৫)।………….
………………………………
ফাতিমা আমিরুল মু’মিনুন হযরত আলীকে আরো অনুরোধ করেছিলেন যে, তাঁকে যেন রাত্রিকালে দাফন করা হয়, কেউ যেন তাঁর কাছে না আসে, আবুবকর উমরকে তাঁর ইন্তেকাল ও দাফন সম্পর্কে কিছুই যেন অবহিত করা না হয় এবং আবুবকর যেন তাঁর জানাজায় না যায়। যখন তিনি ইন্তেকাল করলেন আলী তাকে গোসল করালেন, রাতের অন্ধকারে যেন দাফন করলেন এবং আবুবকর ও উমরকে এ বিষয়ে কিছু জানালেন না।
মুহাম্মদ ইবনে উমর ওয়াকিদি (১৩০/৭৪৭-২০৭/৮২৩) বলেছেনঃ
“আমাদের কাছে এটা প্রমানিত হয়েছে যে, আলী নিজেই ফাতিমার জানাজা করেছিলেন এবং আব্বাস ইবনে আব্দাল মুত্তালিব ও তার পুত্র ফজলকে সঙ্গে করে রাত্রিকালে তাঁকে দাফন করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনি কাউকে কিছু জানাননি।“
একারনে ফাতিমার মাজার শরিফ অজ্ঞাত ও গুপ্ত রয়ে গেছে-তাঁর মাজার সম্পর্কে কেউ কোন সুনিশ্চিত স্থান বলতে পারে না।
(নায়সাবুরি,৩য় খন্ড, পৃঃ১৬২-১৬৩;সানানী,৪র্থ খন্ড,পৃঃ২১৪১; বালাজুরী,১ম খন্ড,পৃঃ৪০২-৪০৫; বার,৪র্থ খন্ড,পৃঃ১৮৯৮;আছীর,৫ম খন্ড,পৃঃ৫২৪-৫২৫; হাজর,৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৩৭৯- ৩৮০; তাবারী,৩য় খন্ড,পৃঃ২৪৩৫-২৪৩৬;সাদ,৮ম খন্ড,পৃঃ১৯-২০; সামহুদী, ৩য় খন্ড,পৃঃ ৯০১-৯০৫; হাদীদ, ১৬শ খন্ড, পৃঃ২৭৯-২৮১)।
ফাতিমার এ অসন্তোষ নেহায়েত ব্যক্তিগত আবেগ বলে কেউ কেউ মনে করেন। তারা আসলে এ অসন্তোষের গূঢ় রহস্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। যদি এটা ব্যক্তিগত আবেগ হতো তাহলে আমিরুল মু’মিনিন এটা থেকে তাঁকে নিবৃত্ত করতেন। কিন্তু কোন ইতিহাসে দেখা যায় না যে, আমিরুল মু’মিনিন ফাতিমার অসন্তোষকে ব্যক্তিগত আবেগ বলে মনে করেছেন।
তদুপরি, কি করে ফাতিমার অসন্তোষ ব্যক্তিগত আবেগ প্রবনতা হতে পারে? তাঁর সকল সন্তোষ বা অসন্তোষই আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত।রাসুলের (সাঃ) নিন্মোক্ত বানীই এর প্রমানঃ
“হে ফাতিমা, নিশ্চয়ই তোমার ক্রোধে আল্লাহ ক্রোধান্বিত হন এবং তোমার সন্তুষ্টিতে আল্লাহ সন্তুষ্ট”
(নায়সাবুরি, ৩য় খন্ড,পৃঃ১৫৩;আছীর, ৫ম খন্ড,পৃঃ৫২২; হাজর,৪র্থ খন্ড,পৃঃ ৩৬৬;১২শ খন্ড,পৃঃ৪৪১;সয়ুতী,২য় খন্ড,পৃঃ২৬৫;হিন্দি,১৩শ খন্ড,পৃঃ৯৬;১৬শ খন্ড, পৃঃ ২৮০;শাফী, ৯ম খন্ড, পৃঃ২০৩)।
ফাতিমার ইন্তেকালের পর ফদকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ
ঐতিহাসিক গ্রন্থ থেকে ফদকের ৩০০ বছরের ইতিহাস বর্ননা করার পেছনে মুলত ৩টি প্রশ্নের ব্যাখ্যা প্রদান করাই উদ্দেশ্য—
ক) আবুবকর বলেছেন রাসুল (সাঃ) নাকি তাকে বলেছেন, “নবীদের পরিত্যাক্ত সম্পদ তাঁদের ওয়ারিশগন প্রাপ্য হন না।“ এহেন অযৌক্তিক উক্তি রাসুলের (সাঃ) নামে চালিয়ে দিয়ে যে বিধির প্রচলন করতে চেয়েছিলেন তা বাতিল করা। আবুবকরের এ বক্তব্য পরবর্তী ২ জন খলিফা উমর ও উসমান দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং উমাইয়া ও আব্বাসীয় অন্য বাদশাগন দ্বারাও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। একথা মনে রাখতে হবে যে, আবুবকরের খেলাফতের বৈধতা ও সঠিকতা এবং তার কর্মকান্ডের ওপরই পরবর্তী খেলাফতের বৈ্ধতা ও ন্যায্যতা সম্পুর্নরুপে নির্ভর করে।
খ) আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী ও ফাতিমার বংশধরগন কখনো তাদের দাবীর ন্যায্যতা, বৈধতা ও যৌক্তিকতা সম্পর্কে কোনরুপ দ্বিধা করেন নি। তাঁরা সব সময়ই সুনিশ্চিত ছিলেন যে, ফাতিমার ন্যাসঙ্গত অধিকার আবুবকর কেড়ে নিয়েছে এবং বৈধ দাবী আবুবকর প্রত্যাখ্যান করেছে। কারন ফাতিমা কখনো কোন কিছুর জন্য মিথ্যা দাবী উত্থাপন করতে পারেন না। যদি এমনটি কেউ বলে যে, ফাতিমার দাবী মিথ্যা তবে নিশ্চয়ই মনে করতে হবে সে ( যে এমন করে ) মিথ্যাবাদী।
গ) যখনই খলিফা আল্লাহর আদেশ কার্যকর করার সিদ্বান্ত নিয়েছে এবং ন্যায়বিচার করার চিন্তা করেছে এবং ইসলামিক বিধানকে সমুন্নত করার চিন্তা করেছে, তখনই তারা ফাতিমাকে ফদক ফেরত দিয়েছে।
উমর ইবনে খাত্তাব ছিলেন তাদের মধ্যেও ১ম সারির লোক যারা ফাতিমাকে ফদক থেকে বঞ্চিত করার কাজে লিপ্ত ছিলেন।
উমর নিজেই স্বীকার করেছিলেনঃ
যখন আল্লাহর রাসুল ইন্তেকাল করেন তখন আমি আবুবকরকে সঙ্গে করে আলীর কাছে গিয়ে বললাম, আল্লহর রাসুলের পরিত্যক্ত বিষপ্য-সম্পত্তি সম্বন্ধ্বে আপনি কি ভেবেছেন?” আলী বললেন, “রাসুলের সব কিছুরই একমাত্র উত্তরাধিকারী আমরা”। তখন আমি (উমর) বললাম, “খাইবারের সম্পত্তিতেও?” তিনি বললেন, “হাঁ, খাইবারের সম্পত্তিতেও” আমি বললাম, ”ফদকেও”? তিনি বললেন, “হাঁ,ফদকেও”। তখন আমি বললাম, “আল্লাহর কসম, আমরা তা হতে দেব না”। আপনি যদি করাত দিয়েও আমাদের কেটে ফেলেন আমরা তা হতে দেব না”। (শাফী, ৯ম খন্ড, পৃঃ৩৯-৪০)।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আবুবকর দ্বারা প্রদত্ত ফদকের দলিল উমর ফাতিমার হাত থেকে টেনে নিয়ে ছিড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু উমর যখন খলিফা হলেন (১৩/৬৩৪-২৩/৬৪৪) তখন তিনি রাসুলের উত্তরাধিকারীদের ফদক ফেরত দিয়ে ছিলেন। প্রসিদ্ব ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক ইয়াকুত হামাবি (৫৭৪/১১৭৮-৬২৬/১২২৯) লিখেছেনঃ
উমর ইবনে খাত্তাব খলিফা হবার পর যখন বিজয় লাভ করলেন এবং মুসলিমগন মোটামুটি সম্পদশালী হয়ে উঠলো এবং বায়তুল মাল জনগনের প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হলো তখন তিনি আগের খলিফা আবুবকরের সিদ্ধান্ত বাতিল করে রায় দিলেন যে, ফদক রাসুলের (সাঃ) উত্তরাধিকারীদের হাতে ফেরত দেয়া হলো।।………..( হামাবি, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ২৩৮-২৩৯); সামহুদী, ৩য় খন্ড, পৃঃ৯৯৯; আজহারী, ১০ম খন্ড, পৃঃ১২৪; মঞ্জুর,১০ম খন্ড, পৃঃ৪৭৩; জাবিদী, ৭ম খন্ড, পৃঃ১৩৬)।
উপরে বর্নিত ইতিহাস থেকে থেকে বুঝা যায় যে, আবুবকর ও উমর কোন ধর্মীয় কারনে ফদক থেকে ফাতিমাকে বঞ্চিত করে আত্নসাত করেননি।শুধুমাত্র রাজনৈ্তিক ও অর্থনৈ্তিক অবস্থার কারনে তারা এটি করেছেন।যখন খেলাফতে তাদের আসন শক্তিশালী হয়েছে তখনই উমর তার সিদ্বান্ত পরিবর্তন করে ফদক ফেরত দেয়ার রায় দিয়েছিল। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলীকে অর্থনৈ্তিক অসচ্ছলতায় রাখতে পারলে খেলাফত দখল কিছুটা নির্বিঘ্ন থাকবে বলে তারা এটি করেছেন।
শেয়ার করুন: