সম্ভাবনাময় পেশা ছেড়ে এক দম্পতির কৃষক হয়ে ওঠার গল্প

শেয়ার করুন:


আকাশছোঁয়া স্বপ্নের ত্বোয়া এগ্রো পার্ক

আলাউল হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক (এবিসিবার্তা) :
কৃষকের সন্তানও এখন করতে চান না কৃষিকাজ। সেই মুহূর্তে চাকরি ছেড়ে কৃষিতে ঝুঁকছেন অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে অনেকেই এখন গবাদি পশুর খামার কিংবা কৃষি প্রজেক্ট করছেন। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষিতে আত্মনিয়োগ করে স্বাবলম্বী হওয়া শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর সংখ্যা এখন দুই-তিন লাখের কম হবে না। করোনার প্রভাবে যখন চারদিকে কর্মহীনের ছড়াছড়ি, তখনো বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে কৃষি খাত। কেউ আবার চাকরি বা ব্যবসার পাশাপাশিও বাড়তি আয়ের জন্য গড়ে তুলছেন খামার। অনেকে ফেসবুক পেজ বা ইউটিউবের মাধ্যমে তা বিক্রির ব্যবস্থাও করছেন সারাদেশে। পাবনার বেড়া উপজেলার জাতসাখিনী ইউনিয়নের নয়াবাড়ি গ্রামের এসএম জাফরুজ্জামান লিটন-হালিমা দম্পতি এই সময়ের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। আইনশাস্ত্রে পড়া শিক্ষিত এই দম্পতি একটি মিশ্র ফলবাগান ও গৃহপালিত পশুপাখির খামার গড়ে তুলেছেন নিজ গ্রামে। তারা দু’জন ওকালতির মতো সম্ভাবনাময় পেশা ছেড়ে এই নিভৃত পল্লীতে খুঁজে নিয়েছেন তাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিবাস। দুই সন্তানের জনক লিটন মেয়ের নাম অনুসারে বাগানটির নাম দিয়েছেন ‘ত্বোয়া এগ্রো পার্ক’। ত্বোয়া এগ্রো পার্কে আছে ৫০ (পঞ্চাশ) প্রকার দেশি-বিদেশি ফলগাছ, ১০ (দশ) প্রকার মসলা গাছ, ১৫ (পনেরো) প্রকার ঔষুধিগাছ, ২৫ (পঁচিশ) প্রকার ফুল ও শোভাবর্ধনকারী গাছ। এছাড়াও আছে গরু, ছাগল, খরগোশ, হাঁস, মুরগি, কবুতর, কয়েল পাখির খামার। আরও আছে মিনি মৎস খামার ও উৎস হাইব্রিড নার্সারি। ফলের মধ্যে ১২ জাতের কলমের আম, কাঁঠাল, আপেল, আঙ্গুর, মাল্টা, কমলা, লটকন, আরবের খেজুর, থাই জামরুল, মিষ্টি তেঁতুল, মিষ্টি কামরাঙ্গা, বারোমাসী পেয়ারা, চায়না-থ্রি লিচুসহ বিভিন্ন জাতের লিচু, আপেল কুল বাউকুল, প্যাশন ফ্রুট, ড্রাগন ফল সফেদা, জলপাই, বিলাতী গাব, চালতা, আতা, শরীফা, আমড়া, করমচা, লেবু, বাতাবিলেবু, ডেউয়া, অরবরই, নাড়িকেল, দেশি খেঁজুর, তাল, সুপারি, বেল, কদবেল, কলা, পেঁপে, জাম, আনারস, ডালিম, তুঁতফলসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলগাছ। মসলার মধ্যে দারুচিনি, তেজপাতা, পামওয়েল, সাদা এলাচ, গোলমরিচ, হরতকি, ঘৃতকুমারী, নিম, অর্জুন, পেলটি, লজ্জ্বাবতি, পাঁথরকুচি, তুলসী ইত্যাদি। এরই মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ প্রকার ফল ধরতে শুরু হয়েছে।
আলাপকালে তিনি জানান, ২০০০ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ‘ল’ কলেজ থেকে আইনের উপর ডিগ্রি নিয়েছেন তিনি ও তার স্ত্রী। স্বামী-স্ত্রী উচ্চ শিক্ষিত হয়েও চাকরি বা আইন ব্যবসা না করে, শহরের বিলাসবহুল জীবন ফেলে গ্রামে এ ধরনের পেশা বেছে নিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসএম জাফরুজ্জামান লিটন বলেন, আমি গ্রামের সন্তান। গ্রাম আমার ভালো লাগে, ছোটবেলা থেকেই গাছ-গাছালি রোপণ ও পশুপাখি পালন আমার ভালো লাগত। আমি স্বাধীন ও সৎ জীবনযাপন পছন্দ করি, তাছাড়া আমি আইন পড়ার সময় ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ঢাকায় একটি এনজিওতে চাকরি করতাম। সে সময় বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করে বিভিন্ন প্রকার মেলা যেমন- বৃক্ষমেলা, ফলমেলা, লোকশিল্প মেলা, কারুমেলা দেখে নিজে কিছু করার জন্য উদ্বুদ্ধ হই।

বাগানের নামকরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে লিটন বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে কৃষি শিক্ষা ও গার্হস্থ্য অর্থনীতি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা এসব বিষয়ের উপর পড়াশোনা বা পেশা গ্রহণে আগ্রহী হয় না। তাছাড়া এদেশে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞানদানের জায়গার অভাব রয়েছে। তাই আমি ‘এগ্রো পার্ক’ নাম দিয়েছি যাতে নামের উপর ভিত্তি করে হলেও ছাত্রছাত্রীরা এই বাগান পরিদর্শনে আগ্রহী হয়। এছাড়াও সরকারের ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ স্লোগানকে আমি বাস্তবে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছি। যাতে আমার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা এই পেশায় এগিয়ে আসেন এবং নিজের কর্মসংস্থান নিজেই করতে পারেন। বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়িকে খামারে রূপ দিতে পারলে দেশ সমৃদ্ধ হবে। দক্ষ কৃষক গড়ে তুলতে আমি বেকার শিক্ষিত তরুণদের হাতে কলমে বাগান করার প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেছি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে লিটন বলেন, ১২ বছর বয়সী আমার ১ বিঘার এই বাগানে বর্তমানে বছরে ৩ লক্ষাধিক টাকা আয় হচ্ছে যা দিয়ে আমার সংসার ভালোভাবেই চলছে। সেই সাথে বর্তমানে ‘ত্বোয়া এগ্রো পার্ক’ দ্বিতল ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু করেছি।

আগামীতে একটি এগ্রো কোম্পানী এবং এগ্রো ফাউন্ডেশন গঠন করে তার চিন্তাকে সারাদেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চান। এছাড়া শিশুদের জন্য একটি দোলনা ও স্লিপার স্থাপন, দেশি-বিদেশি ১০০ প্রকার ফল গাছ রোপণ, পার্কের তিন কোণে তিনটি বিশ্রামাগার নির্মাণ, হরিণ, উট, ময়ূর, টিয়া, হনুমান, রাজহাঁস, চিনামুরগি, বানর ও ময়না পাখির খামার স্থাপনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। ইতোমধ্যে তিনি যমুনার চরাঞ্চলের মানুষকে ফলজ বাগান তৈরির ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করছেন। তার স্বপ্ন কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ যদি সম্মিলিতভাবে সারাদেশে মহাসড়কের দু’পাশে বনজ গাছের পরিবর্তে ফলজ ও ঔষুধি গাছ রোপণ করে তাহলে আমাদের এই দেশ এক সময় ফলজ ও ফল প্রক্রিয়াজাত দ্রব্য রপ্তানিতে ভালো জায়গা করে নেবে। এছাড়া দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় ফলজ ও ঔষুধি গাছ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে।

শহর ছেড়ে গ্রামের এই আটপৌঢ়ে জীবন কেমন লাগছে জানতে চাইলে লিটনের সহধর্মীনি হালিমা আক্তার বলেন, এখন আর ঢাকায় গেলে ভালো লাগে না। কখন ফিরে আসবো, পশু-পাখি-প্রকৃতির সাথে বসবাস করতে পারবো- সেই তাড়া অনুভব করি। একটা তৃপ্তি ও আনন্দ খুঁজে পাই কৃষি কাজের ভেতর।

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা-ভিসি ও বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আমিন উদ্দিন মৃধা বলেন, সমন্বিত কৃষি খামার করে সারাদেশের অনেকেই এখন লাখ লাখ টাকা উপার্জন করছেন। তবে আমার নিজের এলাকায় গড়ে ওঠা ‘ত্বোয়া এগ্রো পার্ক’-এ এসে আমি সত্যিই অভিভূত। লিটনের মতো শিক্ষিত যুবকেরা যদি কৃষি পেশায় আসেন, তাহলে কৃষকেরা উৎসাহিত এবং উপকৃত হবেন। লিটনের মধ্যে যে সদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও কাজের প্রতি ধ্যান-জ্ঞান তা তাকে পিছিয়ে রাখতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছে শক্তি নিয়ে তিনি যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে তাতে আমার ধারণা- তার এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই এলাকায় কৃষিবিপ্লব ঘটবে। তার মতো শিক্ষিত কৃষকদের চিন্তা যদি কৃষক সংগঠনের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কৃষক তথা আমাদের কৃষি প্রধান দেশ উপকৃত হবে।

https://www.youtube.com/watch?v=mTNkDCdrZ50&t=10s

‘ত্বোয়া এগ্রো পার্ক’ এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের মধ্যে নিজে কিছু করার বাসনা তৈরিতে অগ্রণি ভূমিকা পালন করবে বলে স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন।

শেয়ার করুন: