মুক্তিযোদ্ধা মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ

শেয়ার করুন:

সাফিয়া বেগম একজন সুখী রমনী। তার স্বামী বিত্তশালী ইউনুস চৌধুরী। তাদের একমাত্র ছেলে মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদ। ইস্কাটনের রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়িতে সুখেই কাটছিল তাদের দিন। কিন্তু আজাদের বাবার দ্বিতীয় বিয়ে তাদের সুখের সংসারে ঝড় তুলে দেয়। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন সাফিয়া বেগম কিছুতেই স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েকে মেনে নিতে পারেননি। তাই আজাদকে নিয়ে এক কাপড়ে ইস্কাটনের বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন। আর এরপর তারা উঠেন জুরাইনের এক খুপড়ি ঘরে।এখানে অভাব অনটনে দিন কাটলেও আজাদর মা তার স্বামীর কাছে ফিরে যাননি। তিনি কষ্ট করে ছেলেকে বড় করতে লাগলেন। যে সময়ে আজাদের পড়াশুনা শেষে চাকরি করার কথা সেসময় আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আজাদের বন্ধুরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিচ্ছে কিন্তু আজাদ কি করবে?আজাদ যায় তার মায়ের অনুমতি নিতে। তার মা তাকে বলে, “আমি কী তোকে শুধু আমার জন্যই মানুষ করেছি। এদেশটাও তোর মা। যা দেশটাকে স্বাধীন করে আয়।”আজাদ ঢাকায় ক্র্যাক প্লাটুনের এক জন যোদ্ধা হিসেবে যোগদান করেন। এই গেরিলা দলটি তৎকালীন সময়ে “হিট এন্ড রান” পদ্ধতিতে বেশ কিছু সংখ্যক আক্রমণ পরিচালনা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক ভয়ের সঞ্চার করে ।১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন জায়গায় রেইড চালায়। আজাদের বাড়িতেও রেইড হয়, তখন আজাদ তার সহযোদ্ধাদের সাথে ধরা পরে যান।পাকিস্তানিরা মুক্তিযোদ্ধাদের থেকে তথ্য জানার জন্য অকথ্য নির্যাতন করত। এরকম নির্মম অত্যাচারের স্বীকার হয় আজাদও কিন্তু তিনি কোনো তথ‍্য দেন নি। এরপর আজাদের মা যায় আজাদের সঙ্গে দেখা করতে। আজাদ জানায় ওরা খুব মারে, কি করবে?তিনি আজাদকে বললেন, “বাবারে, যখন মারবে, তুমি শক্ত হয়ে থেকো। সহ্য করো। কারো নাম যেন বলে দিও না।” আজাদ মাকে কথা দিয়েছিল যে কোনো তথ‍্য জানাবে না। এরপর আজাদ বলে, “মা, ভাত খেতে ইচ্ছা করে। দুইদিন ভাত খাই না। কালকে ভাত দিয়েছিল, আমি ভাগে পাই নাই।” আজাদের মা তাকে অভয় ও সান্তনা দিয়ে বলেছিলেন, “কালকে আমি ভাত নিয়ে আসবো।”পরদিন মা ভাত নিয়ে ছেলেকে দেখতে যায় কিন্তু আজাদকে পায় না। অনেক খুঁজেও আজাদের দেখা পাওয়া যায় না।এরপর দেশ স্বাধীন হয় কিন্তু আজাদ ফেরে না। মা অপেক্ষা করতে থাকে দীর্ঘ ১৪ টি বছর।এই ১৪ বছর তিনি ভাত খাননি, হাপাঁনী থাকা সত্ত্বেও মাটিতে মাদুর বিছিয়ে শুতেন । কারণ তার ছেলে জেলখানায় মাদুরে শুতেন। ১৯৮৫ সালের ৩০ শে আগস্ট, মারা যাওয়ার আগেই তিনি বলে গিয়েছিলেন তার কবরের ফলকে পরিচয় হিসেবে লিখতে ‘শহীদ আজাদের মা’। তাই আজও জুরাইনে তার কবরে লেখা ‘মোসাঃ সাফিয়া বেগম, শহীদ আজাদের মা’। লেখক : আনিসুল হক।

শেয়ার করুন: