মঙ্গল পাণ্ডে নন, ১৮৫৭-র লড়াইয়ের অগ্রনায়ক কি মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহ ? ~ সৈয়দ নকিব মাহমুদ
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ, যা অনেকের কাছে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম নামে পরিচিত, তার নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, ব্যারাকপুরের সিপাহি বিদ্রোহের প্রতীকী মুখ Mangal Pandey নন; বরং ফৈজাবাদের সুফি নেতা Ahmadullah Shah-ই ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সেই সংগ্রামের প্রকৃত অগ্রনায়ক।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৭৮৭ সালে জন্ম নেওয়া আহমদুল্লাহ শাহ দীর্ঘ সময় উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ধর্মীয় বক্তৃতা ও রাজনৈতিক বার্তার মাধ্যমে সমর্থন গড়ে তোলেন। তিনি “মৌলভি অব ফৈজাবাদ” ও “ডানকা শাহ” নামে পরিচিত ছিলেন। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রাক্কালে তাঁকে ব্রিটিশরা গ্রেপ্তার করলেও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে তিনি মুক্ত হন এবং দ্রুত আওধ ও রোহিলখণ্ড অঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগঠিত করেন।
সমসাময়িক ব্রিটিশ নথিতে তাঁকে “অত্যন্ত বিপজ্জনক ও দক্ষ বিদ্রোহী নেতা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। Lucknow ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে তিনি আওধের রানি Begum Hazrat Mahal-এর সঙ্গে সমন্বয় করে একাধিক সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ঐতিহাসিক বিবরণে দেখা যায়, তিনি কেবল ধর্মীয় অনুপ্রেরণা জোগাননি, বরং যুদ্ধকৌশল নির্ধারণ ও সৈন্য সংগঠনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিলেন।
অন্যদিকে, বিদ্রোহের সূচনাপর্বে ব্যারাকপুরের ঘটনার জন্য মঙ্গল পাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে প্রতীকী নায়ক হিসেবে স্বীকৃত। ইতিহাসবিদদের মতে, পাণ্ডের ভূমিকা ছিল বিদ্রোহের সূচনায় তাৎপর্যপূর্ণ, তবে বৃহত্তর সামরিক সংগঠন, কৌশলগত সমন্বয় এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আহমদুল্লাহ শাহের অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ যে বহুকেন্দ্রিক ছিল, মীরাট, দিল্লি, কানপুর, লখনউসহ বিভিন্ন স্থানে আলাদা আলাদা নেতৃত্বে লড়াই চলেছে, তা অধিকাংশ গবেষণায় স্বীকৃত।
ব্রিটিশ প্রশাসন আহমদুল্লাহ শাহকে জীবিত বা মৃত ধরিয়ে দিলে ৫০,০০০ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল বলে ঐতিহাসিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ১৮৫৮ সালের ৫ জুন (কিছু সূত্রে ১৫ জুন) আওধের পাওয়াঁ অঞ্চলে তিনি নিহত হন। অধিকাংশ বিবরণ অনুযায়ী, স্থানীয় রাজা জগন্নাথ সিংহের অনুগামীরা তাঁকে হত্যা করে এবং তাঁর শিরশ্ছেদ করে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয়। ব্রিটিশ রিপোর্টে তাঁর ব্যক্তিগত সাহস ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি মিললেও তাঁকে দমন করতে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছিল।
খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ William Dalrymple তাঁর গ্রন্থ The Last Mughal-এ আহমদুল্লাহ শাহকে ১৮৫৭-র বিদ্রোহের অন্যতম সংগঠক ও ক্যারিশম্যাটিক নেতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এছাড়া John William Kaye ও George Bruce Malleson-এর রচনাতেও তাঁর কর্মকাণ্ডের উল্লেখ রয়েছে।
তবে জন্মস্থান, প্রারম্ভিক জীবন, বিদেশ ভ্রমণ এবং তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, “প্রথম নায়ক” নির্ধারণের প্রশ্নটি মূলত ব্যাখ্যাগত ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীল। ১৮৫৭ সালের মহা সংগ্রাম ছিল বহুমাত্রিক ও বহু-নেতৃত্বাধীন; ফলে একক নায়কের ধারণা ইতিহাসের জটিলতাকে সরলীকৃত করে।
ইতিহাসবিদদের একাংশের বক্তব্য, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত দাবিগুলি আংশিক সত্যের ওপর দাঁড়ালেও পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক মূল্যায়নের জন্য আরও দলিলভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। তবুও এতে সন্দেহ নাই যে মৌলভী আহমদুল্লাহ শাহ ১৮৫৭-র লড়াইয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নাম, যাঁর অবদান নতুন করে আলোচনায় উঠে আসছে।
সূত্র:
William Dalrymple, The Last Mughal (2006)
The Indian Mutiny of 1857 , John Kaye
History of the Indian Mutiny , George Bruce Malleson
British Library আর্কাইভ নথি (১৮৫৭ সম্পর্কিত সমসাময়িক দলিল)।
আহমদুল্লাহ শাহ চিত্র : উইকিপিডিয়া।সংগ্রহঃ ফেসবুক থেকে।
