পাবনায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ
। আমিরুল ইসলাম রাঙা।
১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা পাবনায় আসার পর ২৮ ও ২৯ শে মার্চ দুই দিনে পাবনা পুলিশ লাইন, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, লস্করপুর, বালিয়াহালট, মালিগাছা, মাধপুর, দাশুড়িয়া, মুলাডুলি সহ ১৭ টি স্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর আসলাম, ক্যাপ্টেন আসগার ও লেফটেন্যান্ট রশিদ সহ প্রায় দেড় শতাধিক সৈন্য নিহত হয়। অপরদিকে ঐসব যুদ্ধে শহীদ বুলবুল, জলিল দারোগা, হাবিবুর রহমান রাজু, ওহিদুর রহমান সহ অর্ধ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসী শহীদ হন।
পাবনায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে ছাত্র, শ্রমিক এবং বীর জনতার সাথে অংশ নেন পুলিশ এবং আনসার বাহিনী। পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিপরীতে প্রতিরোধ যোদ্ধারা লাঠিসোটা, তীর ধনুক, বোমা, লাইসেন্সকৃত বন্দুক এবং এয়ারগান নিয়ে যুদ্ধ করে। এর সাথে যোগ হয় পুলিশের থ্রি নট থ্রি রাইফেল। প্রবোল জনরোষের মধ্যে পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত সৈন্যরা দুই দিনের যুদ্ধে পরাজিত হয় এবং ২৯ শে মার্চ পাবনা হানাদার মুক্ত হয়।
২৬ শে মার্চ ভোররাতে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট থেকে ২৫, পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানি পদাতিক সৈন্য পাবনায় আসে। দলপতি ছিলেন ক্যাপ্টেন আসগর এবং ডেপুটি ছিলেন লেফটেন্যান্ট রশিদ। এদের সাথে সুবেদার ও নায়েক সুবেদার সহ ১৩০ জন সৈনিক ছিল। তারা পাবনা ইপিসিক ( বিসিক), সার্কিট হাউজ, ছাতিয়ানি পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউজে অবস্থান নেয়। সকালে পাকিস্তানি সৈন্যরা জিপ ও ট্রাকে মাইক বেঁধে পাবনা শহরে কার্ফু জারী করে। তাদের এই কাজে সহায়তা করে পাবনা বাজারের নাইটগার্ড সর্দার উজির খান। সৈন্যরা তাকে গাড়িতে তুলে গোটা শহরে উর্দু এবং বাংলায় কার্ফু জারীর ঘোষণা করে। এছাড়া শহরের রাস্তা ঘাট এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজনের বাড়িঘর চিনিয়ে নেন।
পাকিস্তানি সৈন্যরা ২৬ শে মার্চ বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগের মহকুমা সভাপতি নব-নির্বাচিত এমপিএ অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন, ভাসানী পন্থী ন্যাপের জেলা সভাপতি ডা. অমলেন্দু দাক্ষী, তৃপ্তিনিলয় হোটেলের মালিক সাঈদ তালুকদার, এডরুকের মালিক আব্দুল হামিদ খান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব কফিল উদ্দিন, সিগারেট কোম্পানির এজেন্ট হাবিবুর রহমান, মোশারফ হোসেন মোখতার, পৌরসভার ট্যাক্স কালেক্টর আব্দুল খালেক, মটর ভেহিকেল ক্লার্ক মাহবুব চৌধুরী, অধ্যাপক শফিকুল হায়দার, কাপড় ব্যবসায়ী সাহাজ উদ্দিন মুন্সি, রাধানগর মক্তব পাড়ার রমজান আলী প্রামাণিক, রাজন পাগলা সহ অর্ধ শতাধিক মানুষকে আটক করে।
২৬ শে মার্চ সকালে লেফটেন্যান্ট রশিদের নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাবনার ডিসি নুরুল কাদের খানের বাসভবনে যায়। সৈন্যরা ডিসি নুরুল কাদের খানকে সেনাক্যাম্পে যাওয়ার কথা বলেন। এ সময় পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে চাকরি করা চৌকস সিএসপি অফিসার নুরুল কাদের খান তাঁর নিজের পরিচয় জানিয়ে বলেন তাঁদের পাবনায় আসার পূর্বে অবহিত করা উচিত ছিল। এছাড়া আইনতঃ কার্ফু জারী করতে হলে ডিসি’র অনুমতি প্রয়োজন হয়। ডিসির নির্ভুল উর্দু এবং ইংরেজি বাক্যবানে তরুণ পাকিস্তানি অফিসার বিভ্রান্ত হয়ে ডিসি বাংলো ত্যাগ করে। (সুত্র – নুরুল কাদের খানের লেখা বই ” একাত্তর আমার “।
পাকিস্তানি সৈন্যরা ডিসি বাংলো থেকে বের হয়ে বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয়। এরপর ডিসি নুরুল কাদের খান বাসভবনের পিছনের প্রাচীর ডিঙিয়ে কলাবাগান সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় যান। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াজি উদ্দিন খানকে সাথে নিয়ে শহরের দক্ষিণে চর রামচন্দ্রপুর এলাকার আওয়ামী লীগের সমর্থক তোফাজ্জল হোসেন মালিথার বাড়িতে উঠেন। সেখান থেকে আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াজি উদ্দিন খান এবং নবাব আলী মোল্লার প্রচেষ্টায় আওয়ামী লীগের সভাপতি আমজাদ হোসেন এমএনএ, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রব বগা মিয়া এমপিএ, গোলাম আলী কাদেরী, আমিনুল ইসলাম বাদশা, ছাত্র নেতা রফিকুল ইসলাম বকুল, ফজলুল হক মন্টু সহ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ একত্রিত হন।
এদিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা এসপি চৌধুরী আব্দুল গফফারের বাসভবনে যান। সেখানে এসপি গফফার সাহেবকে না পেয়ে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী মাহবুবুর রহমান পান্নাকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে এসপি গফফার পাবনা পুলিশ লাইন থেকে কয়েকজন উর্দু ভাষী পুলিশ সদস্যকে পাঠিয়ে এসপির পুত্রকে মুক্ত করেন। এরপর এসপি গফফার চৌধুরী চর এলাকায় গিয়ে ডিসি নুরুল কাদের খানের সাথে যোগ দেন। এছাড়া জেলা আনসার এডজুটেন্ট আবুল বরকত সহ অনেকে সেখানে উপস্থিত হন। ইতোমধ্যে ঢাকা রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ এবং রাজশাহীর ডিআইজি মামুন মাহমুদ এবং এসপি এম,এ মজিদ সহ অসংখ্য পুলিশ সদস্যকে হত্যা করার খবর পাওয়ার পর পাবনায় অবস্থানরত পুলিশরা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। পাবনা পুলিশ লাইনে আর,আই আবুল খয়েরের নেতৃত্বে পুলিশরা টেঞ্চ খনন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।
২৭ শে মার্চ সারাদিন শহরের চারপাশে তরুণ যুবকদের সংগঠিত করা হয়। লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র, লাঠি ফালা, তীর ধনুক, হাতবোমা সহ নানা ভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ২৭ শে মার্চ গভীর রাতে পুলিশ লাইনের দক্ষিণ পার্শ্বে জিসিআই স্কুল সংলগ্ন এলাকা, জজকোর্ট, ডিসি অফিস এলাকা, পোস্ট অফিস, জেলখানার পূর্ব দিক এবং জেলা স্কুল এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নেয়।
২৮ শে মার্চ ভোরে একদল পাকিস্তানি সৈন্য পুলিশ লাইনের পূর্ব দিকে পোস্ট অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডমাইকে পুলিশদের আত্মসমর্পণ করার আহবান জানাতে থাকে। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা গুলিবর্ষণ শুরু করলে পুলিশ বাহিনী পাল্টা গুলি চালাতে থাকে। পাকিস্তানি সৈন্যদের সম্মুখে পুলিশ এবং চারদিকে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি চালায়। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পিছু হটতে থাকে। সেখান থেকে একদল সৈন্য বিসিক সেনাক্যাম্পে এবং আরেকদল শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জে আশ্রয় নেয়।
মুক্তিকামী জনতা সকাল থেকে পুরাতন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসের চারদিক ঘিরে পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর গুলি চালাতে থাকে। ইতোমধ্যে পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার খুলে দেওয়া হয়। পুলিশ বাহিনী এবং জনতা সেখান থেকে অস্ত্র নিয়ে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থানরত পাকিস্তানি সৈন্যদের ওপর গুলি চালাতে থাকে। দুপুরের আগেই টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবরুদ্ধ সৈন্যরা পরাস্ত হয়। সেখানে ২৮ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। সেখানে কোন মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হয়নি।
একই দিন দুপুরে লস্করপুর ( বর্তমান বাস টার্মিনাল) এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের চেকপোস্ট আক্রমণ করা হয়। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল গুলিবর্ষণ শুরু হয়। উক্ত স্থানে পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে শহীদ হন বুলবুল ( যার নামে সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ), আমিরুল ইসলাম ফুনু, মহসিন বেগ মুকু এবং আফসার উদ্দিন।
২৮ শে মার্চ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এবং লস্করপুর চেকপোস্টে পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হওয়ার পর বিসিকে প্রায় শতাধিক সৈন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তাদের উদ্ধার করার জন্য ২৯ শে মার্চ ভোরে রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট থেকে মেজর আসলামের নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাবনায় আসে। ২৯ তারিখ সকাল থেকে পাবনা শহরে বিমান থেকে বোমা বর্ষন করা হয়। এর একপর্যায়ে বিসিকে আটকে পড়া সৈন্যদের নিয়ে হেমায়েতপুর মেন্টাল হাসপাতালের পাশ দিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা পাকশী অভিমুখে রওনা হয়।
পাকিস্তানি সৈন্যরা গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে মাধপুর বটতলা মোড়ে বিপুল সংখ্যক প্রতিরোধ যোদ্ধার বাঁধার মুখে পড়ে। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু হয়। সেখানে গোলাগুলিতে উভয়পক্ষের বহু যোদ্ধা হতাহত হন। মাধপুর যুদ্ধে নিহত মুক্তিযোদ্ধারা হলেন, হাবিবুর রহমান রাজু, ওহিদুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, নবাব আলী, আব্দুল গফুর, নুরুল ইসলাম, নবীর উদ্দিন, তাজের উদ্দিন, লস্কর সরদার, ফরমান সরদার এবং হামির উদ্দিন।
মাধপুর যুদ্ধে অনেক পাকিস্তানি সৈন্য হতাহত হয়। এরপর দাশুড়িয়া, মুলাডুলি, লালপুর সহ পথিমধ্যে অসংখ্য স্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর পূর্বে ২৯ তারিখ বিসিক শিল্প এলাকা থেকে দলছুট হয়ে বালিয়াহালট কবরস্থানে একজন সৈন্য নিহত হয়। এছাড়া মালিগাছায় একদল সৈন্যের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধে আটঘরিয়া থানার দারোগা আব্দুল জলিল শহীদ হন। সেখানে আরো কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
২৯ শে মার্চ পাবনা বিসিক থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা পালিয়ে যাওয়ার পূর্বে তাদের হাতে আটক পাবনা সদর মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া থেকে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ( এমপিএ) অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন, ন্যাপ নেতা ডা. অমলেন্দু দাক্ষী, তৃপ্তি নিলয় হোটেলের মালিক সাঈদ তালুকদার ও রাজেনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাকিস্তানি সৈন্যরা পালিয়ে যাওয়ার পর পৌরসভার ট্যাক্স কালেক্টর আব্দুল খালেককে গুরুত্বর আহত অবস্থায় পাওয়া যায়।
বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা যায় ২৮ ও ২৯ শে মার্চ এই দুইদিনে ১৭ টি স্থানে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে যুদ্ধে মেজর আসলাম, ক্যাপ্টেন আসগর এবং লেফটেন্যান্ট রশিদ সহ দেড় শতাধিক সৈন্য নিহত হয়। অপর পক্ষে প্রায় ৫০ জন প্রতিরোধ যোদ্ধা এবং জনতা শহীদ হন। এরপর ২৯ শে মার্চ থেকে ১০ ই এপ্রিল পর্যন্ত পাবনা হানাদার মুক্ত হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৬ শে মার্চের পর পাবনায় প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং আগত সমস্ত সৈন্যদের হত্যা করে প্রায় দেড় সপ্তাহ পাবনা হানাদার মুক্ত থাকে। এরপর পাকিস্তানি সৈন্যরা নগরবাড়ি ঘাট হয়ে ১০ ই এপ্রিল পুনরায় পাবনা প্রবেশ করে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাবনার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের ঘটনা স্বর্ণ অক্ষরে লেখা আছে।
লেখক –
আমিরুল ইসলাম রাঙা
লেখক ও রাজনীতিক
পাবনা।
২৫ শে মার্চ ২০২৬
সুত্রঃ ফেসবুক পাতা থেকে
