‘কারাগারের রোজনামচা’ প্রকাশনা উৎসবে শেখ হাসিনা’র স্মৃতিচারণ আবেগমাখা ও কান্নাজড়িত

শেয়ার করুন:

shekhhasina

শেখ রাসেল বুঝতেই চাইছে না, বাবা বাসায় যেতে পারবেন না। বাবা কারাগারে বন্দি! ও বাবার হাত ধরে বলছে, ‘বাবা বাড়ি চলো…’। বাবা কাছে নিয়ে আদর করে রাসেলকে বললেন তোমার মা’র বাড়িতে তুমি যাও, আমি এখানেই থাকি! আমরা বুঝলেও শেখ রাসেল কিছুতেই বুঝতে চাইছিল না…

এভাবেই বাবার স্মৃতিচারণা করছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাগারের দিনগুলো নিয়ে লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে স্মৃতিচারণকালে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইটির প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ২৭ মিনিটের বক্তব্যটি ছিল আবেগমাখা ও কান্নাজড়িত। তার এ বক্তব্যের সময় দর্শক গ্যালারিতে বসে থাকা অতিথিরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেককে উচ্চৈস্বরেও কাঁদতে দেখা গেছে।

রকাশনা উৎসবে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। দেশের বাইরে থাকায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারেননি বিশেষ অতিথি বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সহসভাপতি শেখ রেহানা।

অনুষ্ঠানে গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। বইটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পড়ে শোনান সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। গ্রন্থটির নামকরণ করেছেন শেখ রেহানা।

শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, যে খাতা দুটি নিয়ে কারাগারের রোজনামচা বইটি লেখা, সেই খাতা দুটি বাজেয়াপ্ত ছিল। জেলখানায় বাজেয়াপ্ত করা হয়। আর সে তথ্যটি পেয়েছিলাম এসবি রিপোর্ট থেকে। ১৯৯৬ সালে যখন সরকার গঠন করি, তখন এসবি রিপোর্টগুলো কালেক্ট করে রেখে দিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে খাতা দুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। ২০১৪ সালে এসে খাতা দুটি উদ্ধার করি। খাতা দুটির নাম বঙ্গবন্ধু নিজেই দিয়ে গিয়েছিলেন। খাতা দুটির মলাটের ওপর লেখা ‘থালা বাটি কম্বল, জেলখানার সম্বল’। প্রশাসনের বিপক্ষে লেখার জন্য খাতা দুটি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

বঙ্গবন্ধুর কারারুদ্ধ দিনগুলোর স্মৃতিমন্থন করার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, মা জেলখানায় যাওয়ার সময় বাবার জন্য বই আর খাতা নিয়ে যেতেন। কিছুদিন পর মা গিয়ে সেগুলো বাসায় নিয়ে এসে সযত্নে রেখে দিতেন। খাতাগুলো খুঁজে পাওয়া ছিল অদ্ভুত ব্যাপার। এগুলো আমরা দেখি তা বাবা-মা কেউই চাইতেন না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। আমরা দুবোন দেশের বাইরে ছিলাম। দীর্ঘ ছয় বছর পর যখন দেশে ফিরি, তখন আমাকে তো ধানম-ির বাসায় ঢুকতেই দিতে চায়নি। আমি বাসায় ঢুকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। বাসায় ঢুকে আমি সে সময় শুধু বাবার লেখা সেই খাতাগুলোই নিয়ে আসি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যা হোক, শেষ পর্যন্ত আমরা বইটি প্রকাশ করতে পেরেছি। তিনি বলেন, খাতা দুটিতে বঙ্গবন্ধু যেভাবে লিখেছেন, আমরা সেটি হুবহু বই আকারে প্রকাশ করেছি।

বঙ্গবন্ধুর কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, একজন মানুষ দুটি দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্যও তার অবদান ছিল অনন্য। আবার যখন তিনি উপলব্ধি করলেন, পাকিস্তানের শোষণ-নিপীড়নে বাঙালি জাতি অতিষ্ঠ, তখন বাংলাদেশে স্বাধীনতার ডাক দিলেন এবং একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠন করলেন।

বঙ্গবন্ধুর লেখা নিয়ে আরও বই প্রকাশ হবে জানিয়ে বঙ্গবন্ধু মোমোরিয়াল ট্রাস্টের সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, সে সময় এসবির বহু রিপোর্ট আমরা নিয়ে এসেছি। তারা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কী রিপোর্ট করেছে, তা নিয়েও আমরা কাজ করছি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১০০টি অভিযোগ করা হয়। এখান থেকে ২টি অভিযোগ নিয়ে মামলা হয়। আমরা এগুলো নিয়েও বই প্রকাশ করব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার (বঙ্গবন্ধু) খাতায় ৬৬ ও ৬৭ সালে দুবার উল্লেখ করা হয়েছে ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়’। বঙ্গবন্ধু কখনও ভয় করতেন না। দেশের জন্য, দেশের জনগণের জন্য তিনি কারাভোগ করেছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মদিন উপলক্ষে কারাগারের রোজনামচা-শীর্ষক তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সার্বিক সহযোগিতা ও তত্ত্বাবধানে এ বইটি প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। ৩৩২ পৃষ্ঠার এই বইটিতে ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর কারাগারের স্মৃতি স্থান পেয়েছে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *