আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ১৫ জুন ২০২৫, ইরান একাই লড়ছে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে ইরান এককভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও তার কৌশলগত মিত্র চীন ও রাশিয়ার দৃশ্যমান সহায়তা অনুপস্থিত। সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলায় তেহরানের সামরিক স্থাপনাসমূহ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার জবাবে ইরান সীমিত পাল্টা আক্রমণ চালালেও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সক্রিয় সমর্থন পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং তাইওয়ান সংকটের মধ্যে রাশিয়া ও চীন উভয়ই নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। ফলে ইরানের সাম্প্রতিক সংকটে কেবল কূটনৈতিক বিবৃতি ও প্রতীকী সমর্থনের বাইরে কোনো কার্যকর সহায়তা তারা দেয়নি। ফলে ইরান একাই লড়ছে।
চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা
-
চীন: ইরানের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও, চীন সম্প্রতি সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক জোরদার করেছে। ইরানকে নিয়ে বেইজিংয়ের সতর্ক অবস্থান আমেরিকা ও ইউরোপের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য বলে মনে করা হয়।
-
রাশিয়া: ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় রাশিয়া ইরানকে সামরিক সহায়তা (ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি) দিলেও, কূটনৈতিক স্তরে তেহরানকে পুরোপুরি সমর্থন দিচ্ছে না। মস্কো ইরানের সাথে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা চুক্তি করলেও পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছে না।
চীন ইরানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’ আখ্যা দিলেও এখন পর্যন্ত কেবল শান্তি ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। রাশিয়াও জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে, কিন্তু সরাসরি সামরিক বা প্রতিরোধমূলক সহায়তায় অংশ নেয়নি।
তেহরানে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—কৌশলগত এই জোট কি কেবল কাগুজে? ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা আশা করেছিলাম অন্তত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা গোয়েন্দা সহায়তা মিলবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান আজ একাই দাঁড়িয়ে আছে।”
ইরানের জনগণ ও নীতিনির্ধারকেরা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা বুঝে চলার আহ্বান জানাচ্ছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই একাকীত্ব ইরানের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলে পুনর্বিবেচনার আভাস দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণ:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক বলেন:
“চীন ও রাশিয়া উভয়ের স্বার্থ বর্তমানে নিজ নিজ অঞ্চলকেন্দ্রিক। রাশিয়া ইউক্রেন নিয়ে ব্যস্ত, আর চীন তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ চালাচ্ছে। ফলে ইরানকে সক্রিয় সামরিক সহায়তা দেওয়া তাদের জন্য কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।”
আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক নাভিদ কামালি (ইরান ভিত্তিক) বলেন:
“ইরানের এই নিঃসঙ্গতা দেখাচ্ছে, বাস্তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি স্বার্থনির্ভর। বন্ধুত্বের কথা থাকলেও সংকটকালে যে কেউ কৌশলগতভাবে পিছিয়ে যেতে পারে।”
ইরানের অবস্থান
ইরানের নেতৃত্ব বারবার বলেছে যে তারা “আত্মনির্ভরশীল” এবং কোনো মিত্রের উপর নির্ভর করে না। তবে, অর্থনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতার মুখে তেহরানের জন্য চীন ও রাশিয়ার সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব বজায় রাখতে হলে তাকে কূটনৈতিকভাবে আরও সক্রিয় হতে হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে চাপ অব্যাহত রেখেছে। চীন ও রাশিয়ার নিরপেক্ষতা ইরানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা তেহরানকে অন্যান্য দেশগুলোর (যেমন তুরস্ক, ভেনেজুয়েলা) দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করতে পারে।
সামনের দিনগুলো
ইরান যদি পরমাণু চুক্তি (JCPOA) পুনরুজ্জীবিত করতে না পারে অথবা চীন-রাশিয়ার কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পায়, তাহলে দেশটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। তবে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে ভবিষ্যতে মিত্রদের অবস্থান পরিবর্তনও হতে পারে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও জনমত:
তেহরানসহ অন্যান্য শহরে জনসাধারণের মাঝে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, “চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব যদি এটাই হয়, তবে এর বাস্তবতা কী?”
উপসংহার:
ইরান বর্তমান সংকটে বাস্তবিক অর্থেই একা লড়ছে। চীন ও রাশিয়ার ‘বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান’ এখন পর্যন্ত নীতিগত সীমাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব-নিকাশে নতুন করে পরিবর্তনের আভাস মিলছে।
