ইসরায়েল ইস্যুতে মার্কিন সামরিক সহায়তা ও অর্থনৈতিক ব্যয়

শেয়ার করুন:

মার্কিন সামরিক সহায়তা ও অর্থনৈতিক ব্যয়

  • সাম্প্রতিক সহায়তার পরিমাণ: ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ‘কস্টস অফ ওয়ার’ প্রকল্পের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বাবদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করেছে $২১.৭ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে ইয়েমেন, ইরান এবং অন্যান্য অঞ্চলে সংঘাতজনিত কার্যক্রমে আরও অতিরিক্ত $৯.৬৫ বিলিয়ন থেকে $১২.০৭ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে ।

  • দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা: ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন বৈদেশিক সামরিক সহায়তার সবচেয়ে বড় প্রাপক দেশগুলোর একটি। ২০১৯ সালে ওবামা প্রশাসনের সময়ে একটি ১০ বছরের চুক্তির আওতায় ইসরায়েলকে বার্ষিক $৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম বছরেই এই সহায়তা বেড়ে দাঁড়ায় $১৭.৯ বিলিয়ন ডলারে ।

  • অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের প্রসঙ্গ: আপনি ২০০১ সাল থেকে মার্কিন অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত না থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, ২০২১ সালে ইসরায়েলের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত ছিল। এই প্রসঙ্গটি ইসরায়েলের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেন আমেরিকান করদাতারা তার সামরিক ব্যয় বহন করবে, সেই প্রশ্নটিকেই সামনে আনে।

সামরিক উপস্থিতি ও কৌশলগত জোট

মার্কিন সেনা ও অত্যাধুনিক অস্ত্র ইসরায়েলে মোতায়েনের কারণ নিয়েও আপনি প্রশ্ন তুলেছেন।

  • সেনা মোতায়েন: ইসরায়েলে THAD (Terminal High-Altitude Area Defense) অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেম পরিচালনার জন্য মার্কিন সেনা মোতায়েনের কথা আপনি উল্লেখ করেছেন। এটি দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতার একটি অংশ, যা ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে এবং সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় সহায়তা করে। এই মোতায়েনকে ইরানসহ আঞ্চলিক শক্তির হুমকি মোকাবিলায় একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয় ।

  • যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ: সমালোচকদের মতে, এই ধরনের সমর্থন কেবল ইসরায়েলকে রক্ষাই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার অংশ। তবে, আপনার বক্তব্যে যেমন বলা হয়েছে, অনেকের মতে এই সমর্থন আমেরিকার নিজস্ব স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলের স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দেয় এবং অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে ।

‘ইহুদি লবী’ AIPAC-এর রাজনৈতিক প্রভাব

আপনার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো AIPAC-এর মাধ্যমে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের দাবিটি।

  • প্রভাবের পদ্ধতি: আপনি উল্লেখ করেছেন যে আইনপ্রণেতারা AIPAC-এর কাছ থেকে “আইনিভাবে ঘুষ পান” অথবা “ভীত” হয়ে কাজ করেন। রাজনৈতিক প্রচারণায় অর্থায়নের ক্ষেত্রে AIPAC-এর ভূমিকা একটি সুবিদিত বিষয়। সংগঠনটির একটি অধিভুক্ত সুপার প্যাক (Super PAC) কংগ্রেসের নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে। সাম্প্রতিক নির্বাচনচক্রে, AIPAC-সম্পর্কিত সুপার প্যাকটি তাদের দৃষ্টিতে ইসরায়েল-বিরোধী প্রার্থীদের পরাজিত করতে $৯৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ করেছে।

  • সাম্প্রতিক ঘটনা ও প্রভাবের সীমাবদ্ধতা: তবে, AIPAC-এর এই প্রভাব সবসময় সফল হয় না, বরং কখনও কখনও তা ব্যাকফায়ারও করে। ২০২৬ সালের নিউ জার্সির একটি প্রাইমারি নির্বাচনে দলটি প্রায় $২.৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করে একজন মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী টম মালিনোস্কির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়, যিনি ইসরায়েলের পক্ষপাতী হয়েও সামরিক সহায়তার শর্ত দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। তাদের এই প্রচারণা উল্টো ইসরায়েলের তীব্র সমালোচক এবং যাকে গাজায় “গণহত্যা” চালানোর অভিযোগকারী একজন বামপন্থী প্রার্থী আনালিলিয়া মেজিয়ার জয়ের পথ সুগম করে দেয়। এই ঘটনায় ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে AIPAC-এর প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং অনেকে মনে করছেন, দলটির কৌশল এখন “শতভাগ আনুগত্য” দাবি করে, যা অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়।

  • “ব্ল্যাকমেইলের সম্ভাবনা”: আপনার বক্তব্যে AIPAC-এর দ্বারা আইনপ্রণেতাদের ব্ল্যাকমেইলের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। এটি একটি গুরুতর অভিযোগ যা প্রমাণ করা কঠিন। তবে, প্রচারণায় অর্থায়ন এবং নির্বাচনী হুমকির মাধ্যমে প্রভাব খাটানোর বিষয়টি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতা।

আপনার বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রতিক্রিয়া

আনা কাসপারিয়ানের এই বক্তব্য একটি বৃহত্তর বিতর্কের অংশ। তিনি তার অবস্থানের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত এবং সমালোচিতও হয়েছেন।

  • টেলিভিশন বিতর্ক: একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক মুখপাত্রের সাথে তর্কের সময় তিনি তাকে “সন্ত্রাসী নোংরা” বলে সম্বোধন করেন, যা ব্যাপক আলোচিত হয় -1। এর মাধ্যমে তার এই বক্তব্যের প্রতি তার অনমনীয় অবস্থানই ফুটে ওঠে।

  • ইহুদি-বিদ্বেষের অভিযোগ: তার এই ধরনের বক্তব্যের জন্য তাকে “ইহুদি-বিদ্বেষী” বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে, তিনি নিজে এই অভিযোগ অস্বীকার করে স্পষ্ট করেছেন যে তার সমালোচনা ইহুদি ধর্ম বা ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং ইসরায়েল সরকার এবং আইডিএফ-এর (IDF) নীতির বিরুদ্ধে। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে “Jews” শব্দটি ব্যবহার না করার কথা উল্লেখ করেছেন ।

  • জনমতের পরিবর্তন: তার বক্তব্যে যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে, তা হলো মার্কিন জনমত, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, ইসরায়েল ইস্যুতে ক্রমবর্ধমান বিভক্তি। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এখন ফিলিস্তিনিদের চেয়ে ইসরায়েলের প্রতি বেশি সমর্থন জানান, যা যুদ্ধ শুরুর সময়ের ৪৭ শতাংশ থেকে অনেক কম। এমনকি তরুণ রিপাবলিকান এবং ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টানদের মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন কমছে।

উপসংহার:  মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের একটি জটিল ও বিতর্কিত দিককে সামনে এনেছে। AIPAC-এর মতো লবি গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব একটি বাস্তবতা, যা মার্কিন নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দেখায় যে এই প্রভাব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে এবং মার্কিন সমাজ ও রাজনীতিতে ইসরায়েল ইস্যুতে মতবিভাজন বাড়ছে। ইসরায়েলকে দেওয়া বিপুল সামরিক সহায়তা এবং তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দিন দিন জোরালো হচ্ছে।

শেয়ার করুন: