Sunday, জুলাই ১৪, ২০২৪

ভারতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতার একদিন –ড.হোসনে আরা বেগম

ভারত বর্ষের রাজধানী দিল্লিতে একটানা অবস্থানকালে পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সবাই সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও ৫ জুলাই রোজ শুক্রবার মনটা আনচান করছিল বাংলাদেশে ফেরার জন্য। কারণ ঐ দিনটা ছিল সিডিউলের কর্মবহির্ভূত। আমার একান্ত সচিব সার্বিক মোঃ ফেরদৌস রহমান ও আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী সাবেক টিএমএসএসের কোষাধ্যক্ষ আয়শা বেগমকে নিয়ে ভারতের বিখ্যাত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজভুক্ত হুমায়ূন টম, ঈসা খাঁ টম, আকবর দি গ্রেটের লাল কেল্লা পরিদর্শনের জন্য হুমায়ুন টমের গেটে এসে মানব প্রাচীর তুল্য সারিতে দাঁড়িয়ে চল্লিশ রুপি করে তিনটি টোকেন নিলাম। ঢুকতে নিতেই সেন্সর গেইট এর ইশারায় একজন গেট রক্ষক এসে বললেন, তোম লোক কা ইন্ডিয়ান সিটিজেন নেহি, তোমারা টিকিট সিক্স হান্ড্রেড রুপি পড়ে গা। ওয়ান হান্ড্রেড টুয়েন্টি রুপি গাচ্ছা হোগ। বললাম, আমরা বাংলাদেশি, ভারত কা ক্লোজ ফ্রেন্ড হ্যায়, সার্ক বর্ডার আন্দর হ্যায়। তখন গেইট রক্ষকগণ করুণার দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে পূর্বের দেওয়া একশত বিশ রুপি সহ আঠারোশো রুপিতে তিনটি ফরেনার কুপন দিলেন। শুক্রবার দিন ভারতে ছুটি নাই, কর্ম দিবস। তবুও গেইটে মানুষের চাপ ও গেইট মানি কালেকশন ঈর্ষনীয়। তবে অভারতীয়/বিদেশিদের প্রবেশ গেইটে তেমন চাপ ছিল না।
গরমের মধ্যেই আমরা কয়েকটি বিস্ময়কর গেইট ও প্রশস্ত প্রাচীর পেরিয়ে পরাক্রমশালী মুঘল সম্রাজ্যের অধিপতি হুমায়ুনের সমাধি,বহু কারুকার্যপূর্ণ ভবনের প্রথম তলায় উঠে চতুর দিকের বিচিত্র বৃহৎ প্রশস্ত মসজিদের মেহেরাব তুল্য অবিরত কামরা বিশিষ্ট বিশাল আকারের প্রাচীর ঘিরিত ৩০ একর জমির উপরিস্থ টম সমাধি দেখতে থাকলাম।
লাল কেল্লার আকবর দি গ্রেট সহ মুঘল শাসনামলের কীর্তি যেখানে কহিনুর ছিল, সেই সুরম্য সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত অভাবনীয় কারুকার্যপূর্ণ অট্টালিকা, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস সুরম্য ভবনসমূহের সম্মুখ চত্বরে ইতিহাস ভিত্তিক প্রামাণ্য সিনেমায় মুসলমানের বাহাদুরী বিলাস প্রত্যহ প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রায় ২৫০ একর লাল কেল্লা রেডফোর্টে প্রাচীর ভবন ও বৃক্ষাদিযুক্ত অসংখ্য চত্বর খুবই দর্শনীয় এবং খুবই মনোমুগ্ধকর। বগুড়ার টিএমএসএস বিনোদন জগতের মধ্য স্থাপিত ডক্টর এনামুল হক আর্ট এন্ড কালচারাল একাডেমির মুক্ত চিন্তার যথার্থ প্রকাশ বিষয়টি নিয়ে একবার পারিবারিকভাবে আমি ভালোই ঝাঁমেলায় পড়েছিলাম। অত্র একাডেমির সাবেক কিউরেটর প্রফেসর নজরুল আমার আত্মীয়, তিনি ব্যানার ফেস্টুন লেখুনীতে ডক্টর এনামুল হক আর্ট এন্ড কালচারাল একাডেমি সংক্ষপে DEACA এর বিশেষণ জাহিরের জন্য মুক্ত চিন্তার শুদ্ধ সংস্কৃতির নান্দনিক প্রতিষ্ঠান এ কথা স্লোগান হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন। তাই পরিবারের পক্ষ থেকে মুক্ত চিন্তার কথার ওপরে অনেক আপদ। আমার স্বামী প্রফেসর আনছার আলী তালুকদার পুত্রকে সঙ্গে নিয়েই আমার প্রতি রুষ্ট হয়ে বলছিলেন, চিন্তা ক্ষেত্র বিশেষে সীমিত ও পরিশীলিত হতে হবে, মুক্ত হওয়া যাবে না। মুক্ত চিন্তা নাস্তিক্যবাদের চেতনা। যেমন সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে এবং মাখলুকাত সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের আল্লাহ্ দয়ালু, সৃষ্টিকর্তার আল্লাহ্ দয়ালু না নির্দয়। মনে চিন্তার অবস্থান যদি মুক্ত হয়, মন এই ধরনের সীমিত ও নিষিদ্ধ চিন্তার বিষয়গুলো নিয়ে অস্থির থাকবে। তাই এই ইস্যুগুলো মনে থাকলেও মুখে আনা যাবে না। পরদিন প্রত্যুষকালীন হাঁটার সময় প্রফেসর নজরুলকে এই ইস্যু জানালে তিনি বললেন, মামী “মনে যা মুখে তা প্রকাশ না করা তো মুনাফেকির উপাদান”। আপনার তালুকদার পরিবারের সংরক্ষণশীল মৌলবাদী চেতনাপুষ্টর জন্যই তো বগুড়া জেলার সর্ববৃহৎ জমিদার মরহুম রফাতুল্লাহ্ তালুকদারের নাম বললে অনেকেই বলে উনার দইও খুব ভালো। অথচ আমার দাদার আপন ভাই রফাত গোয়াল তিনি রফাতুল্লাহ্ তালুকদারের একজন ক্ষুদ্র প্রজা থেকেও ক্ষুদ্র ছিলেন।
প্রিয় পাঠক,
বিশ্ব স্থাপত্য হুমায়ুন টমের উপরে বসে পারিবারিক কাহিনি ভাবার কারণ হচ্ছে মুক্ত চিন্তা মুখে আনলে কথিত ইসলাম প্রীতিগণের মধ্যে রোষানলে পড়তে পারি। তাই সীমিত আকারে বলতে চাই, মুঘল, নবাব, খান যারা পরাক্রমশালী সম্রাজ্যের অধিপতি, ৫-৮শ বছর পূর্বে নন-ডিজিটাল যুগে এই রুপ বিলাসবহুল ভোগ বান্ধব অট্টালিকা, প্রেয়সীর প্রেমে কবর, সমাধি তাজমহল, হুমায়ুন টম, ঈসা খাঁ টম, যতো ব্যয়বহুল বিলাস বাড়ি দেখছি, তাদের গড়া শিক্ষাগার, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাচ্ছি না। অথচ আমার বাড়ির অদূরে পাহাড়পুর বিহার, সোমপুর বিহার, জগদ্দল বিহার, হলুদ বিহার, মহাস্থান, পুণ্ড্রনগর বৌদ্ধ বিহার, ভাসুবিহার, বেহুলার বাসরঘর ইত্যাদি অসংখ্য অমুসলিম ধনাঢ্যদের নির্মাণকৃত শিক্ষাগার, গবেষণাগার, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমসাময়িক সাধনাগার, জ্ঞানার্জনাগার প্রকট প্রমাণক এখনও বিদ্যমান আছে। তবুও ভোগবাদী মুসলিম শাসকদের গর্বে গর্বিত আমরা মুসলমান আজও বিশ্বব্যাংকে নাই, জাতিসংঘে নাই, নাসাতে নাই, ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনে নাই, নাই কোনো আনবিক, পারমানবিক প্রস্তুত কারখানাতে ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিস্ময়কর রোবটিক, নন-রোবটিক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্টি যন্ত্র তৈরির কারখানাতে নাই। সমুদ্রে এক লোটা পানি দিয়ে সমুদ্রকে ফেঁপে তোলার অসম্ভাব্য  মানসিকতায় বিশ্বমানব সম্পদ উন্নয়নের নিমিত্তে তৃর্ণমূল থেকে গড়ে ওঠা  টিএমএসএস এর পক্ষ থেকে পুণ্ড্র বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৪৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শতাধিক শর্টকোর্স প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালাতে গিয়ে নাকানিচুবানি খাচ্ছি। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহায়তা সামর্থগণের সাহায্য থেকে সন্দেহই বেশি।
সেদিন পুত্র তালুকদার মোঃ আলী হায়দার বললেন, জ্ঞানার্জনকে ইসলামে ফরজ বলা হলেও সেই ফরজ আদায় হয় না। জ্ঞান যে কত বড় আয়ের উপাদান তা আমরা বুঝি না। টিএমএসএস ক্যান্সার সেন্টার, টিএমএসএস হার্ট সেন্টার ও বায়ো মলিকুলার ল্যাবে অর্ধসহস্র কোটি টাকা ব্যয়ে যে যন্ত্রপাতিপাতিগুলো ক্রয় করা হয়েছে, তার সবগুলোর মেটারিয়াল ভেল্যু অর্থাৎ দ্রব্য হিসেবে বিক্রি করলে এক কোটি টাকা হবে কি না তা সন্দেহ। এখানে চারশত নিরানব্বই কোটি টাকায় হলো জ্ঞানের মূল্য। দেশকে, জাতিকে ধনী-সমৃদ্ধ-উন্নত করার জন্য প্রাকৃতিক খনি পাওয়ার দরকার নাই। জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর তুল্য জ্ঞান, প্রযুক্তিতে পারদর্শী করে দেশকে আমদানি নির্ভরতা থেকে রপ্তানি করার বহুমুখী শক্তি বাড়াতে হবে। জনবহুল বাংলাদের মানুষের মস্তিষ্ককে জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান সংরক্ষণ, জ্ঞানের বহুমুখী নৈপুণ্য ব্যবহার অতি আবশ্যিক হতে হবে। এজন্যই সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মিলিত সদিচ্ছা অর্থাৎ বাংলাদেশের আওয়ামীলীগ কেন্দ্রিক ব্যক্তিবর্গ ও বিএনপি কেন্দ্রিক ব্যক্তিবর্গগণের বৈরিতা নয় বন্ধুত্ব বাড়াতে হবে। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষগণের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা থাকতে হবে। সাধু সাবধান!

ধন্যবাদান্তে–
অধ্যাপিকা ড.হোসনে আরা বেগম
নির্বাহী পরিচালক, টিএমএসএস।

একই রকম সংবাদ

বিজ্ঞাপনspot_img

সর্বশেষ খবর