Sunday, জুলাই ১৪, ২০২৪

মনোহারি বিক্রেতা রুহুল আমিনের জীবন সংগ্রাম 

এ কে খান :

পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের ভাউডাঙ্গা গ্রামের দিয়ারপাড়া মহল্লার মৃত গোপাল প্রামানিকের ছেলে রুহুল আমিন দোকানদার। সুদীর্ঘ ৫৫ বছর স্টেশনারি, মনোহারী, চুরি মালা ও বিভিন্ন রকমের কাপড় শাড়ি, লুঙ্গি, সুচ, সুতা, চাদর, শাড়ী কাপড়,ছায়া, ব্লাউজ ইত্যাদি বিক্রয় করতেন। স্বাধীনতার দু’বছর পর থেকে তিনি এই ব্যবসা শুরু করেন। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের রয়েছে তাদের। জমি জমা বলতে পৈত্রির সূত্রে পাওয়া সামান্য কয়েক শতক জমি। তিনি ২২ বছর বয়সে বিয়ে করার পর এ ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমান  তার দুই ছেলে সংসার থেকে আলাদা। তাদের অবস্থা শোচনীয় বিধায় তার বাবা-মা কে ভরণ পোষণ দিতে পারে না। তার মেয়ে দুজনকে বিয়ে দিয়েছে। তিনি এখন খুবই কঠিন অবস্থায় সংসার চালান। তিনি ফেরি করে ব্যবসা চালাতেন। যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন পর্যন্ত এ ব্যবসা চালিয়ে যাবেন বলে তিনি জানান। কারন হিসাবে তিনি সুদীর্ঘ সময় এ ব্যবসা করে বিভিন্ন গ্রামের মানুষের সাথে এবং ব্যবসার প্রতি মায়া মমতা হওয়ায় এ ব্যবসা তিনি করবেন। তার সংসার খারাপ হলেও তিনি সরকারি এখন পর্যন্ত কোনো রকম সুযোগ-সুবিধা পান নাই। সরকারের কাছে তিনি বয়স্ক ভাতার আবেদন করছেন। এমনকি তিনি কোন প্রকার কার্ড নাই। বয়সে প্রায় ৭৫ হলেও অন্য পোশাকে নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত আছেন।  কারণ অন্য পেশায় গেলে অনেক টাকা পয়সা প্রয়োজন। ব্যবসা শুরু থেকে তিনি প্রথমেই আলতা, স্নো, পাউডার, মহারানী স্নো, তিব্বত স্নো, আলতা, সুচ, সুতা,  ইত্যাদি বিক্রি করতেন। ব্যবসাট ছোট হলেও তিনি আনন্দের সাথে  চালাতেন। কিন্তু যুগের পরিবর্তনে তিনি অন্য পেশায় আর যেতে পারেন নাই। আগে গ্রাম্য বধূরা তার কাছ থেকে আলতা, তিব্বত স্নো, পাউডার, চুরি, মালা, আয়না চিরুনি, তিব্বত কদুর তেল, নেলপালিশ, লিপিস্টিক, টিপ, নারকেল তেল কিনতেন, কিন্তু যুগের পরিবর্তন হওয়ার পরে গ্রাম্য বধুরা এখনো শহর কিংবা উপ শহরে গিয়ে এগুলো কেনেন। তিনি স্টেশনারি ব্যবসা গ্রামের  লোকজনের সাথে উঠা বসা চালচলনে আনন্দের সহিত করতে। তিনি জানান তাকে সামাজিকভাবে সহযোগিতা করার কেউ খোঁজ খবর নেন না। তিনিও কোন লোকের ধার ধারেন না। তিনি অল্প পুঁজি করে সংসার পরিচালনা করেন। তিনি ব্যবসাটি খুশি মনে করেন। বিব্রত হন না তিনি। সাইকেলে করে গ্রামে গ্রামে ঘুরেফিরে এগুলি বিক্রি করতেন। এগুলি প্রায় ২০ বছর যাবত তিনি বিক্রয় করতেন। পরবর্তীতে ২০ বছর পর তিনি ফেরি করে জামা, কাপড়, ব্লাউজ, চাদর, বিভিন্ন রকমের বেডশীট, সুই সুতা, ইত্যাদি বিক্রি করেন করা শুরু করেন। তিনি পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা, সাদুল্লাপুর, চর্তারাপুর, আতাইকুলা, পাবনা শহর সহ শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় এগুলো তিনি ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। কালের বিবর্তনে গ্রাম্য বধূরা সামান্য কিছু কিনতে গেলেও শহর কিংবা শহরের দোকান থেকে কেনেন। এজন্য ব্যবসাটি তার ছোট হলেও মনের সুখে শান্তিতে করেন। তিনি বলেন এ ব্যবসা কমে গেলেও আমার সারা জীবন আমি এ ব্যবসা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব। তিনি বলেন আমার জমি, জমা বলে কিছু নাই। ছেলেমেয়েরা ভরণ পোষণ দিতে পারে না। কারণ তাদের সংসার বড় হয়ে গেছে। প্রতিদিন দেড়শ দুইশ টাকা করে ইনকাম করে যা পাযই তা দিয়ে সংসার পরিচালনা করি। শুরুর দিকে স্নো পাউডার, আলতা, তিব্বত, মহারানী বিক্রি করতাম। বর্তমান গ্রামে এগুলা আর চলে না। এ পেশা বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে সাইকেল নিয়ে সকাল সাতটা থেকে বেলা ৬ টা পর্যন্ত দ্বারে দ্বারে ঘুরে কাপড়, চোপড়ের ব্যবসা করছি। বর্তমানে সামান্য আয়ে দুজনের সংসার কোন মত সংসার পরিচালনা করছি। একটা দুঃখ রয়ে গেছে অসুখ-বিসুখ হলে, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সুযোগ নাই। কারণ অনেক টাকা পয়সা লাগে, আমার ইনকাম সামান্য, সাধারনত ট্যাবলেট ও ঝাড়ফুঁক দিয়ে জীবন চালাই। আরেকটা কষ্ট রয়ে গেছে সামান্য আয় দিয়ে ভালো পোশাক আশাক কেনাতো দূরের কথা, ভালো খাবার জোটানো সম্ভব নয়। ঈদ পার্বণ এলে ভালো বাজার করাটাও আমার পক্ষে সম্ভব হয় না, কারণ পুঁজি অল্প আয় সামান্য। আমরা সমাজের কোন ব্যক্তির কাছে হাত পাতি না, অনেক দুঃখ কষ্ট হলেও নিজেরা তা চেপে রাখি। মহান আল্লাহর উপর ভরসা রেখে জীবন পরিচালনা করছি। দুজনেই নামাজ-কালাম পড়ি। আমার দু এক ওয়াক্ত বাদ গেলেও বাড়ির মানুষের বাদ যায় না। আমার একটা আশা রয়েছে, হজ করার ইচ্ছা আছে, সমাজের কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি আমাকে হজে পাঠাতো আমার আশা পূরণ হতো। ফলে আমার মনের বাসনা পূরণ হতো। সমাজের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে আমি কিছু বলতে চাই, আপনারা বসে না থেকে বেকার না হয়ে, ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র কাজ শুরু করেন। জীবন সংসারে ক্ষুদ্র হলেও আয়ের দরকার আছে। সৎভাবে জীবন চালানোর মধ্যে খুবই আনন্দ পাওয়া যায়।

একই রকম সংবাদ

বিজ্ঞাপনspot_img

সর্বশেষ খবর