Wednesday, জুন ১৯, ২০২৪

ঘাড় ব্যথা

প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার

আমাদের সমাজের প্রায় প্রত্যেক মানুষই জীবনের কোন না কোন সময় ঘাড় ব্যথায় ভুগে থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে ৯০% পুরুষ ও ১২% মহিলারা ঘাড় ব্যথায় ভুগে থাকেন। প্রত্যেক বছর ১০০০০০ জন জনসংখ্যার মধ্যে ১৬৩৯ জন অন্যান্য ব্যথার সাথে ঘাড় ব্যথায় ভুগে থাকেন। সুপ্রিয় পাঠক, এ পর্বে আমরা জেনে নিই ঘাড় ও শিরদাঁড়া কষ্টের কিছু কারণ এবং ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতি ও ঘাড় ব্যথার প্রতিরোধ সম্পর্কে।
৫৫ বছর বয়স্ক মোঃ রশিদ, কাজ করেন ল্যাব টেকনোলজিস্ট হিসেবে উত্তরার একটি হাসপাতালে। তিনি গত ৫ বছর যাবৎ তার ঘাড়ের বাম পাশে ব্যথায় ভুগছেন। তিনি দেশে ও দেশের বাইরে চিকিৎসা নিয়েছেন। তার ব্যথা ঘাড় থেকে বাহুতে, বুকের সামনে এবং বাম হাতের আঙ্গুল পর্যন্ত আসে। মাঝে মাঝে তার হাতে ঝিন ঝিন, পিন পিন করে। ফিজিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেল- তিনি ডান ও বাম দিকে সালাম ফিরাতে পারেন না। মাথা পিছনের দিকে সম্পূর্ণ নিতে পারেন না এবং ব্যথা হয়। তার থুথুনি এবং মাথা কিছুটা সামনের দিকে এসেছে। ঘাড়ে দুপাশের নেক মাসল টেন্ডার ও শক্তি কম।
আসুন জেনে নেই ঘাড় ব্যথার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্পর্কে- মাসল ক্রাম্পস, নেক স্প্রেইন, ফ্যাসেট জয়েন্ট ব্যথা, অস্টিওপরোসিস, স্পাইনাল স্টেনোসিস, স্পনডাইলোসিস, স্পনডাইলোলিসথেসিস, স্কোলিওসিস, বালজিং ডিস্ক, ডিজেনারেটিভ ডিস্ক ডিজিজ, টেনশন হেডেক, অ্যাঙ্কালোজিং স্পনডাইলাইটিস, নার্ভ পেইন, রাই নেক, সার্ভাইক্যাল রুট পেইন, হুইপ্লাস ইঞ্জুরি।
ঘাড় ব্যথার চিকিৎসা শুরুর পূর্বে রোগের বিস্তারিত ইতিহাস জানা দরকার এবং সে অনুযায়ী ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন প্রয়োজন। আমি মনে করি মোঃ রশিদকে সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা করলে তার ব্যথা উপশম হবে। এই রোগীর সকল কষ্টের মূল কারণ মাংসের দূর্বলতা, লিগামেন্টের অসুস্থতা, নেকের কার্ভেচারের পরিবর্তন এবং সি৫-সি৬ ও সি৬ সি৭ ভার্টিব্রার মধ্যে স্পেস বা গ্যাপ কমে যাওয়া এবং সর্বপরি মাসল ইমব্যালেন্স যা তাহাকে কাজরে সময় এন্টিরিওর হেড পোশ্চার তৈরী করে।
একজন ফিজিওথেরাপিস্ট এর চিকিৎসার লক্ষ্য ঠিক করেন রোগীর কোন স্ট্রাকচারে সমস্যা তার উপর ভিত্তি করে। এই রোগীর ক্ষেত্রে প্রতমেই খুব সুন্দর করে সফট টিস্যু মোবিলাইজেশন করতে হবে। তারপর মেনুয়্যাল থেরাপর মাধ্যমে তার পোশ্চার ঠিক করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে স্ট্যাবেলাইজিং এক্সারসাইজের মাধ্যমে এই কারেকশন ধরে রাখতে হবে। তার সঙ্গে লো-লেজার থেরাপি, আল্ট্রাসাউন্ডথেরাপি ব্যবহার করতে হবে। ওয়াক্সপ্যাক দিয়ে তার ঘাড়ে স্ট্রোকিং করে দিতে হবে। এরপর কাইনোসিওলজি বেজ্ড এক্সারসাইজের মাধ্যমে নেক ও আশেপাশের মাসলের শক্তি বাড়াতে হবে।
ঘাড়ের ব্যথা প্রতিরোধ, চিকিৎসার চেয়ে অনেক উপকারী। যেমন- সার্ভাইক্যাল কলার ব্যবহার করার সময় সতর্কতা মেনে চলতে হবে। কারণ কলার ব্যবহার করলে অনেক সময়ই নেকের বা ঘাড়ের মবিলিটি কমে যায়। মবিলিটি কমে গেলে বিভিন্ন প্রকার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, যেমন- নরম টিস্যুগুলো খাটো এবং দুর্বল হয়ে যায়। এছাড়া জয়েন্ট, সাইনোভিয়াল ফ্লুইড, কার্টিলেজ ও হাড়ের উপরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যেমন- মাংস দুর্বল হয় যাহা ঘাড়ের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। সঠিকভাবে ঘুমানো, কম্পিউটার-এ কাজ করার সময় যেন কম্পিউটার স্ক্রীন এবং আই লেভেল সঠিক থাকে। একই অবস্থায় বেশিক্ষন (৩০মিনিট) কাজ না করা, কখনই যেন মাথা ও চোয়াল(চিন) কাঁধ থেকে সামনে চলে না আসে। কাজের মাঝে ভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। সঠিক ভঙ্গিতে ফোনে কথা বলা এবং কান এবং কাঁধের মাঝে টেলিফোন ব্যবহার করা যাবে না, প্রচুর পানি পান করা, হাতে ওজন ব্যবহার করার সময় সঠিক নিয়ম মেনে চলা, মাথা- ঘাড় ও কাঁধের সঠিক ভঙ্গি মেনে চলা, ঘাড়ের মাংসের ট্রিগার পয়েন্ট রিলিফ করা, হুইপ্লাস প্রতিরোধ করা, প্রতিদিন ঘাড়ের মাংসের নিয়মিত স্ট্রেসিং ও স্ট্রেন্দেনিং করা।

খাদ্য তালিকায় একটু পরিবর্তন আনতে হবে যেমন- প্রচুর পানি খেতে হবে, দিনে ২ গ্লাস দুধ- খাবরের ১ ঘন্টা পূর্বে অথবা খাবারের ২ ঘন্টা পরে দুধ খাবেন। দুধের বিকল্প হিসেবে তিল ভর্তা খেতে পারেন। গরুর কলিজা, প্রতিদিন ১টি করে পূর্ণ সিদ্ধ ডিম-এর সাদা অংশ, পনির, ১ চা-চামচ আঁদার রস ও ১ কোয়া রসুন নিয়মিত প্রতিদিন খেতে হবে। সুপ্রিয় পাঠক, আপনারা যারা এই রোগে ভুগছেন তারা উক্ত চিকিৎসার মাধ্যমে আশা করি দ্রুত আরোগ্য লাভ করবেন।

আমরা বিভিন্ন গবেষণা পড়ে জানতে পেরেছি যে, এখনও এমন ঔষধ তৈরি হয় নাই যে ঔষধ খেলে আপনার মাংস পেশী লম্বা হবে, শক্তিশালী হবে এবং আপনার জয়েন্ট মবিলিটি বেড়ে যাবে এবং আপনার এন্টিরিওর হেড পোশ্চার করেকশন হবে। মনে রাখবেন, ফিজিওথেরাপি উক্ত অসুবিধার চিকিৎসার জন্য একমাত্র মেডিসিন। সুতরাং সম্পূর্ণ চিকিৎসা পেতে হলে আপনাকে সঠিক মোবিলাইজেশন, স্ট্রেচিং এবং স্ট্রেন্দ্রেনিং এর মতো চিকিৎসা করতেই হবে।

প্রফেসর ডা. আলতাফ সরকার
মাস্কুলোস্কেলিটাল ডিজঅর্ডারস বিশেষজ্ঞ

লেজার ফিজিওথেরাপি সেন্টার
৪৪/৮, পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা। ০১৭৬৫ ৬৬৮৮৪৬

একই রকম সংবাদ

বিজ্ঞাপনspot_img

সর্বশেষ খবর