এবিসি বার্তা

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

আলাউল হোসেনের গীতিকবিতায় গীতিময়তা

আলাউল হোসেনের গীতিকবিতায় গীতিময়তা
ড. জীবনকুমার সরকার

শুন্য দশকে লেখালেখির জগতে আলাউল হোসেনের নামটি অতি সুপরিচিত। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক তাঁর। লেখাপড়াও করেছেন সাহিত্যেই। সাংবাদিকতা ও কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিরলসভাবে লিখে চলেছেন। তরুণ এই কবির লেখার বিষয়-ভাবনা, বুনট-বর্ণনা একেবারেই তাঁর নিজস্ব। আলাউল হোসেনের সর্বশেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম ‘কবিতার আত্মহনন’। এই কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে তাঁর একটি চেতনা-বলয় তৈরি হয়। বাংলা কবিতার বিষয়-চৈতন্যের ক্ষেত্রে তাঁর এ কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে এক নতুন সম্প্রসারণ বলা যায়। তিনি নিজেই কবিতায় বলেন- ‘কাব্যজমিন থেকে নিরবতা বিষয়ক কবিতা লিখে যাই…’ এরপর আর থেমে নেই আলাউলের সাহিত্যসাধনা। বর্তমানে গীতিকবিতা লেখা তাঁর নেশায় পরিণত হয়েছে বলা যায়।
২০০৩ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে পাবনার বেড়া আলহেরা একাডেমিতে শিক্ষকতা পেশা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। এছাড়াও শিক্ষকতা করেছেন কাশিনাথপুর আব্দুল লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে ও ঢাকায় ন্যাশনাল আইডিয়াল কলেজে। কাশিনাথপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন ৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- স্কাইলার্ক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তর), কাশিনাথপুর বিজ্ঞান স্কুল (মাধ্যমিক স্তর), ওয়েসিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (ইংরেজি মাধ্যম) ও কাশিনাথপুর বিজ্ঞান কলেজ (উচ্চ মাধ্যমিক স্তর)। বর্তমানে পাবনার বেড়া উপজেলার মাশুন্দিয়া-ভবানীপুর কেজেবি ডিগ্রি কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি সাংবাদিকতা করছেন ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় স্থানীয় প্রতিবেদক হিসেবে।
তাঁর সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে যতটুকু জানা যায়, আলাউল হোসেন ছোটবেলায় গায়ক হতে চেয়েছিলেন। বাল্যকালেই গানের চর্চা শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন- গাওয়া নয়, লেখার প্রবণতায় আটকে পড়েছে তাঁর জীবনের সুতো। তাই তো সেই কৈশোরে লেখালেখির শুরুতেই কবিতা ও গান রচনার প্রতি মত্ততা তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে। কবি, গীতিকার, সাংবাদিক ও শিক্ষক আলাউল হোসেন সমকালে পাবনার সাহিত্যাঙ্গনে অতি পরিচিত একটি নাম। পাবনা জেলার কবিতা ও গল্পকারদের নিয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাও রয়েছে। গবেষক হিসেবে জেলায় ইতোমধ্যে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন। সম্পাদনাও করেছেন বেশ কিছু ছোটকাগজ ও শিল্প-সাহিত্যের পত্রিকা। ছোটদের নিয়েও কাজ করে চলেছেন। নিজ এলাকায় রাস্তার পাশে ‘স্কাইলার্ক পথপাঠাগার’ গড়ে তুলে সারাদেশে আলোচিত হয়েছেন। নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন স্থানীয় বেশ কিছু শিল্প-সাহিত্য-বিকাশ ও জাতির মনন সাধনার প্রতিষ্ঠানে। বস্তুত তিনি হলেন শিল্প-মননের উদ্যোমী ও সাহসী একজন লিডার।
কবিতা দিয়ে সাহিত্যে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও প্রবন্ধ ও সমালোচনায় তাঁর হাত বেশ পাকা। দেশের প্রথম শ্রেণির কিছু জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত কলাম ও ফিচার থেকেই এ তথ্য জানা যায়। তব্ওু তিনি গান লেখাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বেশি। আর সে গানগুলো গীত হচ্ছে এ প্রজন্মের প্রতিশ্রুতিশীল ও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীদের কণ্ঠে। তাঁর গানের কথায় মিশে থাকে আমাদের চাওয়া-পাওয়া, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের বাংলাদেশ।
গীতিকবিতার নির্মাণশৈলীতে আলাউল হোসেন উপমা আর ঐতিহ্যসমৃদ্ধ আধুনিক কবি। শব্দ ব্যবহারের দক্ষতায়, উপমা-রূপকের মুন্সিয়ানায়, চিত্রকল্পের পরিকল্পনায় তিনি নাগরিক বৈদগ্ধের অধিকারী। তিনি তাঁর গানে যেন একটি কাহিনী খুঁজে নিতে চান। শব্দকে ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দেবার চমৎকারিত্ব, পঙক্তিকে রহস্যময় করে তোলার কুশলতা এবং ছন্দ পতনকে প্রশ্রয় দিয়ে ছন্দ প্রয়োগের অনায়াস দক্ষতা তাঁর গীতিকবিতার শরীরকে করেছে কারুকার্যময়।
আলাউলের নাগরিক-মন সময় পেলেই গৃহ-পলাতক বালকের মতো গ্রামীণ নিসর্গের বুকের ভেতরে মিশে যায়। লোকজ জীবন ও সংস্কৃতি থেকে তুলে আনেন তাঁর কবিতার উপকরণ-উপমা-রূপক-চিত্রকল্প। এ বিষয়ে তাঁর কিছু কবিতা বারবার ধাবিত হয় মরমি বাউলের প্রতি-সেখানে উঠে আসেন লালন-হাসনের মতো মহাকালের চিরায়ত মরমি মহাজন। লোকভুবনের গানে যাঁরা বাঙালির মনকে উদাস-উতলা করে তোলেন, সেই আব্বাসউদ্দীন ও আব্দুল আলীমও তাঁর কবিতার সঙ্গে মিশে যান। তাঁর কবিতায় বাউল ও লোকজ ভূবনের কথা উচ্চারিত হয়েছে। এ থেকে বেশ বোঝা যায়- আলাউল বাঙালি ঐতিহ্যের শিকড়-ছিন্ন কোনো কবি নন।
সহজবোধ্য এক চেতনার বিস্তার আছে আলাউল হোসেনের গানের কথায় ও সুরে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সংগীত ভূবনে বেশ কিছু হৃদয় হরণকারী গান জমতে শুরু করেছে। প্রকৃতি ও পরিবেশকে আপন অনুভবে সাজিয়ে তুলতে প্রস্তুত তিনি সংগীতের সুরের ধারায়।
গীতিকবিতার অঙ্গ সৌষম্য অবশ্যই সুন্দর ও সাবলীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। স্থায়ীর সাথে অন্তরা, অন্তরার সাথে সঞ্চারী এবং সঞ্চারীর সাথে আভোগের যৌক্তিক ভাব, অনুভব-অনুভূতিসমূহের যোগসূত্রতা বজায় থাকা বাঞ্ছনীয়। গীতিকার আলাউল হোসেনের গানে সেই যোগসূত্রতা খুঁজে পাওয়া যায়। একটি দেশের সংগ্রামকে এগিয়ে নেবার জন্য গীতিকবিতা অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ গীতিকবিতার ভাষা এখানে শান্তিপূর্ণ অথচ প্রতিবাদমুখর। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বায়ান্নর একুশকে মহিমান্বিত করেছে, কারণ একাত্তর একুশেরই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশ নামে একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে, যার রূপাভাষ জাতির চেতনায় ধরা দিয়েছিল ভাষা-আন্দোলনে।’ আমাদের দেশের গীতিকবিরা অসংখ্য দেশগান রচনা করেছেন। দেশের মাটির গন্ধে বিভোর হয়েছেন তাঁরা। গীতিকবিরা দেশকে সূর্যের আগে, নদীর ধারায়, পাখির গানে, ফসল শোভিত মাঠ আর প্রেরণার উৎস হিসেবেও দেখেছেন।
আলাউল হোসেন তাঁর দেশাত্ববোধক গানে চিত্রকল্পের ব্যবহারে যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, এক কথায় তা অসাধারণ। তাঁর কিছু দেশাত্মবোধক গানের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাব- কী সুনিপুণ দক্ষতায় তিনি তাঁর গানে কাব্যশৈলী ফুটিয়ে তুলেছেন-
আমার দেশের সাগর-নদী শাপলাফোঁটা বিল/নীলাকাশে উড়ে বেড়ায় ধূসর ডানার চিল/ঝিলের ধারে সাদা বকের মেলা/আমার এসব দেখেই কাটে সারাবেলা। (আমার দেশের সাগর-নদী)

দেশের প্রতি আলাউলের প্রেমের কথা বলাবাহুল্য। ‘জন্মভূমি’ নামের একটি ছড়া দিয়েই তাঁর লেখালেখি শুরু হয়েছিলো। তখন প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে কেবল হাই স্কুলে পদার্পন করেছেন। স্কুলের বাংলা শিক্ষকের পদ্য ক্লাসের প্রেমে পড়ে যান। তখন থেকেই ছড়া লেখা শুরু, তখন থেকেই মা-মাটি-দেশকে বুকে লালন করা শুরু করেন। দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি লিখেন-
শুধু রাতঘুমে নয়, অলস প্রহরে নয়/তোমায় স্বপ্ন দেখি সারাদিনমান/ওগো বাংলা মা/তোমাকে ভালোবাসি দিয়ে মনোপ্রাণ। (ওগো বাংলা মা)

এমন অনেক দৃশ্যকল্প তিনি দেখিয়েছেন তাঁর কবিতা-গানের প্রতিভাসে। তাঁর লিরিক্যাল থিম মিশেছে বাংলার পলিমাটির সাথে। তিনি তাঁর গানে তুলে ধরেছেন ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত গাঁথার বাংলাদেশ-
পলাশ শিমুল কৃষ্ণচূড়ায় শতকুসুমের ভরা জলসায়/আমরা পাইনি তো জীবনের সজীবতা/তাই এনেছি বাংলার স্বাধীনতা। (বাংলার স্বাধীনতা)

বাঙালি গীতিকবিরা শহীদদের প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। তেমনি আলাউল হোসেনও তাঁর গীতিকবিতায় লিখেছেন-
তুমি নাই তবু তুমি থাকবে চিরদিন/বাঙালি ভোলে নাই তোমার কীর্তি/ভুলবে না কভূ আদর্শ তোমার আপোষহীন। (তোমার কীর্তি)

আলাউল হোসেন তাঁর গানে বেছে নিয়েছেন প্রেম, নদী, নারী, জীবন, যৌবন, স্বদেশ ও সমাজকে। প্রেম বিশেষ করে নারীপ্রেম বিষয়ে আলাউল অসাধারণ অনুভূতিপ্রবণ। নারীপ্রেম প্রত্যাশায় তাঁর আকুতি সমর্পণে পরিণত হয়েছে-
স্বপ্ন যত এই বুকে সবই তোমায় ছুঁতে চায়/ইচ্ছে যত এই মনে সবই তোমায় পেতে চায়/ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে এ মন তোমায় দেখতে চায়। (ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে)

আলাউল হোসেন জন্ম-রোম্যান্টিক একজন মানুষ। তাঁর কবিতায় প্রবল রোম্যান্টিকতার বোধ ও সেই সঙ্গে নাগরিকচেতনা আবিষ্কার তাই সহজেই সম্ভব। প্রেমের নানা মাত্রা ও নারীর বিচিত্র রূপ নিয়েই মূলত তাঁর কবিতার শরীর নির্মিত-
স্বপ্নমাঝে কাছে এসে ভালোবাসো হেসে হেসে/ঘুম ভেঙে চোখ মেলে চেয়ে দেখি/চেয়ে দেখি তুমি নেই পাশে। (স্বপ্নমাঝে কাছে এসে)

জীবন জোয়ারে পেয়েছি তোমারে/তুমি চন্দ্র মল্লিকা/বনফুল তুমি হৃদয় কুমুদিনী/তুমি মোর বিথিকা/প্রেমের পরশে হৃদয় হরষে/তুমি মন মল্লিকা, ওগো তুমি মন মল্লিকা। (জীবন জোয়ারে পেয়েছি তোমারে)

কখনো আবার তাঁর কবিতার বিষয়-বলয়ে প্রবেশ করে প্রকৃতি, মৃত্যুচেতনা, নৈরাশ্য-নিঃসঙ্গতা, সমাজ ও স্বদেশও। আবার কখনো সুন্দরের অর্চনা ও স্মৃতির আবেশের দেখাও মেলে। শব্দ সচেতন কবি তিনি নির্বাচিত শব্দাবলি দিয়ে তাঁর কবিতার সৌধ তৈরি করেছেন। সেইসঙ্গে উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের কারুকাজে তা সজ্জিত করেছেন।
তোমার ওই চোখের নদীতে আমায় ভাসিয়ে/চলে গেলে দূরে-বহু দূরে/নির্জনে আনমনে চলে গেলে/শুধু রেখে গেলে কিছু স্মৃতি এ হদয় জুড়ে। (ওই চোখের নদীতে)

শব্দের কোনো পরাভাব নেই। শব্দ যেমন বিশ্বাস এবং অনুভূতির আদিমতা, তেমনি প্রত্যয়ের দৃঢ়তা; তেমনি জিজ্ঞাসার অস্থিরতা, তেমনি অসম্ভবের আয়োজন। চিত্রকর যেমন রং-রেখা দিয়ে এষার সন্ধান করেন, একজন কবিও তেমনি প্রতিদিনের বিশ্বে কল্লোলিত কলকণ্ঠের মধ্যে শব্দের ঔদার্য এবং সম্মোহন সন্ধান করেন-
তোমায় দেখেছি ওই আকাশের নীলিমায়/বেসেছি ভালো ওগো রেখেছি মনমোহনায়/যেও না চলে সখি কোনো দূর অজানায় (ওই আকাশে নীলিমায়)

বর্ষার আবেদন চতুর্মূখীন। বর্ষার অপরূপ দৃশ্য যেমন আমাদের মনে কুহক জাগায়, এর ঠিক উল্টোদিকে বিষাদও এনে দেয়। বর্ষা যেমন নতুন শিহরণে জাগরিক করে, আবার ডুবাতেও পারে তার উদারতায়। বর্ষার এই চতুর্মূখীনতার কারণেই বোধহয় অন্যান্য ঋতুর চেয়ে এর গ্রহণযোগ্যতা আরও বেশি। যার মায়াবী রূপ আমাদেরকে মোহিত করে, আন্দোলিত করে, শিহরিত করে। যার দর্শনে আমাদের হৃদয়-মন পুলকিত হয়। বিশেষকরে বর্ষার উথালি-পাথালি ঢেউ আমাদের হৃদয়-মনকে সিক্ত করে। কখনো আমরা হারিয়ে যাই স্বপ্নলোকে, আবার কখনো বা প্রিয়ার দর্শন লাভের জন্য আমরা উদগ্রিব হয়ে উঠি। আবার কখনো বা প্রিয়তমার বিচ্ছেদ ব্যথায় বর্ষার বৃষ্টির মতো চোখের পানি ঝরতে থাকে আমাদের কপোল বেয়ে। বর্ষাকে নিয়ে তাই লেখা হয়েছে প্রচুর প্রেম ও বিরহের কবিতা। এজন্যই বর্ষাকে বিরহের কাল বলা হয়। আলাউল হোসেনও তাঁর গীতিকবিতায় বর্ষাকে স্মরণ করেছেন এভাবে-
আজি রিমিঝিমি বরষাতে সারাদিন/লাগে ভারী মিষ্টি স্বপ্নরঙিন/ওগো মেঘ, যেও না চলে/থেকো মোর পাশে নিশিদিন। (রিমিঝিমি বরষাতে)

রিমঝিম ঝিম বৃষ্টি পড়ে/বৃষ্টি দেহে হাসছে/আমার মনের নৌকাগুলো/উঠোন জলে ভাসছে/তুমি পাশে থাকলে গো সই/দেখতে নানান রুপসে। (রিমঝিম ঝিম বৃষ্টি পড়ে)

বাস্তব জীবন ও জগৎ সম্পর্কে আলাউল হোসেন কিছুটা আশাবাদী হলেও হতাশামগ্নও অনেকটা। সীমাহীন শূন্যতায় আচ্ছন্ন, অতঃপর মৃত্যুচেতনায় প্রোথিত। আপন কবিসত্তা নিয়ে সংশয় ও সাহস দুটোই ব্যক্ত করেছেন তাঁর গানে। নিজের কবিত্ব নিয়ে তিনি পৌনঃপুনিক, অথচ বিশ্বস্ত উচ্চারণ করেন-
দ্বীনের নবি নূরের ছবি/তুমিই পারের কাণ্ডারী/খুলে দাও দ্বার কর মোরে পার/আমি যে তোমার উম্মত গোনাগার। (দ্বীনের নবি নূরের ছবি)

হজ্ব যাকাত নামাজ রোজা/বরকতে তুই করিস না কাযা/আখিরাতে পাবি সাজা/শোন রে ভাই মমিন প্রজা। (হজ্ব যাকাত নামাজ রোজা)

খোদা তুমি দয়াময়/তোমার দয়ার সীমা নাই/তুমি ছাড়া এই দুনিয়ায়/আপন কেহ নাই। (খোদা তুমি দয়াময়)

তুমি পারের কাণ্ডারী/আমায় করো পার/তুমি পারের কাণ্ডারী গো/আমি জানি না সাঁতার। (তুমি পারের কাণ্ডারী)

বাংলাদেশে মরমী সাধনায় নিবিষ্ট অসংখ্য বাউল-সুফি সাধক। তাঁরা সাধনার অপরিহার্য অংশরুপে বেছে নিয়েছেন সঙ্গীতকে। আদিকাল থেকেই গানের মাধ্যমে সাধন ভজন রীতি চালু রয়েছে। সব ধর্মেই মরমী সাধক কবিরা এ সংগীত রচনা করেন নিজস্ব ভাব ও ভাষায়। এ মরমী কবিদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন যারা অত্যন্ত সমাজসচেতন। সাধনতত্ত্ব ছাড়াও দেশ, কাল, সমাজ তাঁদের রচনায় তুলে ধরেন। আলাউল হোসেনও এ ধারার বাইরে নন। তাঁর গানে দেহতত্ত্ব, উর্ধ্বরতি, রসরতি, অসাম্প্রদায়িকতা লক্ষ্য করা যায়। আলাউলের বাউল সাধনা একান্ত ব্যক্তিকেন্দ্রীক। নিজ তাগিদে তিনি গুরু, মুর্শিদ চরণে আশ্রয় নিয়েছেন নিজেকে জানার জন্য। কারণ, নিজেকে চেনা না গেলে অচেনারে চেনা যায় না। নিজ শরীর ও মনের চেনা অংশ ও অচেনা অংশের সাধনা বাউলদের। অধর ধরার সাধনা অন্যান্য বাউলদের মত আলাউল হোসেনেরও। তিনি দেহের ভেতরে ঈশ্বর সন্ধান করেন-
থাকতে নয়ন দেখলি না রে/আপন যে তোর কোন জনায়/এ দেহেরই মধ্যে সে জন/হৃদয় মাঝে কথা কয়। (হৃদয় মাঝে কথা কয়)

কত জনে আসে যায়/সবাই কি তার দেখা পায়/দেখতে যদি হয় বাসনা/আশিকেতে হ দিওয়ানা/পাগলবিনে দ্বীনদুনিয়ায়/সাঁই-রাব্বানা কে চেনে/চাওয়ার মত চাইলে তারে/দেখবি নিজেই নিজ নয়নে। (সাঁই-রাব্বানা কে চেনে)

কার কাছে তুই যাবি রে মন/কে দেবে তোর ঠাঁই/এ ভবে তোর আপন কেহ নাই/কূল হারা অকূলে ডুবে/চোখের জলে বুক ভাসাই। (তোর আপন কেহ নাই)

বাউলরা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রাণায়াম করে পরমাত্মার সন্ধান পায় এবং সবসময় পরমাত্মার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত থাকার প্রয়াসে লিপ্ত থাকেন। শ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়াও বাউলেরা চারচন্দ্র, পঞ্চতত্ত্ব বা পঁচিশতত্ত্বে উর্ধ্বরতি, রসরতি, পঞ্চইন্দ্রিয় প্রভৃতি সাধনভজনের মাধ্যমে সাধনায় নিবিষ্ট থাকেন। বাউলেরা পুরুষ-প্রকৃতি অর্থাৎ নারী-পুরুষের যুগল সাধনায় বিশ্বাসী। তারা মনে করেন- যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তাই আছে দেহভাণ্ডে। বাউলরা সাধনা ও সঙ্গীতের ভেতর দিয়ে বাউল মতবাদকে বিকাশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যান। তবে আলাউল হোসেন তাঁর গানে সমাজের বিপন্ন মানুষের কথা বলেছেন সুরে সুরে। তাঁর গানে শ্রমজীবী মানুষের পাশাপাশি স্থান পেয়েছে বিচ্ছেদী ভাবনা। তিনি কখনও ঈশ্বরকে, কখনও প্রেমিকাকে, কখনও প্রেমিকা হয়ে প্রেমিককে, কখনও পুরুষ হয়ে প্রকৃতিকে, কখনও প্রকৃতি হয়ে পুরুষ অন্বেষণ করেছেন। বস্তুত তাঁর গান ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারায় রচিত-
তোর এ কূল ও কূল দু’কূল নদী/মধ্যিখানে বালুচর/তাহার মাঝে বসত করে/প্রাণের প্রিয় ঈশ্বর। (প্রাণের প্রিয় ঈশ্বর)

ওরে অবুঝ মন/চলে গেলে বুঝবে তখন/হারালে কী অমূল্য রতন/এই মানুষের ভীড়ে সেজন/বিরাজ করে সর্বক্ষণ/মানুষ হয়েও তারে দেখলে না। (ওরে অবুঝ মন)

ভবের বাজারে সওদা করে সবাই ফেরে বাড়ি/কেউ নগদ কেউ বাকি কেউ বা করে চুরি/ও তীরে ভিড়েছে পারের তরী যেতে হবে তাড়াতাড়ি/দিন ফুরালে রঙ্গরসে কেমনে ধরবে পারের গাড়ি। (ভবের বাজারে)

দেহের মাঝে আছে তোমার/গোলক বৃন্দাবন/ তারে চিনলে না তারে দেখলে না/ওরে ও অবুঝ মন/ও সেই বৃন্দবনে কৃষ্ণ মেলে/দেখলে ভরে দু’নয়ন। (কৃষ্ণ খুলবে অন্তর নয়ন)

প্রেম এক অতিপ্রাকৃতিক দূর্বোধ্য উপলব্ধি। প্রেম হলো জীবনের সেই সঞ্জীবনী জল, যা জীবনকে বিচিত্র অভিধায় উদ্বুদ্ধ ও অভিষিক্ত করে, ব্যাপক কর্মযোগের তাড়নায় জীবনকে অগ্রগামী ও অশেষ অর্থময় করে এবং বেঁচে থাকার মহাজাগতিক সমগ্র আন্দোলনে জীবনকে সুসংগত করে এই প্রেম। তবে এ ক্ষেত্রেও আমরা মাঝেমধ্যে দেখতে পাই প্রেমেরই দ্যোতনাময় প্রতিচ্ছবি। যা আমাদের ক্লান্ত করে না কখনও-
বুকে আমার শত ক্ষত, মুখে তবু গান/আমার কথা কেউ ভাবেনি দেয়নি অবসান/এত গান, এত সুর এ জীবন তবু হলো না সুমধর। (বুকে আমার শত ক্ষত)

কামুকের এক চোখ আর প্রেমিকের থাকে হাজার চোখ। শত চোখে তাঁর প্রিয়তমাকে দেখে, রূপসুধা পান করে মুগ্ধ হয়। বিশ্বপ্রকৃতির রূপ-রহস্যকে সে অনুধাবন করে। সকল সৃষ্টির এবং সকল জীবনের নিগূঢ় তাৎপর্য তাকে বিস্মিত করে। দৃশ্যমান সবকিছু তাঁর কাছে হয়ে ওঠে বহুবিধ অর্থে অর্থবহ। কবিদের ক্ষেত্রে এই প্রেমের কোন যুক্তি নেই, অবয়ব নেই, অসীমে অসহায় এক আদিঅন্ত আধুনিক প্রত্যয়। আলাউলের সংগীতভূবনেও আছে বহুমাত্রিক স্বপ্নের পরিসর। স্বপ্নসন্ধানী আলাউল হোসেনের স্বপ্নের চিহ্নায়িত সংকেত তাই আমাদের মুগ্ধ করে এভাবে-
এত স্বপ্ন এত সৃষ্টি/আর কারো চোখে আমি দেখিনি/এত নির্মোহ প্রেম/আমি আর কারো তরে রাখিনি/তাই আর কারো ভালোবাসিনি। (এত স্বপ্ন এত সৃষ্টি)

সাধারণ মানুষের মতোই ভালোবাসার কাঙাল হন কবিরাও। আলাউল হোসেনের কবিতায় যেমন আছে প্রেমের সোচ্চার আকুতি, তেমনি সংগীতেও একইভাবে প্রেম প্রভূত্ব কায়েম করেছে-
আমার ভীষণ ইচ্ছে করে/গোধূলিলগ্নে তোমাকে নিয়ে কবিতা লিখতে/ইচ্ছে করে তোমাকে নিয়ে উড়ে যেতে/মেঘ হয়ে রংধনুর কাছে। (আমার ভীষণ ইচ্ছে করে)

জীবন আর প্রেম-ভালোবাসা-প্রণয় যে একই জিনিস, তা সংগীতেও উদ্ভাসিত। একটার থেকে আরেকটাকে আলাদা করা যায় না। সংগীতে জীবন আর ভালোবাসা-প্রণয়-প্রেম অপূর্ব ভাষায় বিনির্মাণ করেছেন গীতিকবিরা। আলাউলের কাব্যদর্শনেও প্রেম নিরঙ্কুশভাবে দখল নিয়ে আছে। যার ফলে তাঁর গানেও বারবার করে নানা অনুষঙ্গে ফিরে আসে-
তোমার কাছে ছুটে এসেছি/তোমার চোখে চোখ রেখেছি/তোমায় ভালোবেসে আমি/জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছি। (স্বপ্ন তোমার মাঝে খুঁজে পেয়েছি)

প্রেম সকল রকম অর্থকে ছাড়িয়ে যায়, সেখানে তার অর্থময়তা। সেখানেই তার অনন্ত গণিত, তার গ্রহণযোগ্যতা। অপার মহিমা। প্রেম একনিষ্ট যেমন হয়, তেমনি হতে পারে বহুচারী। তবে একনিষ্ট প্রেমকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে প্রেমের গভীর দর্শন। একজন কবি বা শিল্পীর জন্য এই প্রেম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যে মানুষটি প্রেমে পড়েননি, সে মানুষ ভালো কিছুই সৃষ্টি করতে পারেননি। আবার প্রেমে বিচ্ছিন্নতারও প্রয়োজন আছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে দূর থেকে না দেখলে হৃদয়ে ব্যথার অনুভব আসবে না। আলাউল হোসেন তাঁর কবি হৃদয়ের ভেতর থেকে প্রেমের রহস্য উন্মোচন করেন। জীবনের জন্যই প্রেম, সকল কবির কাছেই প্রেম একান্ত প্রার্থিত-
তোমার সাথে যদি না হতো আমার পরিচয়/জীবনটা হতো না এত মধুময়/তুমি এসেছো বলে এই জীবনে/ভালোলাগে চাঁদ আর ওই নীলাকাশ/শুধু তোমারই কারণে। (ভালোলাগে চাঁদ আর ওই নীলাকাশ)

প্রেম আসলে এক অনিঃশেষ শিল্প। আলাউল তা ভালো করেই জানেন। তাই তাঁর হৃদয় থেকে সংযোজিত প্রেমের ভাষাও অন্যমাত্রার। আমাদের মনে পড়ে যায় প্রেমিক কবি জীবনানন্দ দাশের কথা। আলাউল হোসেনের গান যেন এক একটা দূর্বার প্রেমেরই কবিতা-
প্রতিদিন প্রতিরাতে চাই/তোমারি ছোঁয়া সারাক্ষণ/হাজার বছর পরেও যাবে না ছেঁড়া এই মায়ার বাঁধন/এতো যে ভালোবাসি/এতো যে কাছে আসি/তবু কেন ভরে না এ মন/শয়নে-স্বপনে জাগে শিহরণ। (প্রতিদিন প্রতিরাতে)

আলাউল সৌখিন কবি, সুখের কবি, সুন্দরের কবি। তবুও একজন মানুষ যখন কবি হয়ে ওঠেন; তখন তাঁকে জীবনের দুঃখ ছেনে, অন্ধকার অলি-গলি চিনে এসে কবি হতে হয়। তাঁর চলার পথ থাকে কণ্টকে ভরা।
মধুময় এই রাতে/ওগো তুমি নেই পাশে/তোমার পানে বসে আছি/জোছনার বৃষ্টিতে। (মধুময় এই রাতে)

সংগীতে প্রেম নির্মাণ করতে গিয়ে যে ভাষার বিস্তার তিনি করেছেন, তা সহজ-সরল এবং বহুরৈখিক। আসলে বাংলাদেশের জল-হাওয়া, খাল-বিল, নদ-নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এমন করে জীবনকে গ্রাস করে যে, মাঠ-ঘাট জুড়ে প্রেম কেবলই হাতছানি দেয়। আলাউল যেন প্রকৃতি থেকে জাত প্রেমের ভাষ্যকার।
কিছুটা সময় আরও/আমার কাছে থাকো/হয়ো না নিদয় তুমি/চেয়ো না বিদায়। (চেয়ো না বিদায়)

আলাউল হোসেন একনিষ্ঠ শিল্প সাধক। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি এই বিশেষ গুণে গুণান্বিত। ফলে গান হোক, কবিতা হোক; সরলভাবেই আমাদের তা আকৃষ্ট করেছে। এযাবৎ তিনি শতাধিক গান ও কবিতা লিখেছেন। তাঁর আধুনিক, দেশাত্মবোধক ও সুফিগান গান এদেশের মানুষদের জন্য মূল্যবান এক সম্পদ। প্রেমের গীতকবিতা লিখতে গিয়েও আলাউল প্রকৃতিকে নিয়ে আসেন সযত্নে-
বৃষ্টিভেজা এই দিনে/তুমি এসেছিলে এ জীবনে/কত কথা যে বলেছিলে/আজ ভুলেছো কি সব/নাকি সবই আছে মনে। (বৃষ্টিভেজা এই দিনে)

সামাজিক ভয়, অপবাদ ও নিন্দা- এ সব কারণেও প্রেম কখনও-সখনও একপক্ষের ও অনিবেদিত থাকতে পারে। প্রেমের জন্ম আছে এবং মৃত্যুও হয়। শাশ্বত প্রেম বলে কিছু নেই। বিশেষ মুহূর্তের আবেগকে শাশ্বত প্রেম বলে মনে করাই রোম্যান্টিক কবিদের একটা স্বভাব। বস্তুত প্রেম-প্রণয় যে সব সময়ই সুখের তা কিন্তু নয়। গীতিকবি আলাউল অনুভবের এক অপরূপ সন্দর্ভ নির্মাণ করেছেন তাঁর কিছু গানে-
মনের কথাটি আজও হলো না বলা/ভালোবেসেছি বলে পেয়েছি শুধুই জ্বালা। (পেয়েছি শুধুই জ্বালা)

কবিরা মানব হৃদয়ের রহস্যবিদ। মানবপ্রেমের বিশদ ব্যাখ্যাতা। তাই প্রেম কবির জন্য, প্রেম মানুষের জন্য। কবিরা মানবহৃদয়ের ভ্রাম্যমান দূত। যে প্রেম নির্মাণ করে জীবন-সান্নিধ্য, যে প্রেম নির্মাণ করে যুগল আত্মার সান্নিধ্যস্থল- কবি তো সেই প্রেমেরই পুরোহিত। তবুও মাঝেমধ্যে কবিরাও প্রেম নিয়ে ব্যথিত হন-
আগে যদি জানতাম গো বন্ধু/প্রেমে এত জ্বালা/তবে কি আর পরতাম গলায়/তোমার ফুলের মালা। (প্রেমে এত জ্বালা)

বন্ধু আমারে যাও কইয়া/পীড়িত কইরা পীড়িত ভাইঙ্গা/গেলা কোথায় আমায় ছাইড়া/পাড়া-পড়শী কলঙ্কিনী কয় আমায়/শুধু তোমার লাইগা বন্ধু আমারে যাও কইয়া। (বন্ধু আমারে যাও কইয়া)

প্রেমের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। নির্দিষ্ট কোনো ছকে ফেলা যাবে না একে। ব্যাখ্যা, ব্যাকরণ এবং ঔচিত্য-অনৌচিত্যের উর্ধ্বে এর অবস্থান। গান, কবিতা, চিত্রকলার বহুবিধ শাখায় মানবহৃদয়ের অব্যক্ত এই অনুভূতির প্রতিফলনের চেষ্টা চলে এসেছে আদিকাল থেকে। চিরায়ত এই বোধ, বেদনা, হাহাকার, মূর্ত হয়ে উঠেছে কালজয়ী সব শিল্পীর কল্পনায়, তাঁদের শিল্পফসলে। তাই তো আঘাতে আঘাতে, বেদনায় বেদনায় জর্জরিত হয়েও কবি পরক্ষণেই যেন সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার প্রেমে আত্মসমর্পন করেন।
পারি না তোমায় ভুলে যেতে/তুমি যে কবিতা আমার/পারি না তোমার ছবি মুছে দিতে/তুমি যে সুখ আমার। (পারি না তোমায় ভুলে যেতে)

নরনারীর প্রথম জিজ্ঞাসা প্রেম এবং প্রতিনিয়তই তা অভূতপূর্ব, এক অনির্বচনীয় সত্য। সৃষ্টির আদিকাল থেকে অন্ত্য পর্যন্ত জীবনের বোধের সমগ্র বিবর্তন ও বিকাশকে যা ব্যাপক ব্যাখ্যায় অবলম্বন করে প্রজ্ঞার মতো-
আমি তো আমার কথা রেখেছি/তোমার পথপানে চেয়ে থেকেছি/তুমি কেন আসোনি/তবে কি আমায় ভালোবাসোনি। (তুমি কেন আসোনি)

জীবন আর প্রেমের যে নানারকম সংক্রমণ ও আরোগ্য, তাই যেন কবি ও গীতিকার আলাউল হোসেন নানাভাবে বাচনিক শিল্পে চিত্রিত করেছেন। প্রিয়তমাকে দূর থেকে আহবান করার ঝকঝকে প্রাণশক্তিতে ভরপুর গীতিকার। সমগ্র নিঃসঙ্গতাকে সরিয়ে তাই তো তিনি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন এমন বিরহের গান-
তুমি আজ দূরে, বহু দূরে/ভুলতে পারি না তবু/বসে আছি এই মনে/তবু ভালোবাসি সংগোপনে। (তুমি আজ দূরে, বহু দূরে)

প্রেমহীন কোন সৃষ্টিই সম্ভব নয়। প্রেম অনন্ত আধুনিক, চিরকাল আধুনিক এবং মানবিক একটি বিষয়। যুক্তিবাদী কোন মহাপ-িতের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যার কোনো বিষয় নয় এটি। এ এক অন্তরগত সত্য, যা ঈশ্বরসৃষ্ট সমগ্র এ স্বর্গ-মর্ত্যকেও ছাড়িয়ে যেতে চায়-
একাকি নিঃসঙ্গ বসে/তোমায় ডেকেছি কতশত/এ ডাকে পাইনি কো সাড়া/মায়াবি সেই রাতের মত। (একাকি নিঃসঙ্গ বসে)

মহাকালের প্রবহমান দর্পনে আমরা আসলে সুরকেই প্রতিবিম্বিত করে চলেছি। বহুমাত্রিক এই গানের বাক্যটিকে অনবরত আত্মস্থ করাই যেন আমাদের ঐতিহ্য। কবি ও গীতিকার আলাউল হোসেন আমাদের সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। সৃজনাত্মক চেতনায় আলাউল আমাদের ভালোবাসার সাংকেতিক ভূবনের সন্ধান দিয়েছেন-
ও নদী, জানতাম যদি/তোমার মনের কথা/বাঁধতাম না ঘর বালুচরে/পেতাম না রে ব্যথা। (ও নদী জানতাম যদি)

বিলম্বিত পুঁজিবাদ আর সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদে আমরা এ সময়ে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। আবহমানকালের শুভবোধ আর ঐহিত্য থেকে আমরা বিমূখ। ফলে মূল্যবোধ যেখানে নেই, আবেগ সেখানে নেই; সেখানে ভালোবাসার মতো সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক সম্পদের থেকে আমরা দূরে হাঁটছি। এক নেতিবাচক বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যে বিশ্বে কেবলই প্রতিযোগিতা। একজন আরেকজনকে কীভাবে ছাপিয়ে যাবে, তার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ফলে দিনরাত আমরা উৎপাদিত সত্যের দিকে ছুটছি মরীচিকার মতো। আলাউল সেখানে ভালোবাসার মাধ্যমে জীবনচেতনার উচ্চাকাক্সক্ষা ছড়িয়ে দিতে চাইলেন চলমান সময়ের স্রােতে-
স্বপ্ন আছে তাই স্বপ্ন দেখে মন/শয়নে-স্বপনে আছি আমি যে এখন/নবজীবনের দেখছি স্বপন। (স্বপ্ন দেখে মন)

ফুল যদি হয় ভালোবাসা/কুঁড়িই প্রথম ঘ্রাণ/জীবন ফুলের কুঁড়ি সেতো/প্রেমের আদি প্রাণ/ও প্রেম গোলাপ কুঁড়ি দেব খোঁপায়/নিত্য সকাল-সাঁঝে। (জড়াবো মধুর লাজে)

আলাউল হোসেনের কিছু গান যেন খণ্ড সময়ের ফসল। উৎকট সময় আমাদের ভেতরে জন্ম দেয় চাতুর্যতা, নির্মম বিষাদ, ঘৃণা, বিশ্বাসহীনতা। ফলে ভালোবাসার মতো প্রিয়বস্তুও আক্রান্ত। বিপন্নতায় সাম্প্রতিক জীবনচর্চাতেও কেমন অস্থিরতা। যার ফলে হৃদয়ভূমি থেকে তাজমহলের মতো নির্মিত ভালোবাসা ভেঙে যাচ্ছে। তাতে যেন আলাউলের মতো গীতিকারের আত্মদীপ্ত মহত্ব নষ্ট হচ্ছে না এতটুকু। বরং সে কল্লোলিত ভালোবাসার উচ্ছ্বাসকে আরও প্রাণবন্ত করতে এবং পথভ্রষ্ট না হয়ে নির্মাণ করলেন এমন কিছু গান-
কথা দিয়েছিলে তুমি দু’হাত ছুঁয়ে/চিরদিন থাকবে আমারই হয়ে/কত জোছনায়, কত মধুময়/কাটিয়েছি রাত আমি তোমার আশায়/তবু তুমি কেন আমার হলে না। (কথা দিয়েছিলে)

কাঙ্ক্ষিত প্রিয়তমাকে হারিয়ে কবি কিন্তু একটুকুও ক্লান্ত নন। শরৎচন্দ্র বলেছিলেন- মহৎ প্রেম কেবল কাছে টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। আলাউলের গানে পেলাম এই জাতীয় উদ্ভাসন ও মনস্তাত্ত্বিক-নান্দনিক মূল্যবোধের ভাষা-
সজনী গো একবার বলো আমায়/ওই মনটা কোথায় নিয়ে গেলে/কী নেই আমার ভালোবাসায়/তবে কেন আমায় গেলে ফেলে। (সজনী গো)

প্রেমের অনুভূতি ও উপলব্ধি একেক বয়সে একেক ধরনের। কখনো তা উচ্ছ্বাস, কখনো মোহ, কখনো বা আমৃত্যু নিঃশব্দ রক্তক্ষরণের প্রিয় প্রবণতা। আলাউলের গানে প্রায়ই ফুটে উঠেছে অচরিতার্থ প্রেমের হাহাকার। গীতিকবিতার শব্দে শব্দে খুঁজেছেন হারানো নারীকে। হারানো নারীর খোঁজে তিনি অসংখ্য শব্দের মালা গেঁথেছেন। কখনও তিনি ভুগেছেন নষ্টালজিয়ায়; হারানো বন্ধুর খোঁজে কখনও কাতর হয়েছেন-
সখি হারালে কোথায়/খুঁজে খুঁজে পথহারা/পালালে কোথায়/কোন অজানায়/সখি হারালে কোথায়। (সখি হারালে কোথায়)

জীবনের মূলসূত্র প্রেম, সৃষ্টির মূলসূত্র প্রেম, জগৎসংসারের মূলসূত্র প্রেমই। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-সভ্যতার যা কিছু নিয়ামক শক্তি তার সম্পূর্ণ অবকাঠামোর মূল বুনিয়াদ রচনা করেছে প্রেম। প্রেম নামক চিরপরিচিত এই একটি শব্দের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে সহস্র ডাইমেনশনাল একটি অমেয় সত্য, যে সত্য আকার ও অস্তীত্বকে ঘোষণা করে জগৎ-প্রতীতিকে নির্মাণ করেছে, আবার নিরাকারের জন্যও যার মধ্যে লুকিয়ে আছে অনন্ত হাহাকার-
বন্ধুরে প্রেম করা তো মুখের কথা নয়/মনের মত মন না হলে/প্রেম মিলে না কোনোদিনে/ও প্রেম করতে হলে/মনের মত মানুষ চিনতে হয়। (প্রেম করা তো মুখের কথা নয়)

প্রেম-প্রকৃতি, দেশ-দয়িতা এবং মহার্ঘ মানুষ অন্যসব কবিদের মতোই আলাউল হোসেনের কবি স্বভাবেরও আরাধ্য বিষয়। কিন্তু সুর, স্বর ও প্রকাশভঙ্গি সম্পূর্ণই তাঁর নিজস্ব, অন্যদের চেয়ে একটু আলাদা। তাঁর সুরের কোমলতা, স্বরের শব্দঝংকার এবং বাক্যবন্ধের দ্যোতনার মসৃণ্য পাঠক-শ্রোতাদের অভিভূত করে-
নিজের কথাই ভাবলে শুধু/আমার কথা ভাবলে না/কী যে ভালো বাসতে আমায়/সেই তুমি আজ চিনলে না। (সেই তুমি আজ চিনলে না)

বদলে গেছো অনেক তুমি/আগের মতন নেই/অশ্রু জমে চোখের কোণে/ভাবতে বসি যেই/আমার ঘুম আসে না/মন হাসে না জোছনাঝরা রাতে। (বদলে গেছো অনেক তুমি)

গীতিকার হিসেবে আলাউল হোসেন একমাত্রিক নন; শুধু যে প্রেম ও নারী- এই ভূবনেই তিনি বন্দি, তা কিন্তু নয়- তার অন্য স্বাদ ও আবহের গানও আছে, যার ভেতর দিয়ে কবির ভিন্ন কণ্ঠস্বর শোনা যায়। বর্তমানে করোনা ভাইরাস নিয়ে পুরো বিশ্ব আতংকিত এবং সংক্রমিত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের সবাই তাকিয়ে আছে সৃষ্টিকর্তার দিকে। যে যেভাবে পারছেন, সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করার চেষ্টা করছেন। কেউ বা নামাজ পড়ে, কেউবা প্রার্থনা করে। আবার কেউবা গানে গানে স্রষ্টাকে স্মরণ করছে এই মরণ ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে। আলাউল হোসেন সময় সচেতন একজন কবি। সময়ের সাথে তিনি গভীরভাবে সাধনা করতে পারেন। তাইতো সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে তিনি মহামারী করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির প্রার্থনা সংগীত লিখে ফেললেন-
কোন বা খানে থাকো তুমি/দাও দেখা এই অধমেরে/তুমি দয়াময়, তুমি মায়াময়/ডাকি তোমায় বারেবারে। (ডাকি তোমায় বারেবারে)

বস্তুত জীবনবাদী কবি আলাউল হোসেনের জীবন ও জগৎ সম্পর্কিত জিজ্ঞাসার নিরন্তর উৎস এই পৃথিবী ও পার্থিব জীবন। তাঁর কবিতার স্বাদ নিতে গেলে পাওয়া যায় দার্শনিকতার ঘাণ। কবিতা বয়ানের ফাঁকে ফাঁকে তিনি যেন কখনও-সখনও দার্শনিক হয়ে উঠেছেন। দার্শনিকের চোখে দেখেছেন তিনি মানুষের সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তিগত কাতরতাই তাঁর কাব্যের প্রধান বিষয়ানুষঙ্গ বলে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, কাতরতা সাহিত্য সৃষ্টির অন্যতম প্রধান উপাদান। সন্দেহ নেই কাতরতা শব্দটি মনোজাগতিক। আর শব্দজাদুকর কবিরা যখন কোনো শব্দ ব্যবহার করেন, তখন তাতে অর্থান্তর বা অর্থের বিস্তার ঘটতেই পারে। আলাউল হোসেনের কাব্যে কাতরতাবোধ বা কাব্যের প্রতি দূর্বলতা হৃদয়গত এবং মনস্তাত্ত্বিক, কিন্তু মনোবিকলনগত নয়। তাঁর কবিতা যেমন পৃথিবীর পাঠশালা থেকে প্রাপ্ত জীবনাভিজ্ঞতার সুবর্ণ ফসল, তেমনি তাঁর কাতরতাবোধও সেই লব্ধ অভিজ্ঞতার নির্যাস।

ড. জীবন কুমার সরকার : লেখক ও গবেষক।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email