এবিসি বার্তা

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

নিন্দুক ও কিছু অন্ধলোকের প্রতি

রেজাউল করিম শেখ

আমরা তো আমাদের তারুণ্যের শেষ প্রান্তিকে আছি কিংবা যৌবনে পদার্পণ করেছি। গতকাল একজন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণের সাথে আলাপ হলো। একটা সময় সে যখন শিশু ও কিশোরকালে ছিলো- তখন নিয়মিত আমাদের সাথে থাকতো। আমাদের এই যে নানা রকম সৃজনশীল ও কল্যাণকর্ম সেসবের সাথে তার একটা আত্মার সংযোগ ছিলো এবং হৃদয় দিয়েই কাজ করার চেষ্টা করতো। কিন্তু মাঝখান থেকে অনেকদিন আর তাকে পাওয়া যায়নি। অন্য অনেকের ভিরে তার কথা আমরাও বেমালুম ভুলে গেছি। ভুলে গেছি তার প্রয়োজনীয়তাও। এখন এই এতোদিন পর এসে তার আফসোস- যদি এই দীর্ঘ সময় আমরা এক সাথে থাকতে পারতাম- তাহলে কতই না ভালো হতো। কত ভালো ভালো কাজ আমরা করতে পারতাম। কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হতো।

ঘটনা অতীত হয়ে গেছে, তাই যতো আফসোসই এখন করা হোক না কেন, বাস্তব সত্য হলো হয়নি। কিন্তু কেন হয়নি? খুব আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলাম ও উত্তরের জন্য অপেক্ষায় থাকলাম। ভেতরে যে উত্তর জমা ছিলো, দেখা গেল তার উত্তরও তাই। কি সেটা? সহজ উত্তর- নিন্দুকের বিরোধীতা। এখন সে তাদেরকে ‘নিন্দুক’ বললেও যথাসময়ে তাদেরকে অতিক্রম করতে পারেনি। এই যে, শিল্প-সাহিত্য চর্চায় যুক্ত হতে যাচ্ছিলো, এই যে সমাজকল্যাণে অগ্রসর হচ্ছিলো, সেসব থেকে তাকে দূরে রাখার জন্য কিছু লোক তাকে কটু কথা বলতো, তার বাবা-মাকে কটু কথা শোনাতো। ফলে ভয়ে সে গুটিয়ে গেছে। পরক্ষণেই প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা ওইসব লোক- যাকে তুমি ‘নিন্দুক’ বলছো, তারা কি কি করেছে বিগত বছরগুলোতে, যাকে আমরা আলোচনায় আনতে পারি? উত্তর দিলো- কারো মেয়েকে উত্যক্ত করা, গাঁজা সেবন করা, সিগারেট টানা, উৎকট আড্ডা দেওয়া।

আলোচনা অনেক মোড় নিলেও আমার লেখায় সেসব টানবো না। বরং আমরা এখন আমাদের কথা বলি। এই যে, আমরা বাংলাদেশের অন্য অনেক জেলার চেয়ে পিছিয়ে পড়া একটি জেলায় বসবাস করি, সেই জেলার ভেতরে অপেক্ষাকৃত কম সুবিধার একটি উপজেলার অধীনে আরো প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ইউনিয়নে জন্মেছি, বেড়ে উঠেছি এবং জীবন যাপন করি- সেটা কেন? এই প্রশ্ন খুব অহেতুক মনে হতে পারে, খুব সরল উত্তরও থাকতে পারে। সেসব হয়তো আমরা আলোচনাও করি। কিন্তু সমাধানে কতজন প্রবৃত্ত হই।

আমরা একটি সম্মিলিত জায়গা তৈরী করেছি ২০১১ সালে এই অঞ্চলে। যেখানে বই পড়ার চল ছিলো না, যেখানে লেখালেখির চল ছিলো না, যেখানে বইমেলা কি সেই ধারণার বিস্তৃত পরিচয় ছিলো না, যেখানে সংঘবদ্ধভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে সমাজকল্যাণে নিয়োজিত হওয়ার পরিসর ছিলো না, যেখানে রক্তদানের মতো মহৎ কাজের সংযোগ ও ‍উপায় ছিলো না। সংক্ষেপে বলতে গেলে কোনো ধারণাই ছিলো না। শিক্ষার্থীদের বুদ্ধির বিকাশ, মানসিক বিকাশ, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য কোনো সৃজনশীল পাঠ, কুইজ প্রতিযোগিতা, দেয়াল পত্রিকা, পত্রিকা, আলোচনার সুযোগ ছিলো না- সেখানে আমাদের সৃষ্টি, বিকাশ ও পরিণত হওয়া। এটাকে একদিকে যেমন আমরা আশীর্বাদ ভাবি, আরেক দিকে অভিশাপও বলতে হয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই অভিশাপ বলতে হয়। কেননা, যখন অন্য সকলেই অর্থ উপার্জনের জন্য সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত, ঠিক তখন আমরা কয়েকজন অন্তত ‘টিউশনি’ করিয়ে অর্থ উপার্জনে প্রবৃত্ত না হয়ে শিক্ষার্থীদের বই পড়িয়েছি, উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ধারণা দিয়েছি, নানা রকম কল্যাণ চিন্তা ও কাজে যুক্ত হতে উৎসাহ দিয়েছি। সেসব নিশ্চয়ই স্বাভাবিক দৃষ্টিতে আমাদের মতো পরিবারের জন্য অভিশাপ। অধিকন্তু আমাদের জন্যও। এবং এই অভিশাপটি আরো বৃহত্তর আকারে হাজির হয়েছে তাদের জন্য, যারা নানাবিধ প্রতারণামূলক ব্যবসা বা বৃত্তিতে জড়িয়েছে বা জড়িয়ে ছিলো। সহজ করে একরৈখিক দৃষ্টিতে বললে শিক্ষা দেওয়ার ভং ধরে যারা মূলত ‘প্রাইভেট কক্ষে’ ডেকে তাদের অভিভাবকের পকেট কাটার কাজটা খুব সম্মানজনকভাবে করে যাচ্ছিলো। শিক্ষার্থীরা যখন প্রকৃত জ্ঞানচর্চার মজাটা পেয়েছে, তখনই তারা বুঝেছে এই সব শিক্ষকের ফাঁকা অন্তরের ভোলবাজি। কিন্তু সেসব কতজন পারে- পেরেছে?

সকলেই পারে না, কেউ কেউ পারে। কিন্তু যদি আমরা সকলে চেষ্টা করতাম, তাহলে অনেকেই পারতো। অনেকেই হয়ে উঠতো উজ্জ্বল আলোর মতো ঝলমলে। তারা হয়ে উঠতো সত্যিকার আদর্শবান মানুষ, উদাহরণ হতে পারতো সময়ের ইতিহাসে।

পরকথা,
আমাদের কৃতকর্ম যদি অন্যায় না হয়, অশ্লীল না হয়, অপরাধ না হয়। তাহলে কেন আমরা এতো এতো বাধার শিকার হয়েছি- হলাম। হ্যাঁ প্রিয়বন্ধুরা আমাদের যাত্রাপথে অসংখ্য বাঁধার গল্প রচনা হয়েছে। এই বাঁধা কোনো ভিনগ্রহের প্রাণি দিতে আসেনি, এমনকি আমাদের সুন্দর পৃথিবীর মানুষ ভিন্ন অন্য কোনো প্রাণি দিতে আসেনি। আবার এই পৃথিবীর অন্যকোনো দেশের অন্যকোনো জাতির লোকও আসেনি। আরো ছোট করে বললে এই পাবনা জেলার এই সুজানগর উপজেলার অন্যকোনো ইউনিয়নের লোকও শুরু থেকে আমাদের বিপত্তির কারণ হয়ে ওঠেনি। তাহলে কারা এসেছে? এইতো আমাদের চারপাশের পরিচিত জন- অতি পরিচিত জন- অতি ঘনিষ্ট জন- অতি প্রিয় জন খুব শক্তি নিয়েই সামনে এসে পথ আগলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। এই দলে কারা আছে? খুব মোটা করে না বলে সহজে বলা যায়, তথাকথিত ভালো শিক্ষক, ফুলের মতো পবিত্র নেতা, মুখোশধারী সৎ ব্যবসায়ী, এমনকি মাদক ব্যবসায়ীও আছেন। খুব গর্ব করে বলা যায়, এই দলে ভাই, বন্ধু-বান্ধবী, প্রতিবেশি, অভিভাবকও আছেন।

অন্য অনেকের কথা ইতোপূর্বে কিছুটা হলেও বলেছি, লিখেছি। কিন্তু তথাকথিত ভালো শিক্ষকদের- যারা মূলত প্রতারণামূলক ‘টিউশন কক্ষে’ ডেকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের ফালতু শিক্ষা দিয়ে অভিভাবকের পকেট কাটেন, তাদের কথা সচরাচর বলা হয় না, হয়নি। তাদের কথাও বলা হয়নি, যারা বা যেসব অভিভাবক তার সন্তানদের আমাদের থেকে দূরে রাখতে খুব চেষ্টা করেছেন- যতোটা না অন্ধকার গলিতে গিয়ে বান্ধবী/বন্ধুর শরীরের উত্তাপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে করেছে- যতোটা না বন্ধুদের সাথে বিড়ি টানা থেকে দূরে রাখতে করেছেন। তারা সত্যিই চেষ্টা করেন নাই, তার ছেলেটি অযথা আড্ডার মাচায় বসে না থেকে পাঠাগারে গিয়ে বই পড়ুক, কিছু একটা লেখার চেষ্টা করুক- তার ভাবনা প্রসারিত হোক। সে নিজেকে রক্তদান, রাস্তা মেরামতের মতো জনকল্যাণে নিয়োজিত করুক এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝে ন্যায়ের পক্ষে থাকুক- অন্যায়ের বিপক্ষে থাকুক এই চেষ্টা তারা মোটেও করেনি। বরং উস্কে দিয়েছে পৃথিবীর স্বাভাবিক সৌন্দর্য বিকাশে তাদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বাঁধা দেওয়ার সকল যন্ত্রকে। আপনি চিন্তা করুন- একজন শিক্ষক তার ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে বলছেন- তোমাদের বইমেলায় যাওয়া যাবে না, তোমরা ওই ওখানে কুইজ প্রতিযোগিতায় যেতে পারবে না, তোমরা ওই ওখানে গিয়ে দেয়াল পত্রিকা, ভাঁজ পত্রিকায় লেখা জমা দিতে পারবে না, ওইসব প্রকাশনায় যুক্ত হতে পারবে না। ওই ওখানে রক্তাদাতা সমিতিতে নিজের নাম লেখাতে পারবে না। একজন শিক্ষক বলছেন, সৃজনশীল মেধা বিকাশের ‘সেরা প্রতিভা অন্বেষণ’ কার্যক্রমে প্রতিযোগি হতে পারবে না। তিনিই তাদের প্রবলভাবে বাঁধার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন, ধমকে দিচ্ছেন, অভিভাবকের কাছে বাজে মন্তব্য করছেন- সাবধান বানী উচ্চারণ করছেন। অথচ তাকে হয়তো আমরা দেখেছি অন্যকোনো নারীর সাথে সময় কাটাতে কিংবা ইশকুলের কোমলমতি শিশুদের সাথে কেলেঙ্কারি রটতে। আমরা এইসব ঘটনায় বিস্মিত- হতবাক হওয়া ছাড়া আর কি করতে পারি?

প্রিয়বন্ধুরা, আমরা যদি অপকর্ম করি, আমরা যদি পাপিষ্ঠ হই- তাহলে কেন আমাদের মতো অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবকের কাছে রক্তের জন্য ছুটে যান? কেন এই করোণাকালেও যখন অন্য অনেকে নিজ ঘরে নিরাপদে থাকে- তখন প্রত্যাশা করেন, কেউ এসে অসহায় অবস্থা থেকে আপনাকে মুক্ত করুক? কেন আসেন আপনার টিকার ফ্রি রেজিস্ট্রেশনের জন্য? সন্তানের শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ করে দিতে? কেন আসেন আপনার সন্তানের দূরে শিক্ষালয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির আর্জি নিয়ে? নিতান্ত মেসবাড়ি ঠিক করার জন্যও কেন আসেন? কেন চলে আসেন হাসপাতালে একটু সহযোগিতা করবো এই প্রত্যাশা নিয়ে?

আসলেন খুব ভালো কথা, আসতেই পারেন। কিন্তু এই কাজগুলো করবে কে? একটু ভেবেছেন কি কারা দিবে রক্ত? কার শরীরে আছে প্রতি মাসে ৩০/৪০/৫০ ব্যাগ রক্ত দেবার মতো? কে বা কারা আছেন সারা দিন নিজের কর্মের ফাঁকে এক ব্যাগ রক্ত খুঁজতে অন্তত ৩০জন রক্তাদাতাকে কল দিতে প্রস্তুত? ভেবে হয়তো কিছুই পাবেন না, হয়তো ভাবার কোনো অবকাশ আপনার নাই। দরকারটাও অনুভব করেন না। কিন্তু তারা ঠিকই দরকার অনুভব করেন- যারা ‘টিউশন কক্ষে’ শিক্ষার্থীদের অনুৎসাহিত করেন সৃজনশীল চর্চা, উন্নত ও উচ্চ জ্ঞানার্জনে, মেধার মসৃণ বিকাশে আর সমাজকল্যাণের শিক্ষা গ্রহণে। কেননা তারা জানেন, এতে করে তাদের দল ছোটো হয়ে যাবে, তাদের গুরুত্ব কমে যাবে, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি কমে যাবে।

কিন্তু আফসোস, আমরা ভাবতে পারি না। আমরা ভাবতে পারবো না। যে বোধ ও শিক্ষা আমাদের অপরের কল্যাণে নিয়াজিত করে, যে বোধ আমাদের অপরের ক্ষতি করা থেকে নিবৃত্ত করে- তাকে আমরা কি করে দূরে ঠেলে দেই- ঝেরে ফেলে দেই? আমরা কেউই পারবো না মানুষের কিঞ্চিৎ ক্ষতির কারণ হতে। এবং আমরা প্রকৃত প্রস্তাবে বিশ্বাস করি, মানুষ সত্যিই আলাদা হয়ে যাবে তাদের থেকে- যারা ক্ষতিকর, যারা ধুরন্দর, আত্মস্বার্থের পূজারী, ফটকাবাজ শিক্ষা ও জীবন ব্যবসায়ী।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, নবজাগরণ পাঠক মেলা (নপম)

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email