এবিসি বার্তা

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

করোনার ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে শিল্প খাত

চীনে করোনাভাইরাস আঘাত হানার পর গত বছরের শুরুতে বাংলাদেশেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত বছরের মার্চে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় দেশে। সংক্রমণ ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে এক বছরের বেশি সময় ধরে চলে বিধিনিষেধ। তাতে স্থবির হয়ে পড়ে দেশের প্রায় সব ব্যবসা-বাণিজ্য। ব্যবসা-বাণিজ্যের সেই স্থবিরতা কাটাতে ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ায় সরকার। ঘোষণা করা হয় লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা।

সরকারের দেওয়া সেই প্রণোদনা ঋণ বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছে। সেই তথ্যও মিলছে প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভ-লোকসানের হিসাব দেখে। গত বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়কালে এসিআই লিমিটেডের নিট মুনাফা ছিল ৩৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি প্রণোদনা তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ৩২৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়। এ ঋণের টাকা দেওয়া হয়েছিল প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে এসিআই মুনাফা করেছে ৪৯ কোটি টাকা। ভোগ্যপণ্য, ওষুধ, নিত্যব্যবহার্য পণ্য, কৃষি ও বাণিজ্যিক যানবাহন, মোটরসাইকেলসহ নানা খাতের ব্যবসা রয়েছে এসিআই লিমিটেডের। করোনার ক্ষত কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দেশের অন্যতম বড় এই শিল্প গ্রুপ।

বিজ্ঞাপন

ইস্পাত খাতের দেশের সবচেয়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিএসআরএম স্টিলের কারখানাও গত বছর করোনার শুরুতে বন্ধ হয়ে যায়। তাতে ২০২০ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি মুনাফা করে ৫৪ কোটি টাকা। করোনার ক্ষতি পোষাতে প্রতিষ্ঠানটি প্রণোদনা তহবিল থেকে ৬৪১ কোটি টাকা ঋণ নেয়। সেই ঋণ ব্যবসার কাজে লাগানো হয়। তাতে চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চে কোম্পানিটির মুনাফা বেড়ে হয়েছে ১৩৮ কোটি টাকা। ক্ষত কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক মুনাফার ধারায় ফিরতে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন,‘সরকারের প্রণোদনার ঋণসুবিধা নিয়ে আমরা ব্যবসার কাজে লাগাই। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কারখানা চালু হয়। এখন উৎপাদন আবারও আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। তবে বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ায় একটু চাপে রয়েছি।’

প্রণোদনার ঋণে বিভিন্ন খাতের বড় শিল্প গ্রুপগুলোর অনেকে ছন্দে ফিরে এলেও কারও কারও বিরুদ্ধে স্বল্প সুদের এ অর্থ ভিন্ন কাজে ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে। ঋণ নিয়ে তা ফেরত দিতে গড়িমসি শুরু করেছে অনেকে। আবার দ্রুত প্রণোদনার ঋণ বিতরণ করতে গিয়ে যথাযথ বাছবিচার না করে কিছু প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। যাদের কাছ থেকে সময়মতো ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শিল্প ও সেবা খাতের জন্য প্রণোদনা তহবিলটি ৩৩ হাজার কোটি টাকার। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে এ তহবিলের ঋণ বিতরণ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত দুই হাজার প্রতিষ্ঠান এ তহবিল থেকে ৩২ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ। যার মধ্যে অর্ধেক সুদ জনগণের করের টাকায় সরকার বহন করছে। বাকি সাড়ে ৪ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে ঋণগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের। এই ঋণের শর্ত শুধু চলতি মূলধন হিসাবে ব্যবহার করা যাবে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই কেবল এই ঋণ পাবে। প্রণোদনার ঋণ নিয়ে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন সময় এসেছে কম সুদের এসব ঋণ ফেরত দেওয়ার।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নিঃসন্দেহে এই প্রণোদনা সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা ব্যবসায় ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঋণের টাকা কারা পেয়েছে ও কোথায় তা ব্যবহার হয়েছে তা নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব ঋণ আদৌ ফেরত আসবে কি না, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে। তাই দ্বিতীয় দফায় যে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, সেখানে তদারকি বাড়াতে হবে।

প্রথম আলোর পক্ষ থেকে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে শিল্প ও সেবা খাতের ঋণ গ্রহণের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। শীর্ষ ১০০ ঋণগ্রহীতার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে সরকারি সংস্থা বিমান বাংলাদেশ। সংস্থাটিকে প্রণোদনা তহবিল থেকে সোনালী ব্যাংক ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। আবুল খায়ের গ্রুপ ঋণ পেয়েছে ১ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। এস আলম গ্রুপ ঋণ পেয়েছে ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। সিটি গ্রুপ পেয়েছে ৮২৭ কোটি টাকা ও বসুন্ধরা গ্রুপ ৬৭৮ কোটি টাকা। এর বাইরে বিএসআরএম ৬৪১ কোটি টাকা, নোমান গ্রুপ ৫৯৯ কোটি টাকা ও প্রাণ গ্রুপ ৫৫৯ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে। এসব গ্রুপের মধ্যে কখনোই ঋণ খেলাপি হয়নি এমন প্রতিষ্ঠান যেমন আছে, তেমনি আছে অতীতে ঋণখেলাপি হওয়া কিছু প্রতিষ্ঠান।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক(বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘করোনার শুরুতে বড় সমস্যায় পড়েছিলেন কৃষকেরা। আমাদের বিক্রিও কমে গিয়েছিল। আমাদের সঙ্গে এক লাখ কৃষক কৃষি সবজি, চাল, দুধ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। করোনা হলেও তাঁদের থেকে এসব কাঁচামাল সংগ্রহ এক দিনের জন্য বন্ধ করা হয়নি। দুধ সংগ্রহ করে পাউডার করে রেখেছি। আম, পেয়ারাসহ যেসব মৌসুমি ফসল উৎপাদিত হয়েছে, তা কিনে রেখেছি। প্রণোদনার ঋণ পাওয়ায় কৃষকের পাশে থাকার সুযোগ হয়েছে। এখন ব্যবসা অনেকটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।’

এ ছাড়া মেঘনা ৩৭১ কোটি টাকা, কেএসআরএম ৩২৮ কোটি টাকা, এসিআই ৩২৭ কোটি টাকা, জিপিএইচ ২৯০ কোটি টাকা, নাভানা ২৬৮ কোটি টাকা, বেক্সিমকো ২৬০ কোটি টাকা, থার্মেক্স গ্রুপ ২৩৮ কোটি টাকা, যমুনা গ্রুপ ২১৯ কোটি টাকা, নাসা গ্রুপ ১৮৫ কোটি টাকা ও প্রণোদনা তহবিল থেকে ইউনিটেক্স গ্রুপ ঋণ পেয়েছে ১৮৩ কোটি টাকা। প্রণোদনার ঋণ পাওয়ার তালিকার শীর্ষ এক শতে আরও রয়েছে বেঙ্গল, সাদ মুসা, জজ ভূঁইয়া, গাজী গ্রুপসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম।

জানা গেছে, যারা প্রথম দফায় ঋণ পেয়েছে, তারাই আবার দ্বিতীয় দফা ঋণ নিতে শুরু করেছে। ঋণ ফেরত আসা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও ব্যাংকাররা বলছেন, তাঁরা আশাবাদী। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল-ইসলাম বলেন, প্রণোদনার ঋণের কিস্তি ফেরত আসছে। আশা করছি. ঋণের বড় অংশ যথাসময়ে ফেরত আসবে।

তবে এ–ও জানা গেছে, অনেক ব্যবসায়ী ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছেন। এসব ঋণের মেয়াদ ছিল এক বছর। মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় অনেকে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করছেন। প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম রিয়াজুল করিম বলেন, ‘গ্রাহকদের কেউ কেউ মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করছেন। এ অবস্থায় ঋণ কবে ফেরত আসবে, বুঝতে পারছি না।’

প্রণোদনার ঋণের অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় চলতি মাস থেকে সরেজমিন পরিদর্শন শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রণোদনার ঋণের অভিযোগ আসায় এসব ঋণের অপব্যবহার তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

অগ্রণী ও সাউথইস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, অতীতে বারবার খেলাপি হওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও প্রণোদনার ঋণ পেয়েছে। এটা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। প্রণোদনার বড় অংশই পেয়েছে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। ছোটরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও ঋণ পায়নি। বড়দের মধ্যে প্রণোদনার ঋণ পুঞ্জীভূত হওয়ায় এসব ঋণ আদায় না হলে আরেক বড় কেলেঙ্কারি ঘটবে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email