এবিসি বার্তা

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email

চলে গেলেন কিংবদন্তী ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং

কিংবদন্তী ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন উইলিয়াম হকিং আর নেই। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের তত্ত্ব কৃষ্ণগহ্বর ও আপেক্ষিকতাবাদের জন্য তিনি জগত বিখ্যাত হয়েছিলেন।
ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিজ্ঞানী ৭৬ বছর বয়সে মারা যান। পরিবারের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বুধবার সকালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে। তিনি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়টির লুকাসিয়ান অধ্যাপক ছিলেন, যে পদে একসময় ছিলেন স্যার আইজ্যাক নিউটন।
‘বিগ ব্যাঙ থিওরি’র প্রবক্তা স্টিফেন হকিং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান অধ্যাপক পদ থেকে ২০০৯ সালে অবসর নেন। রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টসের সম্মানীয় ফেলো এবং পন্টিফিকাল একাডেমি অব সায়েন্সের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি।
স্টিফেন হকিংয়ের তিন সন্তান লুসি, রবার্ট ও টিম ব্রিটিশ গণমাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানায়, ‘আমাদের প্রিয় বাবা আজ মৃত্যুবরণ করায় আমরা গভীর ভাবে শোকাহত। তিনি ছিলেন একজন মহান বিজ্ঞানী এবং অসাধারণ মানুষ। তাঁর কর্ম ও অবদান বহুবছর ধরে টিকে থাকবে।’
তারা স্টিফেন হকিংয়ের ‘সাহস ও অধ্যাবসায়ের’ প্রশংসা করে বলেন, ‘হকিংয়ের প্রতিভা এবং রসবোধ বিশ্বব্যাপী মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম সেরা তাত্ত্বিক বিবেচনা করা হয় স্টিফেন হকিংকে। তাঁর জন্ম হয়েছিল ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে, ৮ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে।
বাবা ড. ফ্রাঙ্ক হকিং ছিলেন জীববিজ্ঞানের গবেষক আর মা ইসাবেলা ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী। উত্তর লন্ডনের এই পরিবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অক্সফোর্ডে আসে। ছেলেবেলা থেকেই হকিংয়ের আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান আর গণিতে। হকিংয়ের বাবা ড. ফ্রাঙ্ক চাইতেন, ছেলেও তাঁর মতো চিকিৎসক হোক। কিন্তু হকিংসের আগ্রহ ছিল গণিতে। ১৯৫২ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন তিনি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তাঁর বাবাও। কিন্তু সেখানে গণিত কোর্স না থাকায় পরে পদার্থবিজ্ঞানে পড়া শুরু করেন। পদার্থবিজ্ঞানে হকিংয়ের আগ্রহের বিষয়গুলো ছিল অপগতিবিদ্যা, আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টামবিদ্যা।
ছাত্র হিসাবে খুব একটা মেধাবি ছিলেন না হকিং। ১৯৮৮ সালে সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ গ্রন্থটি হকিংকে সাধারণ বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত কওে তোলে। এ বইটি সারা বিশ্বে কয়েক কোটি কপি বিক্রি হয়। তিনি প্রিন্স অব অস্ট্রিয়ান্স পুরস্কার, জুলিয়াস এডগার লিলিয়েনফেল্ড পুরস্কার, উলফ পুরস্কার, কোপলি পদক, এডিংটন পদক, হিউ পদক, আলবার্ট আইনস্টাইন পদক অর্জন করেছিলেন।
১৯৬৪ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে স্টিফেন হকিং মোটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হন। তাঁর চিকিৎসক বলেছিলেন, আর মাত্র কয়েক বছর বাঁচবেন তিনি। কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে ৭৬ পূর্ণ করেছিলেন এই বিজ্ঞানী।
তবে বেঁচে থাকলেও এই রোগ তাঁর স্বাভাবিক চলাফেরার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই তিনি কথা বলতে ও নড়াচড়া করতে পারতেন না। তবুও থেমে থাকেনি তাঁর কাজ। তিনি কথা বলতে শুরু করেন ভয়েস সিন্থেসাইজারের মাধ্যমে। এই যন্ত্র হকিংয়ের মুখের পেশির নড়াচড়া অনুযায়ী কথা বলত। এ ছাড়া গলার কম্পাঙ্ক এবং চোখের পাতার নড়াচড়া অনুযায়ী লিখতে পারতেন। আর এইভাবেই বাকি জীবন কাজ করে গেছেন হকিং।
২০১৩ সালে করা এক প্রামাণ্যচিত্রে স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ‘প্রতিদিনই আমার জীবনের শেষ দিন হতে পারত। তাই আমি প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে চাই।’
১৯৭৪ সালে বিকিরণতত্ত্ব দেন হকিংস, যা ‘হকিংস রেডিয়েশন’ নামে পরিচিত।
হকিংয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং বোর-হাইজেনবার্গেও কোয়ান্টাম তত্ত্বকে মিলিয়ে দেওয়া। আপেক্ষিকতার তত্ত্ব কাজ করে মহাজগতের অতিকায় বস্তু নিয়ে আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের বাহাদুরি হচ্ছে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগতে।
এছাড়া মহাজাগতিক পদার্থবিজ্ঞানে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্ব¡পূর্ণ তত্ত্বের অবতারণা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্যানরোজ – হকিং তত্ত্ব, বেকেনস্টাইন – হকিং ফরমুলা, হকিং এনার্জি, গিবসন – হকিং স্পেস ও গিবসন – হকিং এফেক্ট।
বিজ্ঞানী গ্যালেলিওর মৃত্যুর ঠিক ৩শ’ বছর পর ৮ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে জন্ম হয়েছিল স্টিফেন হকিংয়ের। আর তার মৃত্যু ঘোষিত হল বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ১৩৯ তম জন্মবার্ষিকীর দিনে।
মানুষের মৃত্যু-পরবর্তী জীবন নিয়ে নানা কথা চালু থাকলেও হকিং মনে করতেন, এ শুধুই রূপকথা। সেই রূপকথার জগতেই ঠাঁই নিলেন এই বিজ্ঞানী।

Share on facebook
Share on twitter
Share on whatsapp
Share on email